পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ১

প্রথম পর্বঃ মানালির অবতরণ এবং “কিছুই না করা”  

দিল্লি থেকে সারারাতের বাসে চেপে মানালি এসে পৌঁছলাম সকাল ন’টা নাগাদ। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, প্যাচপ্যাচে কাদা আর তিরিশ লক্ষ ট্যাক্সিওয়ালা, যারা “হোটেল চাহিয়ে বাবু? একদম টপ-ক্লাস, বিলকুল বিয়াস নদী কি পাস হ্যায়” বলে চারদিক থেকে হামলে পড়েছে।

01 Manali

মানালি যাবার পথে পন্ডা বলে একটা জায়গায় থামে। এ সেই জায়গা 

আমাদের গন্তব্য মানালি নয়। আমরা যাচ্ছি লাহুল-স্পিতি, “ইনক্রেডিবল স্পিতি” নামের এক ট্র্যাভেল কোম্পানির হাত ধরে। স্পিতি সিমলার দিক দিয়েও যাওয়া যায় – কিন্নর পেরিয়ে নাকো-টাবো হয়ে। আমরা যাচ্ছি মানালিতে হয়ে। এখানে একটি রাত্তির কাটিয়ে পরদিন ভোরভোর বেরিয়ে পড়বো “কাজা”র উদ্দেশ্যে।

“ইনক্রেডিবল স্পিতি”র মূল অফিস কাজাতে, মার্কেটিং অফিস মানালিতে। মানালি অফিসের দুই প্রধান “বিশেষ” এবং “রুথিকা”, দুজনেই বেশ হাসিখুসি আর আড্ডাবাজ। আসার আগেই ফোনে আমাদেরকে পইপই করে বলে দিয়েছিলো “প্রথম দিন একদম বেশী কিছু করবেন না। শুধু বিশ্রাম নেবেন আর  একক্লাইমটাইজ করতে দেবেন শরীরটাকে।“ এই “একদম বেশী কিছু করবেন না” ব্যাপারটায় আমার আবার সহজাত দক্ষতা আছে – যাকে আজকাল “কোর-কম্পিটেন্স” বলে আর কি। তাছাড়া মানালি আগে একাধিকবার ঘোরা, কাজেই সারারাত বাসজার্নি করে এসে আবার সেই ট্যুরিস্ট-পীড়িত জায়গাগুলোতে, যেখানে স্থানীয় পোশাক পরে ইয়াকের গলা জড়িয়ে বা গাঁজাখোর খরগোস কোলে নিয়ে ছবি তোলাতে হয়, সেখানে যেতে আমাদের এমনিতেও বিশেষ আগ্রহ ছিলো না। শুধু বশিষ্ঠকুণ্ডে হটস্প্রিং এর চানের কথাটা একবার উঠেছিলো বটে, কিনতু  নামতে গেলে তো সব ধর্মস্থানের কমন এলিমেন্ট – সেই বিখ্যাত “খাটো গামছা” অথবা জাঙ্গিয়া পরে নামতে হবে, কারণ সুইমিং কস্টিউম আনা হয় নি। দিনকাল ভালো নয় – জাঙ্গিয়াকে সুইমিং কস্টিউম হিসেবে পরে নামলে সেখানকার জনসাধরনের ধর্মবিশ্বাসে যদি ঘা লেগে যায় এবং তার দরুন তারা যদি আমাদের দু-ঘা বসিয়ে দেয়, সেই ভয়ে শেষমেষ এই পরিকল্পনাটি পরিত্যাগ করা হলো।

আমাদের হোটেলটা ওল্ড মানালিতে, নাম “ড্রাগনস ইন”। নতুন মানালি থেকে ওপরে উঠে মানালসু নালার (বিপাশা নদীর একটি শাখা – আমাদের আদি গঙ্গা আর কালীঘাট গঙ্গা গোছের ব্যাপার আর কি) ওপরের ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয়। ডানদিকে নিচের দিকে নেমে গেলে ক্লাবহাউস (যেখানে একসময় ভিড় করে লোকে সূর্যাস্ত দেখতে যেতো), সেদিকে না গিয়ে বাঁদিকে চড়াই ধরে খানিকটা ওপর দিকে উঠতে হয় (এই রাস্তা শেষ হয়েছে মনু মন্দিরে)। চড়াইটা বেশ খাড়া, কারণ অটো আসতে চাইলো না আর ট্যাক্সি পঞ্চাশটাকা বেশী নিলো – যদিও সেটা সত্যিই চড়াইএর জন্যে, নাকি আমরা “বোটু” বলে, সেটা বলা শক্ত। তা আমাদের “ড্রাগনস ইন” বেশ ছিমছাম “নো-ফ্রিলস” একটা হোটেল, সামনে একই নামে একটা কফিশপ (যার ক্যাফে-মোকা না খেলে মশাই আপনার জীবনটাই বৃথা) আর লাগোয়া একটা রেস্তোরাঁ, যার আসল নাম বোধহয় রাইস-বাউল, কিন্তু সবাই সেটাকেও ড্রাগনস-ইন নামেই ডাকে। ড্রাগন শুনলেই আমার আবার হেমেন রায়ের “ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন” মনে পড়ে কিম্বা  কাঞ্চনজঙ্ঘা-প্রহেলিকা সিরিজের সেই সব সাংঘাতিক রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস – যেখানে হত্যাকারী মৃতদেহের পাশে একখানা হরতনের টেক্কা ফেলে দিয়ে যেতো, আর গল্পের শেষে  চিনেপাড়ার অন্ধকার গলিঘুঁজিতে সুদূরপ্রাচ্যের কোন প্রধান অপরাধীর (তখনো “ডন” কথাটা চালু হয় নি) সঙ্গে গোয়েন্দার রক্তহিম মোকাবিলা হতো। কিন্তু আমাদের ড্রাগনস ইন নিতান্তই নিরীহ হোটেল, তাই সেরকম গায়ে-কাঁটা-দেওয়া ঘটনার ঘনঘটা কিছু ঘটে নি।

01 Manali (old)

ওল্ড মানালির পথে

01 Manalsu river

মানালসু নালা

হোটেলটা টিপিক্যাল ট্র্যাভেলার-পাড়ায় – পিঠে ব্যাক-প্যাক বাঁধা বিদেশীর দল গিজগিজ করছে এখানে। টিপিক্যাল ট্যুরিস্ট পাড়ায় যেমন গোটাকয়েক “শের-ই-পাঞ্জাব” রেস্তোরাঁ থাকবেই (“শের-ই-পাঞ্জাব, “নিউ শের-ই-পাঞ্জাব” ইত্যাদি, তেমনি এই সব সাহেবি ট্র্যাভেলার পাড়ায় থাকবেই “জার্মান বেকারি”। এখানে দেখলাম হোটেলের সামনের সরু গলিতেই গোটা তিনেক জার্মান বেকারি আছে, সেগুলিতে নানান বিদেশী ছেলে-বুড়ো তুরিয় অবস্থায় বসে এটা-সেটা খাচ্ছেন।

01 Manali (2)

ওল্ড মানালির সঙ্গে দুটি জিনিস একছত্রে বাঁধা পড়ে গেছে – এক হলো গঞ্জিকা (যার ভদ্র মডার্ন নাম “মারিজুয়ানা”) আর দ্বিতীয় এই অজস্র ইজরায়েলি ট্যুরিস্টের দল। শুনেছি যতো বিদেশী আসেন হিমাচলে, তার ৭০ শতাংশ আসেন ইজরায়েল থেকে। এদের মূল গন্তব্য মানালির থেকে অনতি দূরে কাসোল, কুলু, ধরমশালা আর এই ওল্ড মানালি। কেউ কেউ তাই পুরনো মানালিকে “ছোট টেল-আভিভ” বলে থাকেন। মানালির অনেক দোকানেই সাইনবোর্ড হিব্রু – এমনকি মেনুকার্ডটিও হিব্রুতে লেখা। রেস্তোরাঁর সামনে বিদেশী স্টাইলে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে “আজকের স্পেশাল” আইটেমগুলি লেখা, তাতে দেশ-বিদেশের খাবার লেখা থাকে। এই সিজলার-স্নিটজেল-গ্রিল্ড ট্রাউট-বারগার-পাস্তা-শোভিত মেনুর মধ্যে অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি ফালাফাল, কুশকুশ (এটা অবশ্য লেখা থাকে না, ট্রাউটের সঙ্গে দেয়) এবং ইজরায়েলি “শ্যাকশাউকা”র।

শ্যাকশাউকা প্রাচীন অটোমান সাম্রাজ্যের সব দেশগুলিতেই বেশ জনপ্রিয়। শুনেছি অটোমান সাম্রাজ্যের সময় এটা মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি হতো; পরে টিউনিসিয়ার ইহুদীদের হাতে পড়ে এর বর্তমান রূপটি ইজরায়েলে জনপ্রিয় হয় – টম্যাটো-পিঁয়াজ-ক্যাপ্সিকামের রঙিন ভাইদের মিশিয়ে একটা থকথকে কারির ওপর ডিমের পোচ বসিয়ে দেওয়া হয়। শ্যাকশাউকা খেতে দেওয়া হয় লোহার একটি সসপ্যানের মতো পাত্রে – তাকে বলে ট্যাজিন। আমি এটি  দুয়েকবার খেয়েছি তুর্কিস্তানে – সেখানে এর একটা ভায়রা-ভাইও চলে, যাতে টম্যাটোর বদলে বেগুন দিয়ে তৈরি হয় শ্যাকশাউকার বেস ।

01 Manali 301 Manali 4

মানালিতে আমরা অবশ্য শ্যাকশাউকা খাই নি। হোটেলের বাইরে একটা জনশুন্য ছোট রেস্তোরাঁয় আমাদের পূর্বতন প্রভূদের স্মরণ করে “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” অর্ডার করেছিলাম। দোকানদার আমাদের এই ব্যবহারে বোধহয় মর্মাহত হয়ে পড়ে – যেখানে দোকানের সামনের ব্ল্যাকবোর্ড মেনুকার্ডে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে ইজরায়েলি-স্প্যানিশ-ফ্রেঞ্চ ব্রেকফাস্ট এভেলেবল, সেখানে সেসব ফেলে শেষে সেইইইই “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” ? এই গভীর মনকষ্টেই বোধহয় বেচারার এই সাধারণ ব্রেকফাস্ট বানাতে পাক্কা ৫০ মিনিট লেগেছিলো – ততক্ষনে খিদেয় আমরা চেয়ার-টেবিল চিবিয়ে ফেলার উপক্রম করছি। অবশ্য এতে একটা উপকার হয়েছিলো – ব্রেকফাস্টটা “ব্রাঞ্চ”এ পরিনত হওয়ায় লাঞ্চটা আর খাবার দরকার পড়ে নি; শুধু আমাদের মতো দু-তিনজন ব্যোম-হ্যাংলারা বিকেলের দিকে ইয়াকের-চিজ দেওয়া উৎকৃষ্ট পিৎজা খেয়ে এসেছিলাম আমাদের হোটেলের লাগোয়া রেস্তোরাঁয় – যার মালকিন আবার এক ইজরায়েলি রমণী।

মানালিতে মারিজুয়ানার এমন অবাধ ব্যবহার অবাক করে দেবার মতন। ওল্ড মানালির প্রায় সব রেস্তোরাতেই মাটিতে বসার ব্যবস্থা আছে – বেশ গদী-বালিশ নিয়ে এলিয়ে বসে কল্কেতে টান মারা যায়। সাধরন মনিহারি দোকানে প্রকাশ্যেই নানান ধরণের কল্ককে ও তার অ্যাক্সেসরি পাওয়া যায়। এমনকি শুধু গাঁজার সরঞ্জাম বিক্রি করবার ‘এক্সক্লুসিভ” দোকানও আছে বড়ো রাস্তার ওপরেই। মানালি তো “মনুর আলয়” – শিবের তো নয়, কিন্তু চরিত্রগত দিক থেকে শিবের সঙ্গেই এর মিল বেশী। রাস্তায় ঘাটে অনেক বিদেশিনী ও স্বদেশিনীদের দেখতে পেয়েছি – বিচিত্র স্বপ্ল-পোশাক পরে ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে আছেন। জানি, জানি – তাদের ছবি পেলে আপনাদের বেশ নয়নসুখ হতো – এই তো ? ওসব পাপ কথা একদম বলবেন না – এ হচ্ছে ভ্রমণকাহিনী, ও সব রসের কথা আরেকদিন হবে অখন।

মনুর কথা ঠিক জানা নেই, তবে ওল্ড মানালির সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দারা ছিলেন কাংরা উপত্যকার যাযাবর শিকারী ও মেষপালকরা – যাদের আবার বলা হতো “রাক্ষস” (হ্যাঁ মশাই – রাক্ষস-অসুর-গান্ধর্ব-নাগ এরা সবাই নানান গোষ্ঠীই ছিলো – নেহাত বেদবাদী নয় আর গাঙ্গেয় বৈদিক প্রথা সব পালন করতো না বলে এদেরকে “মানুষ নয়” বলে ভিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো)। পরে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা যারা হলো, তাদের বলা হতো “নর”। আরো অনেক পরে একসময় এটি একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মজার কথা – এই মানালির রাজারা নিজেদের রাজা বলতেন না। তাঁরা বলতেন মানালির আসল রাজা হলেন রঘুনাথজি, তাঁরা রাজ্য চালান এই রঘুনাথজীর সেবক হিসেবে। ভরত যেভাবে রামের খড়ম রেখে রাজত্ব করতেন আর কি। এর কারণ নাকি সপ্তদশ শতাব্দীতে মানালির এক রাজা জগৎ সিংহ একদা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে বসেছিলেন। কোন চিকিৎসাতেই যখন কাজ হলো না, তখন তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে অযোধ্যা থেকে রঘুনাথজীকে (অর্থাৎ রামের এক রূপ) নিয়ে এসে তাঁকে সিংহাসনে প্রতিস্থা করেন ও নিজের হাতে তাঁর সেবা করতে শুরু করেন। কথিত আছে তাঁর দয়ায় জগৎ সিংহ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সেই থেকে মানালির রাজা থেকে যান রঘুনাথজী। এই ভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর মানালি মান্ডি রাজ্যের অংশ হয়ে যায় – যার রাজারা ছিলেন সেন পদবীধারী চন্দ্রবংশীয় রাজপুত (যাঁদের সঙ্গে আবার নাকি আমাদের বাংলার সেনবংশের কি যেন একটা লতায়-পাতায় সম্পর্ক আছে)।

আধুনিক মানালি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্রিটিশদের দাক্ষিণ্যে – যারা এখানে আপেল চাষ এবং এর নদীতে দুরকম ট্রাউট মাছের চাষ শুরু করেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলেও মান্ডি স্বাধীন রাজ্যই ছিলো, মায় ভারত স্বাধীন হওয়া অব্দি। ভারত স্বাধীন হবার পর যে ৫৬২ খানা স্বাধীন রাজ্য ভারতবর্ষে যোগ দেয় মূলত বল্লভভাই প্যাটেলের রাজনৈতিক ছক্কা-পাঞ্জার খেলায়, মান্ডি তাদের মধ্যে একটি।

01 Manali 5

মানালির কথা আর নয়। কাল আবার সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়া। ফেরবার পথে এর সঙ্গে পুনর্মিলন যখন হবে, তখন নাহয় দুচার কথা হবে। আপাতত মানালিকে আলবিদা।

পরবর্তী পর্ব – কাজা।

(চলবে)

—————————————————————————————————————————————–

উত্তরকথনঃ

মানালিতে বিপাশা নদীর ধারে বসে “নদী তুমি কথা হতে আসিতেছো” বলা ছাড়া আরো কিছু দেখবার জিনিস আছে – মনু মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির (মানালির একটু বাইরে), হিড়িম্বা মন্দির (এবং তাঁর অনতিদূরে ঘটোৎকচের খোলা মন্দির) ইত্যাদি। মনু মন্দিরটা খুবই পুরনো, কাঠের গায়ে কারুকার্য করা মন্দির – এই স্টাইলের মন্দির এই অঞ্চলে দেখা যায় খুব। হিড়িম্বা মন্দির – আর বিশেষত ঘটোৎকচের খোলা মন্দির দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এদুটিই ট্রাইবালদের (যাদের তখন রাক্ষস বলতো) দেবতার মন্দির। এর স্ট্রাকচারে নগর বা দক্ষিণী স্টাইল, কোনটাই নেই; আছে পশুর মাথা বা শিং দিয়ে সাজসজ্জা। বশিষ্ঠ মন্দির মানালির থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে, ওর কাছে শুনেছি হোমস্টে আছে। থাকতে পারেন ইচ্ছে হলে – একটু নিরিবিলি হবে। আর, ইয়ে – ছেলেদের জন্যে বলছি – সুইমিং কস্টিউম অথবা হাফপ্যান্ট নিয়ে যাবেন, আর একটা লম্বা তোয়ালে, কেমন?

—————————————————————————————————————————————–