পরমাণু গল্প ২ঃ হাওয়া

ঘুম থেকে উঠেই পারুল পিছনের বাগানে দৌড় দিলো। বাঃ, ওর গাছগুলোকে দেখতে হবে না ?

পারুলের ভাই-বোন নেই। বন্ধুও তেমন নেই – ওদের বাড়িটা মূল শহর থেকে একটু বাইরে, রাপ্তি নদীর ধারে। কুকুর-বেড়াল ওর মা দুচোখে দেখতে পারেন না, তাই তারাও নেই। ওর আছে বাড়ির পেছনের বাগানটা আর তাতে থাকা একরাশ গাছ।

গতকাল ওর বাগানের চাঁপা গাছটা ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছে। পারুলের তাই খুব আনন্দ। মনে করছে ও যেন সেই সাত ভাই চম্পার এক বোন পারুল। অবশ্য চাঁপা ফুল সাতটা নয়, তার চেয়ে ঢের বেশী। গুনে দেখলে একুশটা।

আজ সকাল থেকে খুব হাওয়া। কিন্তু ফুলগুলো ঝরে যায় নি। পারুল নিশ্চিন্ত হলো দেখে।

ফুলগুলোরও খুব মজা। হাওয়ায় মাথা দোলাতে দোলাতে নিজেদের মধ্যে খলবল করে কথা বলছে। ফুলেদের ভাষায় অবশ্য – সে ভাষা আপনি-আমি বুঝবো না।

ফুলের জন্মটা ওদের বেশ লাগছে। খুব হাওয়া এখানে। মানুষের জন্মটা তেমন সুবিধের ছিলো না। হাসপাতালে মোটে হাওয়া ছিলো না। তাই তো বড্ডো তাড়াতাড়ি মরে যেতে হলো।

অনুগল্প ১ঃ পাগলা ভুত

“খুড়ো, তুমি ভুত দেখেছো ? “

শমীবুড়োর বয়েসের গাছ পাথর নেই। কেউ বলে নব্বই, কেউ বলে একশো। তবে নব্বই-ই হোক আর একশই হোক, এখনো রোজ লাঠি ভর দিয়ে কালীর মালের ঠেকে ঠিক চলে আসে। একসময় এই অঞ্চলের নামকরা লেঠেল ছিলো তো, তাই লাঠিটা এখনো হাতের বশে আছে। এক বোতল চোলাই খায় একা একা। তারপর দোকান বন্ধের সময় কালী বুড়োকে ধরে ধরে বাড়ী পৌঁছে দেয়।

“কি বললি – ভুত?”

“হ্যাঁ খুড়ো – ভুত। জমিদারের লেঠেল হয়ে তো অনেককেই ঠেঙিয়ে মেরেছো, তাদের মধ্যে কেউ ফিরে আসে নি? তোমার ঘাড়টা মটকে দিতে?”

হাসলো শমীবুড়ো। ফোকলা দাঁতে। “দূর শালার পো – আমার ঘাড় মটকাতে আসবে কোন হারামির বাচ্চা রে? তবে কিনা…”

“তবে কিনা কি?” ছেলেপিলের দল ঘিরে ধরলো শমীবুড়োকে। কাজ কম্ম কিছু নেই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে, একটু জমাটি আড্ডা না হলে চলবে কেমন করে ?

“না, মানে এক ব্যাটা সম্বন্ধীর পো ফিরে এসেছিলো। কিন্ত সে শালা ভুত কিনা কে জানে।“

“মানে?”

শমীবুড়ো একটু গম্ভীর হলো। চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। এই সময় কালী একটু কিছু দিয়ে যায় – মুড়ি, চানাচুর, তেলেভাজা, যাই হোক। সেই একগাল চানাচুর মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললো বুড়ো

“তবে শোন। সেই বন্যার পরের বছর – যেবার ভূমিকম্পও হয়েছিলো পরে, সেই বছর একটা লোককে পিটিয়েছিলুম খুব। জমিদারবাবু বলেছিলো। শালা নাকি কি সব ধম্মের নামে বলছিলো – আমাদের বামুনঠাকুররা সেই নিয়ে নালিশ কল্লে জমিদারবাবুর কাছে। আমাদের কত্তামশাইএর তো দেবদ্বিজে খুব ভক্ত, অমনি তেড়ে মেড়ে উঠলেন। লোকটাকে ধরে এনে গাঁয়ের মধ্যে ওর বিচার হলো। কথা হলো ওকে গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। আর আমাকে কত্তামশাই আলাদা করে কাজ দিলেন – শয়তানের শেষ রাখবি না। রাখিও না। ব্যাটাকে দুর্দান্ত পিটলাম, তারপর ওই যে কাঠের ইলেকটিরির থাম আছে, তার গায়ে টাঙিয়ে দিলুম। পরে রাতের দিকে শালাকে নামিয়ে একটা গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে দিলাম। “

“তারপর ?”

শমীবুড়ো গেলাসে বড়ো চুমুক দিলো। তারপর বললো
“পরে ভাবলুম গোর দেওয়াটা ঠিক নয়, ব্যাটাকে পুড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। তা দুদিন পরে গিয়ে ওই যেখানে গোর দিয়েছিলাম, সেখানে খুঁড়তে গিয়ে দেখি লাশ হাওয়া !”

“বলো কি?”

“তবে আর বলছি কি! ব্যাপারটা কি হলো ভাবতে ভাবতে এই কালীর দোকানে এসে একটু বসেছি, দেখি কি সেই লোকটা কোত্থেকে এসে পড়েছে। মাথায় রক্তের দাগ, আমি যে ওকে টাঙিয়ে রেখেছিলাম, তার দাগ হাতে।“

“কি সব্বোনাস! তারপর ? কি করলো সে?”

“কিছুই না। আমার কাছে এসে হাসলো। আমার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর ওপর দিকে মুখ তুলে বললো “ওর দোষ ধরো না ঠাকুর। ও জানে না ও কি করছে।“

“এতো মরে ভুত হয়ে পাগলা হয়ে গেছে। হে হে হে হে পাগলা ভুত।“ ভিড়ের থেকে কে যেন বলে উঠলো।

“তা খুড়ো, এই লোকটার নাম কি ছিলো?”

“নামটাও  আজব। কিস্টো।“

“কি ? কেষ্ট ?”

“না না। কেষ্ট নয়। কিস্টো। কিস্টো।“


প্রথম প্রকাশ ঃ ফেবু – ১৪-এপ্রিল-২০১৭; গুড ফ্রাইডে