পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ৩

তৃতীয় পর্বঃ কুনজুম পেরিয়ে কাজা

দিল্লির ট্র্যাভেল কোম্পানিদের মধ্যে কুনজুম পাস নিয়ে একটা আবেগমিশ্রিত রোম্যান্টিসিজম আছে। দিল্লিতে কুনজুম ক্যাফে নামে একটা অতীব জনপ্রিয় “ট্র্যাভেল ক্যাফে” আছে, তাছাড়া গোটা চারেক কুনজুম নামের ট্যুর-অ্যান্ড-ট্র্যাভেল কোম্পানি আছে। যাই হোক, আসল কুনজুম লা হলো লাহুল আর স্পিতির মধ্যবর্তী ১৫০০০ ফিট উচ্চতার অপূর্ব সুন্দর একটি গিরিপথ। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে যাতায়তের গাড়ি যাবার উপযুক্ত পাকা রাস্তা এই একটিই – অবশ্য যদি ঝুরঝুরে পাথরের কুঁচি আর নুড়ির রাস্তাকে পাকা রাস্তা বলে স্বীকার করেন, তবেই।

কুনজুম লা এর উচ্চতম জায়গায় পৌঁছে দেখতে পাওয়া যায় তিনটি বৌদ্ধ স্থুপ, যার তিব্বতী নাম চোরটেন। চোরটেনের প্রতিটি অংশের একটি করে প্রতীকী অর্থ আছে (সেগুলো আবার স্থানবিশেষে একটু আলাদা; অর্থাৎ তিব্বত, ভূটান বা শ্রীলঙ্কার চোরটেনের চেহারা এবং তার অংশের প্রতীকী ব্যাখ্যায় সামান্য তফাত আছে)। তিব্বতী স্থুপ বা চোরটেনের একদম নিচের যে চৌকো অংশটি, তা হলো পৃথিবীর প্রতীক। তার ওপর যে উল্টোনো ট্র্যাপিজয়েডের মতন অংশ (যেটার ভালো নাম “বুমপা”), সেটা জলের প্রতীক। বুমপার ওপর তেরোটি চুড়ির লম্বা খাম্বাটি (যার নিচের অংশের নাম “হার্মিকা” আর চুড়িগুলির নাম “ভূমি”) হলো অগ্নির প্রতীক। তার ওপরের মুকুটের মতো জিনিসটি (নাম পারাসল) হলো বায়ু আর তারও ওপরে চন্দ্র-সূর্য-রত্ন হলো শূন্য। অর্থাৎ আমাদের ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম পঞ্চভূতের এর তিব্বতী ভার্সন আর কি! আবার চোরটেনকে ধ্যানরত বুদ্ধের রূপ হিসেবেও কল্পনা করা হয়, এবং সেই রূপের সঙ্গে চোরটেনের অংশগুলোর রূপক, অর্থাৎ নিচের চৌকো ধাপ – বুমপা – হার্মিকা – ভূমি – পারাসলের অর্থ পাল্টে গিয়ে হয়ে যায় বৌদ্ধ ধম্মের নানান স্তর – প্রজ্ঞ্যা-শীলা-সমাধি ইত্যাদি। একই স্থাপত্যের দুরকম রূপক কেন তার ব্যাখ্যা অন্তর্জালে পেলাম না । তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলো ওই পঞ্চভূতের সিম্বলিজমটি প্রাক-বৌদ্ধ জমানার তিব্বতী বন-পা ধর্ম থেকে এসেছে, যেটি প্রথমযুগে ছিলো মূলত প্রকৃতির উপাসনা । পরে এই বন-পা এবং বৌদ্ধ ধর্ম মিলেমিশে এখনকার তিব্বতী ধর্মের চেহারা নিয়েছে আর তাই এই চোরটেনে বন-পা এবং বৌদ্ধ, দুরকম প্রতীকই রয়েছে।

তিব্বতী ধর্ম নিয়ে পরে আবার লিখবো – এই অঞ্চলে এতো মনাস্ট্রি ছড়িয়ে আছে যে একটু সেগুলো বলে না দিলে ধরতাই পাবেন না। আপাতত চোরটেন এবং তার সিম্বলিজম নিয়ে অন্তর্জাল থেকে পাওয়া কয়েকটি ছবি জুড়ে দিলাম; এতে একটা ধারণা হবে। আর যদি “গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও” গাইতে চান, তাহলে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করতে হবে মশাই। আমার এই হালকা-ফুলকা দুলকি চালের ভ্রমণআখ্যান কোনো মতেই, যাদবপুরের ভাষায়, “মাদার” হিসেবে কাজ করবে না।

03 Stupa Section Name-4

চরটেন

03 StupaTemplate1web

চরটেন

কুনজুম পাসের তিনটি চোরটেনকে ঘিরে রেখেছে পাঁচ রঙওয়ালা তিব্বতি পতাকা, যা সব পাহাড়ি মনাস্ট্রিতেই কম বেশী দেখা যায়। এই পতাকার নাম দার-ইকগ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো “খাড়াভাবে রাখা কাপড়”। নামটি খুব গভীর অর্থপূর্ণ তা বলা চলে না, তবে এই পতাকাতে যে পাঁচটি রঙ আছে – নীল-সাদা-লাল-সবুজ-হলুদ তা হলো আকাশ-মেঘ-অগ্নি-জল-পৃথিবীর প্রতীক। মানে আবার সেই পঞ্চভূত (বায়ুর বদলে মেঘ আর শূন্যর বদলে আকাশ)। এও ওই বন-পা’র প্রভাব হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ এই পতাকাও বৌদ্ধ ধর্মের আগে থেকেই আছে। শুনলাম বহুপূর্বে এগুলো নাকি যুদ্ধের পতাকা ছিলো, পরে এটি ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এই বিভিন্ন বর্ণের আলাদা প্রতীকী ব্যাখ্যা এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।

03 Kunzum Pass (M)

তাজ্জব ব্যাপার হলো এই পাক্কা তিব্বতী বৌদ্ধ অঞ্চলে, দার-ইকগ-বেষ্টিত তিব্বতি চোরটেনগুলির গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মন্দির, যার নাম কুনজুম মাতার মন্দির। কুনজুম মাতা আসলে দুর্গার এক রূপ – তিনিই নাকি এই কুনজুম পাসের দেখভাল করেন যাতে এখানে কোনো অঘটন না ঘটে। তাই সব ড্রাইভাররাই মাতার স্থলে একবার মাথা না ঠেকিয়ে এগোয় না।

03 kunjum mata

কুনজুম মাতার মন্দিরে আবার নিজের মনস্কামনা পূর্ণ হলো কিনা বোঝবার একদম স্পটচেক সিস্টেম আছে। মন্দিরে প্রণাম করে মনে মনে কিছু কামনা করে যে কোন মুল্যের একটি মুদ্রা মন্দিরের সামনের পাথরে ঠেকাতে হবে। পাথরটি একটি চুম্বকের মতো, আপনার মুদ্রাটি যদি আটকে যায়, তার মানে আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবেই। সত্যি দেখলাম অজস্র মুদ্রা আটকে রয়েছে ওই পাথরে। এই ব্যাপারটা তো জানা ছিলো না, কাজেই আমি দেবীর কাছে কিছু না চেয়ে এমনিই একটা মুদ্রা ঠেকিয়েছিলাম। “কিছু-চাই-না-কিন্তু-কয়েন-ঠেকাবো” এই আবদারে নিশ্চয়ই স্পটচেক সিস্টেমে ডিভাইডেড-বাই-জিরো গোছের কিছু এরর এসে গিয়ে থাকবে, তাই আমার কয়েনটি আটকালো না সেখানে। পাঠকগন, আশা করি খেয়াল করেছেন যে এই দেবীর কাছে মুখফুটে কিছু না চাওয়ার ব্যাপারটাতে আমার সঙ্গে ওই সিমলেপাড়ার নরেণ দত্তের সঙ্গে আশ্চর্য মিল ? কাজেই, বুঝলেন কিনা, আমাকে ল্যাল্যা পাবলিক বলে হ্যাটা করবেন না। হেঃ !!

কুনজুম পেরিয়ে গেলেই আমরা লাহুল ছেড়ে ঢুকে পড়ি স্পিতিতে। কুনজুমে শেষ বারের মতো দেখা যায় গেইফাং পর্বতচূড়া – লাহুলের প্রাচীন আরাধ্য দেবতা গেইফাংএর নামে। গেইফাংএর নাকি একটিই মন্দির আছে, সিসু নামের একটা পুঁচকে গ্রামে। তিন বছরে একবার করে তার মূর্তি নিয়ে যাত্রা হয়, কতকটা জগন্নাথের রথের মতন। সিসু আমাদের রাস্তায় পড়বে না, সেটা কেলংএর দিকে। তাছাড়া ওই মন্দিরে বাইরের লোকেদের যাওয়াটা নাকি লাহুলিদের ঠিক পছন্দ করে না।

কুনজুম পেরিয়েই হঠাৎ পেলাম সবুজ কেয়ারি করা ঘাসের একটা উপত্যকা, সেখানে ইতস্তত কয়েকটি ঘোড়া চরছে। এতক্ষণ রুক্ষ খয়েরি খিটখিটে দেখতে পাহাড়ের পর আচমকা একরাশ সবুজ দেখে চোখের ভারী তৃপ্তি হলো। পাঠক হিসেবে তো আমি একেবারে চার-আনার পাবলিক – পেডিগ্রিওয়ালা সাহিত্যপ্রেমী নই, তাই কোন বিখ্যাত কবিতা-টবিতা আমার মনে পড়ে নি। বরং মনে পড়লো প্রফেসার শঙ্কুর একশৃঙ্গ অভিযান-এর সেই অসামান্য সবুজ কল্পনার ডুংলুং-ডো রাজ্যের বর্ণনা – স্পিতি জায়গাটা প্রাচীন তিব্বত রাজ্যের অংশ বলেই বোধহয়।

03 Valley after Kunzum

স্পিতিতে ঢুকে দেখলাম আমাদের পাশে আর চন্দ্রা নদী নেই। আছে একটি নতুন নদী, যার নাম – ঠিক ধরেছেন – স্পিতি নদী। তবে ক্রমাগত ল্যান্ডস্লাইডে পাথর মাটি পড়ে সে নদী নিতান্ত শীর্ণকায়া, তবুও নদী বটে। তার ধার ধরে যেতে যেতে গিয়ে পড়লাম লোসার-এ। এরপর রামরিখ পেরিয়ে, একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর লোহার পুল পেরিয়ে কাজা। এই রামরিখের একটু আগে রাস্তাটা অনেকটা ভালো হয়ে হয়ে যাওয়ায় কাজার আগে মাজার ব্যথাটা একটু কমে এসেছিলো।

02A Spiti River

কাজার সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গা হলো শাক্য মনাস্ট্রি যার আরেকটা নাম শাক্য তানগুড মনাস্ট্রি। এটির অবস্থান হলো কাজার দ্বিতীয় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা – কাজার পেট্রোলপাম্প (এই অঞ্চলের একমাত্র পেট্রোলপাম্প) – তার ঠিক পাশেই। এই অঞ্চলের মনাস্ট্রি মাত্রেই বেশ রংচঙে, এটা ব্যতিক্রম তো নয়ই – বরঞ্চ রীতিমত রঙ্গিলা। ভেতরে ছবি তুলতে দেয় না (বেশীরভাগ মনাস্ট্রিতেই তাই), যদিও আমি লুকিয়ে লুকিয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম। ভেতরে ঢুকে দেখি কেউ কোত্থাও নেই, তাই উদাসভাবে এদিক ওদিক কারুকার্য দেখার ভান করতে করতে ঘুরছি। একসময় ফাঁকায় ফাঁকায় অতি সন্তর্পণে মোবাইলটা বের করে খুচ করে ছবিটা তুলতে যাচ্ছি, ওমনি দেখি একটা বাচ্চা লামা জুলজুল আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম নির্ঘাত চেল্লা-মেল্লি করে মহা হট্টগণ্ডগোল বাধাবে, তা করলো না – কারণ সেও এই লোকজন না থাকায় ওই গুম্ফার মূল বেদী থেকে একটা রংচঙে ঢাক নামিয়ে সেটাকে বাজাবার পরিকল্পনা করছিলো। দুই অপরাধীর এই অকস্মাৎ শুভদৃষ্টির ফলবশত ছোকরা ঢাকটা আবার বেদীতে তুলে রেখে উদাসভাবে কোথায় যেন চলে গেল আর আমার হাতটা বেমক্কা নড়ে গিয়ে ছবিটা খুব বাজে উঠলো। তা সত্ত্বেও ছবিটা দিয়ে দিলাম – এইটে বোঝাবার জন্যে যে পাপের ফল ভালো হয় না।

03 Inside Sakya Monastry03 Sakya Monastry corridor

শাক্য মনাস্ট্রির সামনেই আছে একসার চোরটেন – যে চোরটেন হলো – আচ্ছা, আচ্ছা – চোরটেন নিয়ে আর একটি কথাও বলবো না। অতো রেগে যাবার কি আছে মশাই? আচ্ছা শাক্য মানে কি জানেন তো ? প্রাচীন ভারতের মোটামুটি খৃষ্টপূর্ব দশম থেকে পঞ্চম শতাব্দী – এই সময় এরা নেপাল আর ভারতের একটা অংশে বাস করতো। এদের নিজস্ব রাজত্ব ছিলো – তবে সেটাকে অভিজাত-তন্ত্র বললেই চলে। সেনানায়করা এবং রাজ্যের প্রধান কিছু লোকে মিলে আলোচনা করে তাদের শাসক স্থির করতো। এই গোষ্ঠীর রাজধানী তথা প্রধান শহর ছিলো কপিলাবস্তু এবং এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন – বুঝে ফেলেছেন নিশ্চয়ই – শাক্যসিংহ অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধ।

03 Chortens at Kaza

কাজাতে আমরা তিন রাত্তির ছিলাম। যে হোটেলে ছিলাম, সেটা এই শাক্য মনাস্ট্রির পাশেই, তার নাম – যা ভেবেছেন তাই – শাক্য এবোড। এখান থেকেই আমরা গিয়েছিলাম আশেপাশের ছোট্ট ছোট্ট গ্রামগুলোতে – কী-কিব্বের-লাংজা-হিকিম-কমিক, এইগুলো। তবে সে হলো পরের পর্বের গল্প।

03 Kaza Market

এখন আমরা কাজার বড়ো রাস্তা ছেড়ে নিচে নেমে নদী পেরিয়ে যাবো ওপারে। অর্থাৎ কাজা খাস (পুরনো কাজা) ছেড়ে কাজা সোমা (নতুন কাজা)। যেখানে বাজার-হাট রয়েছে। সেখান থেকে কিনবো একটু দারচিনি, পাতি লেবু আর একবোতল “বৃদ্ধ সন্ন্যাসী” – মোহনমেকিন কোম্পানির অমর সৃষ্টি, আমাদের অনেক সুখ-দুঃখের দিনের সাথী।

কবোষ্ণ জলে এগুলো মিশিয়ে এট্টু না খেলে গায়ের ব্যথা মরবে নাকি?

(চলবে)

————————————————

উত্তরকথনঃ

ওল্ড মঙ্কের কথা লিখলাম বটে, কিন্তু এইসব পাহাড়ে মদ না খাওয়াই ভালো। ডি-হাইড্রেশন হয়ে মাউনটেন সিকনেস বেড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। আমাদের সহযাত্রীদের একজন, তার নাম বলা বারণ, আরেকজনের প্ররোচনায় (তারও নাম বলা বারণ) ঢকঢক করে একপেগ ওল্ড মঙ্ক মেরে দিয়ে বাকি যাত্রায় কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। কাজেই মন্দার বোসের মতো “স্রেফ হরলিক্স” ।

কাজা সোমার বাজারের পাশে “হিমালায়ান ক্যাফে” বলে একটা ক্যাফে-রেস্তোরাঁ আছে, বেশ নামকরা। আমাদের যাওয়া হয় নি, আপনারা কিন্তু যাবেন অবশ্যই।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ১

প্রথম পর্বঃ মানালির অবতরণ এবং “কিছুই না করা”  

দিল্লি থেকে সারারাতের বাসে চেপে মানালি এসে পৌঁছলাম সকাল ন’টা নাগাদ। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, প্যাচপ্যাচে কাদা আর তিরিশ লক্ষ ট্যাক্সিওয়ালা, যারা “হোটেল চাহিয়ে বাবু? একদম টপ-ক্লাস, বিলকুল বিয়াস নদী কি পাস হ্যায়” বলে চারদিক থেকে হামলে পড়েছে।

01 Manali

মানালি যাবার পথে পন্ডা বলে একটা জায়গায় থামে। এ সেই জায়গা 

আমাদের গন্তব্য মানালি নয়। আমরা যাচ্ছি লাহুল-স্পিতি, “ইনক্রেডিবল স্পিতি” নামের এক ট্র্যাভেল কোম্পানির হাত ধরে। স্পিতি সিমলার দিক দিয়েও যাওয়া যায় – কিন্নর পেরিয়ে নাকো-টাবো হয়ে। আমরা যাচ্ছি মানালিতে হয়ে। এখানে একটি রাত্তির কাটিয়ে পরদিন ভোরভোর বেরিয়ে পড়বো “কাজা”র উদ্দেশ্যে।

“ইনক্রেডিবল স্পিতি”র মূল অফিস কাজাতে, মার্কেটিং অফিস মানালিতে। মানালি অফিসের দুই প্রধান “বিশেষ” এবং “রুথিকা”, দুজনেই বেশ হাসিখুসি আর আড্ডাবাজ। আসার আগেই ফোনে আমাদেরকে পইপই করে বলে দিয়েছিলো “প্রথম দিন একদম বেশী কিছু করবেন না। শুধু বিশ্রাম নেবেন আর  একক্লাইমটাইজ করতে দেবেন শরীরটাকে।“ এই “একদম বেশী কিছু করবেন না” ব্যাপারটায় আমার আবার সহজাত দক্ষতা আছে – যাকে আজকাল “কোর-কম্পিটেন্স” বলে আর কি। তাছাড়া মানালি আগে একাধিকবার ঘোরা, কাজেই সারারাত বাসজার্নি করে এসে আবার সেই ট্যুরিস্ট-পীড়িত জায়গাগুলোতে, যেখানে স্থানীয় পোশাক পরে ইয়াকের গলা জড়িয়ে বা গাঁজাখোর খরগোস কোলে নিয়ে ছবি তোলাতে হয়, সেখানে যেতে আমাদের এমনিতেও বিশেষ আগ্রহ ছিলো না। শুধু বশিষ্ঠকুণ্ডে হটস্প্রিং এর চানের কথাটা একবার উঠেছিলো বটে, কিনতু  নামতে গেলে তো সব ধর্মস্থানের কমন এলিমেন্ট – সেই বিখ্যাত “খাটো গামছা” অথবা জাঙ্গিয়া পরে নামতে হবে, কারণ সুইমিং কস্টিউম আনা হয় নি। দিনকাল ভালো নয় – জাঙ্গিয়াকে সুইমিং কস্টিউম হিসেবে পরে নামলে সেখানকার জনসাধরনের ধর্মবিশ্বাসে যদি ঘা লেগে যায় এবং তার দরুন তারা যদি আমাদের দু-ঘা বসিয়ে দেয়, সেই ভয়ে শেষমেষ এই পরিকল্পনাটি পরিত্যাগ করা হলো।

আমাদের হোটেলটা ওল্ড মানালিতে, নাম “ড্রাগনস ইন”। নতুন মানালি থেকে ওপরে উঠে মানালসু নালার (বিপাশা নদীর একটি শাখা – আমাদের আদি গঙ্গা আর কালীঘাট গঙ্গা গোছের ব্যাপার আর কি) ওপরের ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয়। ডানদিকে নিচের দিকে নেমে গেলে ক্লাবহাউস (যেখানে একসময় ভিড় করে লোকে সূর্যাস্ত দেখতে যেতো), সেদিকে না গিয়ে বাঁদিকে চড়াই ধরে খানিকটা ওপর দিকে উঠতে হয় (এই রাস্তা শেষ হয়েছে মনু মন্দিরে)। চড়াইটা বেশ খাড়া, কারণ অটো আসতে চাইলো না আর ট্যাক্সি পঞ্চাশটাকা বেশী নিলো – যদিও সেটা সত্যিই চড়াইএর জন্যে, নাকি আমরা “বোটু” বলে, সেটা বলা শক্ত। তা আমাদের “ড্রাগনস ইন” বেশ ছিমছাম “নো-ফ্রিলস” একটা হোটেল, সামনে একই নামে একটা কফিশপ (যার ক্যাফে-মোকা না খেলে মশাই আপনার জীবনটাই বৃথা) আর লাগোয়া একটা রেস্তোরাঁ, যার আসল নাম বোধহয় রাইস-বাউল, কিন্তু সবাই সেটাকেও ড্রাগনস-ইন নামেই ডাকে। ড্রাগন শুনলেই আমার আবার হেমেন রায়ের “ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন” মনে পড়ে কিম্বা  কাঞ্চনজঙ্ঘা-প্রহেলিকা সিরিজের সেই সব সাংঘাতিক রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস – যেখানে হত্যাকারী মৃতদেহের পাশে একখানা হরতনের টেক্কা ফেলে দিয়ে যেতো, আর গল্পের শেষে  চিনেপাড়ার অন্ধকার গলিঘুঁজিতে সুদূরপ্রাচ্যের কোন প্রধান অপরাধীর (তখনো “ডন” কথাটা চালু হয় নি) সঙ্গে গোয়েন্দার রক্তহিম মোকাবিলা হতো। কিন্তু আমাদের ড্রাগনস ইন নিতান্তই নিরীহ হোটেল, তাই সেরকম গায়ে-কাঁটা-দেওয়া ঘটনার ঘনঘটা কিছু ঘটে নি।

01 Manali (old)

ওল্ড মানালির পথে

01 Manalsu river

মানালসু নালা

হোটেলটা টিপিক্যাল ট্র্যাভেলার-পাড়ায় – পিঠে ব্যাক-প্যাক বাঁধা বিদেশীর দল গিজগিজ করছে এখানে। টিপিক্যাল ট্যুরিস্ট পাড়ায় যেমন গোটাকয়েক “শের-ই-পাঞ্জাব” রেস্তোরাঁ থাকবেই (“শের-ই-পাঞ্জাব, “নিউ শের-ই-পাঞ্জাব” ইত্যাদি, তেমনি এই সব সাহেবি ট্র্যাভেলার পাড়ায় থাকবেই “জার্মান বেকারি”। এখানে দেখলাম হোটেলের সামনের সরু গলিতেই গোটা তিনেক জার্মান বেকারি আছে, সেগুলিতে নানান বিদেশী ছেলে-বুড়ো তুরিয় অবস্থায় বসে এটা-সেটা খাচ্ছেন।

01 Manali (2)

ওল্ড মানালির সঙ্গে দুটি জিনিস একছত্রে বাঁধা পড়ে গেছে – এক হলো গঞ্জিকা (যার ভদ্র মডার্ন নাম “মারিজুয়ানা”) আর দ্বিতীয় এই অজস্র ইজরায়েলি ট্যুরিস্টের দল। শুনেছি যতো বিদেশী আসেন হিমাচলে, তার ৭০ শতাংশ আসেন ইজরায়েল থেকে। এদের মূল গন্তব্য মানালির থেকে অনতি দূরে কাসোল, কুলু, ধরমশালা আর এই ওল্ড মানালি। কেউ কেউ তাই পুরনো মানালিকে “ছোট টেল-আভিভ” বলে থাকেন। মানালির অনেক দোকানেই সাইনবোর্ড হিব্রু – এমনকি মেনুকার্ডটিও হিব্রুতে লেখা। রেস্তোরাঁর সামনে বিদেশী স্টাইলে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে “আজকের স্পেশাল” আইটেমগুলি লেখা, তাতে দেশ-বিদেশের খাবার লেখা থাকে। এই সিজলার-স্নিটজেল-গ্রিল্ড ট্রাউট-বারগার-পাস্তা-শোভিত মেনুর মধ্যে অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি ফালাফাল, কুশকুশ (এটা অবশ্য লেখা থাকে না, ট্রাউটের সঙ্গে দেয়) এবং ইজরায়েলি “শ্যাকশাউকা”র।

শ্যাকশাউকা প্রাচীন অটোমান সাম্রাজ্যের সব দেশগুলিতেই বেশ জনপ্রিয়। শুনেছি অটোমান সাম্রাজ্যের সময় এটা মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি হতো; পরে টিউনিসিয়ার ইহুদীদের হাতে পড়ে এর বর্তমান রূপটি ইজরায়েলে জনপ্রিয় হয় – টম্যাটো-পিঁয়াজ-ক্যাপ্সিকামের রঙিন ভাইদের মিশিয়ে একটা থকথকে কারির ওপর ডিমের পোচ বসিয়ে দেওয়া হয়। শ্যাকশাউকা খেতে দেওয়া হয় লোহার একটি সসপ্যানের মতো পাত্রে – তাকে বলে ট্যাজিন। আমি এটি  দুয়েকবার খেয়েছি তুর্কিস্তানে – সেখানে এর একটা ভায়রা-ভাইও চলে, যাতে টম্যাটোর বদলে বেগুন দিয়ে তৈরি হয় শ্যাকশাউকার বেস ।

01 Manali 301 Manali 4

মানালিতে আমরা অবশ্য শ্যাকশাউকা খাই নি। হোটেলের বাইরে একটা জনশুন্য ছোট রেস্তোরাঁয় আমাদের পূর্বতন প্রভূদের স্মরণ করে “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” অর্ডার করেছিলাম। দোকানদার আমাদের এই ব্যবহারে বোধহয় মর্মাহত হয়ে পড়ে – যেখানে দোকানের সামনের ব্ল্যাকবোর্ড মেনুকার্ডে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে ইজরায়েলি-স্প্যানিশ-ফ্রেঞ্চ ব্রেকফাস্ট এভেলেবল, সেখানে সেসব ফেলে শেষে সেইইইই “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” ? এই গভীর মনকষ্টেই বোধহয় বেচারার এই সাধারণ ব্রেকফাস্ট বানাতে পাক্কা ৫০ মিনিট লেগেছিলো – ততক্ষনে খিদেয় আমরা চেয়ার-টেবিল চিবিয়ে ফেলার উপক্রম করছি। অবশ্য এতে একটা উপকার হয়েছিলো – ব্রেকফাস্টটা “ব্রাঞ্চ”এ পরিনত হওয়ায় লাঞ্চটা আর খাবার দরকার পড়ে নি; শুধু আমাদের মতো দু-তিনজন ব্যোম-হ্যাংলারা বিকেলের দিকে ইয়াকের-চিজ দেওয়া উৎকৃষ্ট পিৎজা খেয়ে এসেছিলাম আমাদের হোটেলের লাগোয়া রেস্তোরাঁয় – যার মালকিন আবার এক ইজরায়েলি রমণী।

মানালিতে মারিজুয়ানার এমন অবাধ ব্যবহার অবাক করে দেবার মতন। ওল্ড মানালির প্রায় সব রেস্তোরাতেই মাটিতে বসার ব্যবস্থা আছে – বেশ গদী-বালিশ নিয়ে এলিয়ে বসে কল্কেতে টান মারা যায়। সাধরন মনিহারি দোকানে প্রকাশ্যেই নানান ধরণের কল্ককে ও তার অ্যাক্সেসরি পাওয়া যায়। এমনকি শুধু গাঁজার সরঞ্জাম বিক্রি করবার ‘এক্সক্লুসিভ” দোকানও আছে বড়ো রাস্তার ওপরেই। মানালি তো “মনুর আলয়” – শিবের তো নয়, কিন্তু চরিত্রগত দিক থেকে শিবের সঙ্গেই এর মিল বেশী। রাস্তায় ঘাটে অনেক বিদেশিনী ও স্বদেশিনীদের দেখতে পেয়েছি – বিচিত্র স্বপ্ল-পোশাক পরে ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে আছেন। জানি, জানি – তাদের ছবি পেলে আপনাদের বেশ নয়নসুখ হতো – এই তো ? ওসব পাপ কথা একদম বলবেন না – এ হচ্ছে ভ্রমণকাহিনী, ও সব রসের কথা আরেকদিন হবে অখন।

মনুর কথা ঠিক জানা নেই, তবে ওল্ড মানালির সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দারা ছিলেন কাংরা উপত্যকার যাযাবর শিকারী ও মেষপালকরা – যাদের আবার বলা হতো “রাক্ষস” (হ্যাঁ মশাই – রাক্ষস-অসুর-গান্ধর্ব-নাগ এরা সবাই নানান গোষ্ঠীই ছিলো – নেহাত বেদবাদী নয় আর গাঙ্গেয় বৈদিক প্রথা সব পালন করতো না বলে এদেরকে “মানুষ নয়” বলে ভিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো)। পরে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা যারা হলো, তাদের বলা হতো “নর”। আরো অনেক পরে একসময় এটি একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মজার কথা – এই মানালির রাজারা নিজেদের রাজা বলতেন না। তাঁরা বলতেন মানালির আসল রাজা হলেন রঘুনাথজি, তাঁরা রাজ্য চালান এই রঘুনাথজীর সেবক হিসেবে। ভরত যেভাবে রামের খড়ম রেখে রাজত্ব করতেন আর কি। এর কারণ নাকি সপ্তদশ শতাব্দীতে মানালির এক রাজা জগৎ সিংহ একদা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে বসেছিলেন। কোন চিকিৎসাতেই যখন কাজ হলো না, তখন তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে অযোধ্যা থেকে রঘুনাথজীকে (অর্থাৎ রামের এক রূপ) নিয়ে এসে তাঁকে সিংহাসনে প্রতিস্থা করেন ও নিজের হাতে তাঁর সেবা করতে শুরু করেন। কথিত আছে তাঁর দয়ায় জগৎ সিংহ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সেই থেকে মানালির রাজা থেকে যান রঘুনাথজী। এই ভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর মানালি মান্ডি রাজ্যের অংশ হয়ে যায় – যার রাজারা ছিলেন সেন পদবীধারী চন্দ্রবংশীয় রাজপুত (যাঁদের সঙ্গে আবার নাকি আমাদের বাংলার সেনবংশের কি যেন একটা লতায়-পাতায় সম্পর্ক আছে)।

আধুনিক মানালি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্রিটিশদের দাক্ষিণ্যে – যারা এখানে আপেল চাষ এবং এর নদীতে দুরকম ট্রাউট মাছের চাষ শুরু করেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলেও মান্ডি স্বাধীন রাজ্যই ছিলো, মায় ভারত স্বাধীন হওয়া অব্দি। ভারত স্বাধীন হবার পর যে ৫৬২ খানা স্বাধীন রাজ্য ভারতবর্ষে যোগ দেয় মূলত বল্লভভাই প্যাটেলের রাজনৈতিক ছক্কা-পাঞ্জার খেলায়, মান্ডি তাদের মধ্যে একটি।

01 Manali 5

মানালির কথা আর নয়। কাল আবার সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়া। ফেরবার পথে এর সঙ্গে পুনর্মিলন যখন হবে, তখন নাহয় দুচার কথা হবে। আপাতত মানালিকে আলবিদা।

পরবর্তী পর্ব – কাজা।

(চলবে)

—————————————————————————————————————————————–

উত্তরকথনঃ

মানালিতে বিপাশা নদীর ধারে বসে “নদী তুমি কথা হতে আসিতেছো” বলা ছাড়া আরো কিছু দেখবার জিনিস আছে – মনু মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির (মানালির একটু বাইরে), হিড়িম্বা মন্দির (এবং তাঁর অনতিদূরে ঘটোৎকচের খোলা মন্দির) ইত্যাদি। মনু মন্দিরটা খুবই পুরনো, কাঠের গায়ে কারুকার্য করা মন্দির – এই স্টাইলের মন্দির এই অঞ্চলে দেখা যায় খুব। হিড়িম্বা মন্দির – আর বিশেষত ঘটোৎকচের খোলা মন্দির দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এদুটিই ট্রাইবালদের (যাদের তখন রাক্ষস বলতো) দেবতার মন্দির। এর স্ট্রাকচারে নগর বা দক্ষিণী স্টাইল, কোনটাই নেই; আছে পশুর মাথা বা শিং দিয়ে সাজসজ্জা। বশিষ্ঠ মন্দির মানালির থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে, ওর কাছে শুনেছি হোমস্টে আছে। থাকতে পারেন ইচ্ছে হলে – একটু নিরিবিলি হবে। আর, ইয়ে – ছেলেদের জন্যে বলছি – সুইমিং কস্টিউম অথবা হাফপ্যান্ট নিয়ে যাবেন, আর একটা লম্বা তোয়ালে, কেমন?

—————————————————————————————————————————————–