পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ৩

তৃতীয় পর্বঃ কুনজুম পেরিয়ে কাজা

দিল্লির ট্র্যাভেল কোম্পানিদের মধ্যে কুনজুম পাস নিয়ে একটা আবেগমিশ্রিত রোম্যান্টিসিজম আছে। দিল্লিতে কুনজুম ক্যাফে নামে একটা অতীব জনপ্রিয় “ট্র্যাভেল ক্যাফে” আছে, তাছাড়া গোটা চারেক কুনজুম নামের ট্যুর-অ্যান্ড-ট্র্যাভেল কোম্পানি আছে। যাই হোক, আসল কুনজুম লা হলো লাহুল আর স্পিতির মধ্যবর্তী ১৫০০০ ফিট উচ্চতার অপূর্ব সুন্দর একটি গিরিপথ। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে যাতায়তের গাড়ি যাবার উপযুক্ত পাকা রাস্তা এই একটিই – অবশ্য যদি ঝুরঝুরে পাথরের কুঁচি আর নুড়ির রাস্তাকে পাকা রাস্তা বলে স্বীকার করেন, তবেই।

কুনজুম লা এর উচ্চতম জায়গায় পৌঁছে দেখতে পাওয়া যায় তিনটি বৌদ্ধ স্থুপ, যার তিব্বতী নাম চোরটেন। চোরটেনের প্রতিটি অংশের একটি করে প্রতীকী অর্থ আছে (সেগুলো আবার স্থানবিশেষে একটু আলাদা; অর্থাৎ তিব্বত, ভূটান বা শ্রীলঙ্কার চোরটেনের চেহারা এবং তার অংশের প্রতীকী ব্যাখ্যায় সামান্য তফাত আছে)। তিব্বতী স্থুপ বা চোরটেনের একদম নিচের যে চৌকো অংশটি, তা হলো পৃথিবীর প্রতীক। তার ওপর যে উল্টোনো ট্র্যাপিজয়েডের মতন অংশ (যেটার ভালো নাম “বুমপা”), সেটা জলের প্রতীক। বুমপার ওপর তেরোটি চুড়ির লম্বা খাম্বাটি (যার নিচের অংশের নাম “হার্মিকা” আর চুড়িগুলির নাম “ভূমি”) হলো অগ্নির প্রতীক। তার ওপরের মুকুটের মতো জিনিসটি (নাম পারাসল) হলো বায়ু আর তারও ওপরে চন্দ্র-সূর্য-রত্ন হলো শূন্য। অর্থাৎ আমাদের ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম পঞ্চভূতের এর তিব্বতী ভার্সন আর কি! আবার চোরটেনকে ধ্যানরত বুদ্ধের রূপ হিসেবেও কল্পনা করা হয়, এবং সেই রূপের সঙ্গে চোরটেনের অংশগুলোর রূপক, অর্থাৎ নিচের চৌকো ধাপ – বুমপা – হার্মিকা – ভূমি – পারাসলের অর্থ পাল্টে গিয়ে হয়ে যায় বৌদ্ধ ধম্মের নানান স্তর – প্রজ্ঞ্যা-শীলা-সমাধি ইত্যাদি। একই স্থাপত্যের দুরকম রূপক কেন তার ব্যাখ্যা অন্তর্জালে পেলাম না । তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলো ওই পঞ্চভূতের সিম্বলিজমটি প্রাক-বৌদ্ধ জমানার তিব্বতী বন-পা ধর্ম থেকে এসেছে, যেটি প্রথমযুগে ছিলো মূলত প্রকৃতির উপাসনা । পরে এই বন-পা এবং বৌদ্ধ ধর্ম মিলেমিশে এখনকার তিব্বতী ধর্মের চেহারা নিয়েছে আর তাই এই চোরটেনে বন-পা এবং বৌদ্ধ, দুরকম প্রতীকই রয়েছে।

তিব্বতী ধর্ম নিয়ে পরে আবার লিখবো – এই অঞ্চলে এতো মনাস্ট্রি ছড়িয়ে আছে যে একটু সেগুলো বলে না দিলে ধরতাই পাবেন না। আপাতত চোরটেন এবং তার সিম্বলিজম নিয়ে অন্তর্জাল থেকে পাওয়া কয়েকটি ছবি জুড়ে দিলাম; এতে একটা ধারণা হবে। আর যদি “গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও” গাইতে চান, তাহলে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করতে হবে মশাই। আমার এই হালকা-ফুলকা দুলকি চালের ভ্রমণআখ্যান কোনো মতেই, যাদবপুরের ভাষায়, “মাদার” হিসেবে কাজ করবে না।

03 Stupa Section Name-4

চরটেন

03 StupaTemplate1web

চরটেন

কুনজুম পাসের তিনটি চোরটেনকে ঘিরে রেখেছে পাঁচ রঙওয়ালা তিব্বতি পতাকা, যা সব পাহাড়ি মনাস্ট্রিতেই কম বেশী দেখা যায়। এই পতাকার নাম দার-ইকগ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো “খাড়াভাবে রাখা কাপড়”। নামটি খুব গভীর অর্থপূর্ণ তা বলা চলে না, তবে এই পতাকাতে যে পাঁচটি রঙ আছে – নীল-সাদা-লাল-সবুজ-হলুদ তা হলো আকাশ-মেঘ-অগ্নি-জল-পৃথিবীর প্রতীক। মানে আবার সেই পঞ্চভূত (বায়ুর বদলে মেঘ আর শূন্যর বদলে আকাশ)। এও ওই বন-পা’র প্রভাব হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ এই পতাকাও বৌদ্ধ ধর্মের আগে থেকেই আছে। শুনলাম বহুপূর্বে এগুলো নাকি যুদ্ধের পতাকা ছিলো, পরে এটি ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এই বিভিন্ন বর্ণের আলাদা প্রতীকী ব্যাখ্যা এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।

03 Kunzum Pass (M)

তাজ্জব ব্যাপার হলো এই পাক্কা তিব্বতী বৌদ্ধ অঞ্চলে, দার-ইকগ-বেষ্টিত তিব্বতি চোরটেনগুলির গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মন্দির, যার নাম কুনজুম মাতার মন্দির। কুনজুম মাতা আসলে দুর্গার এক রূপ – তিনিই নাকি এই কুনজুম পাসের দেখভাল করেন যাতে এখানে কোনো অঘটন না ঘটে। তাই সব ড্রাইভাররাই মাতার স্থলে একবার মাথা না ঠেকিয়ে এগোয় না।

03 kunjum mata

কুনজুম মাতার মন্দিরে আবার নিজের মনস্কামনা পূর্ণ হলো কিনা বোঝবার একদম স্পটচেক সিস্টেম আছে। মন্দিরে প্রণাম করে মনে মনে কিছু কামনা করে যে কোন মুল্যের একটি মুদ্রা মন্দিরের সামনের পাথরে ঠেকাতে হবে। পাথরটি একটি চুম্বকের মতো, আপনার মুদ্রাটি যদি আটকে যায়, তার মানে আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবেই। সত্যি দেখলাম অজস্র মুদ্রা আটকে রয়েছে ওই পাথরে। এই ব্যাপারটা তো জানা ছিলো না, কাজেই আমি দেবীর কাছে কিছু না চেয়ে এমনিই একটা মুদ্রা ঠেকিয়েছিলাম। “কিছু-চাই-না-কিন্তু-কয়েন-ঠেকাবো” এই আবদারে নিশ্চয়ই স্পটচেক সিস্টেমে ডিভাইডেড-বাই-জিরো গোছের কিছু এরর এসে গিয়ে থাকবে, তাই আমার কয়েনটি আটকালো না সেখানে। পাঠকগন, আশা করি খেয়াল করেছেন যে এই দেবীর কাছে মুখফুটে কিছু না চাওয়ার ব্যাপারটাতে আমার সঙ্গে ওই সিমলেপাড়ার নরেণ দত্তের সঙ্গে আশ্চর্য মিল ? কাজেই, বুঝলেন কিনা, আমাকে ল্যাল্যা পাবলিক বলে হ্যাটা করবেন না। হেঃ !!

কুনজুম পেরিয়ে গেলেই আমরা লাহুল ছেড়ে ঢুকে পড়ি স্পিতিতে। কুনজুমে শেষ বারের মতো দেখা যায় গেইফাং পর্বতচূড়া – লাহুলের প্রাচীন আরাধ্য দেবতা গেইফাংএর নামে। গেইফাংএর নাকি একটিই মন্দির আছে, সিসু নামের একটা পুঁচকে গ্রামে। তিন বছরে একবার করে তার মূর্তি নিয়ে যাত্রা হয়, কতকটা জগন্নাথের রথের মতন। সিসু আমাদের রাস্তায় পড়বে না, সেটা কেলংএর দিকে। তাছাড়া ওই মন্দিরে বাইরের লোকেদের যাওয়াটা নাকি লাহুলিদের ঠিক পছন্দ করে না।

কুনজুম পেরিয়েই হঠাৎ পেলাম সবুজ কেয়ারি করা ঘাসের একটা উপত্যকা, সেখানে ইতস্তত কয়েকটি ঘোড়া চরছে। এতক্ষণ রুক্ষ খয়েরি খিটখিটে দেখতে পাহাড়ের পর আচমকা একরাশ সবুজ দেখে চোখের ভারী তৃপ্তি হলো। পাঠক হিসেবে তো আমি একেবারে চার-আনার পাবলিক – পেডিগ্রিওয়ালা সাহিত্যপ্রেমী নই, তাই কোন বিখ্যাত কবিতা-টবিতা আমার মনে পড়ে নি। বরং মনে পড়লো প্রফেসার শঙ্কুর একশৃঙ্গ অভিযান-এর সেই অসামান্য সবুজ কল্পনার ডুংলুং-ডো রাজ্যের বর্ণনা – স্পিতি জায়গাটা প্রাচীন তিব্বত রাজ্যের অংশ বলেই বোধহয়।

03 Valley after Kunzum

স্পিতিতে ঢুকে দেখলাম আমাদের পাশে আর চন্দ্রা নদী নেই। আছে একটি নতুন নদী, যার নাম – ঠিক ধরেছেন – স্পিতি নদী। তবে ক্রমাগত ল্যান্ডস্লাইডে পাথর মাটি পড়ে সে নদী নিতান্ত শীর্ণকায়া, তবুও নদী বটে। তার ধার ধরে যেতে যেতে গিয়ে পড়লাম লোসার-এ। এরপর রামরিখ পেরিয়ে, একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর লোহার পুল পেরিয়ে কাজা। এই রামরিখের একটু আগে রাস্তাটা অনেকটা ভালো হয়ে হয়ে যাওয়ায় কাজার আগে মাজার ব্যথাটা একটু কমে এসেছিলো।

02A Spiti River

কাজার সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গা হলো শাক্য মনাস্ট্রি যার আরেকটা নাম শাক্য তানগুড মনাস্ট্রি। এটির অবস্থান হলো কাজার দ্বিতীয় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা – কাজার পেট্রোলপাম্প (এই অঞ্চলের একমাত্র পেট্রোলপাম্প) – তার ঠিক পাশেই। এই অঞ্চলের মনাস্ট্রি মাত্রেই বেশ রংচঙে, এটা ব্যতিক্রম তো নয়ই – বরঞ্চ রীতিমত রঙ্গিলা। ভেতরে ছবি তুলতে দেয় না (বেশীরভাগ মনাস্ট্রিতেই তাই), যদিও আমি লুকিয়ে লুকিয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম। ভেতরে ঢুকে দেখি কেউ কোত্থাও নেই, তাই উদাসভাবে এদিক ওদিক কারুকার্য দেখার ভান করতে করতে ঘুরছি। একসময় ফাঁকায় ফাঁকায় অতি সন্তর্পণে মোবাইলটা বের করে খুচ করে ছবিটা তুলতে যাচ্ছি, ওমনি দেখি একটা বাচ্চা লামা জুলজুল আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম নির্ঘাত চেল্লা-মেল্লি করে মহা হট্টগণ্ডগোল বাধাবে, তা করলো না – কারণ সেও এই লোকজন না থাকায় ওই গুম্ফার মূল বেদী থেকে একটা রংচঙে ঢাক নামিয়ে সেটাকে বাজাবার পরিকল্পনা করছিলো। দুই অপরাধীর এই অকস্মাৎ শুভদৃষ্টির ফলবশত ছোকরা ঢাকটা আবার বেদীতে তুলে রেখে উদাসভাবে কোথায় যেন চলে গেল আর আমার হাতটা বেমক্কা নড়ে গিয়ে ছবিটা খুব বাজে উঠলো। তা সত্ত্বেও ছবিটা দিয়ে দিলাম – এইটে বোঝাবার জন্যে যে পাপের ফল ভালো হয় না।

03 Inside Sakya Monastry03 Sakya Monastry corridor

শাক্য মনাস্ট্রির সামনেই আছে একসার চোরটেন – যে চোরটেন হলো – আচ্ছা, আচ্ছা – চোরটেন নিয়ে আর একটি কথাও বলবো না। অতো রেগে যাবার কি আছে মশাই? আচ্ছা শাক্য মানে কি জানেন তো ? প্রাচীন ভারতের মোটামুটি খৃষ্টপূর্ব দশম থেকে পঞ্চম শতাব্দী – এই সময় এরা নেপাল আর ভারতের একটা অংশে বাস করতো। এদের নিজস্ব রাজত্ব ছিলো – তবে সেটাকে অভিজাত-তন্ত্র বললেই চলে। সেনানায়করা এবং রাজ্যের প্রধান কিছু লোকে মিলে আলোচনা করে তাদের শাসক স্থির করতো। এই গোষ্ঠীর রাজধানী তথা প্রধান শহর ছিলো কপিলাবস্তু এবং এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন – বুঝে ফেলেছেন নিশ্চয়ই – শাক্যসিংহ অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধ।

03 Chortens at Kaza

কাজাতে আমরা তিন রাত্তির ছিলাম। যে হোটেলে ছিলাম, সেটা এই শাক্য মনাস্ট্রির পাশেই, তার নাম – যা ভেবেছেন তাই – শাক্য এবোড। এখান থেকেই আমরা গিয়েছিলাম আশেপাশের ছোট্ট ছোট্ট গ্রামগুলোতে – কী-কিব্বের-লাংজা-হিকিম-কমিক, এইগুলো। তবে সে হলো পরের পর্বের গল্প।

03 Kaza Market

এখন আমরা কাজার বড়ো রাস্তা ছেড়ে নিচে নেমে নদী পেরিয়ে যাবো ওপারে। অর্থাৎ কাজা খাস (পুরনো কাজা) ছেড়ে কাজা সোমা (নতুন কাজা)। যেখানে বাজার-হাট রয়েছে। সেখান থেকে কিনবো একটু দারচিনি, পাতি লেবু আর একবোতল “বৃদ্ধ সন্ন্যাসী” – মোহনমেকিন কোম্পানির অমর সৃষ্টি, আমাদের অনেক সুখ-দুঃখের দিনের সাথী।

কবোষ্ণ জলে এগুলো মিশিয়ে এট্টু না খেলে গায়ের ব্যথা মরবে নাকি?

(চলবে)

————————————————

উত্তরকথনঃ

ওল্ড মঙ্কের কথা লিখলাম বটে, কিন্তু এইসব পাহাড়ে মদ না খাওয়াই ভালো। ডি-হাইড্রেশন হয়ে মাউনটেন সিকনেস বেড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। আমাদের সহযাত্রীদের একজন, তার নাম বলা বারণ, আরেকজনের প্ররোচনায় (তারও নাম বলা বারণ) ঢকঢক করে একপেগ ওল্ড মঙ্ক মেরে দিয়ে বাকি যাত্রায় কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। কাজেই মন্দার বোসের মতো “স্রেফ হরলিক্স” ।

কাজা সোমার বাজারের পাশে “হিমালায়ান ক্যাফে” বলে একটা ক্যাফে-রেস্তোরাঁ আছে, বেশ নামকরা। আমাদের যাওয়া হয় নি, আপনারা কিন্তু যাবেন অবশ্যই।

অনুগল্প ১ঃ পাগলা ভুত

“খুড়ো, তুমি ভুত দেখেছো ? “

শমীবুড়োর বয়েসের গাছ পাথর নেই। কেউ বলে নব্বই, কেউ বলে একশো। তবে নব্বই-ই হোক আর একশই হোক, এখনো রোজ লাঠি ভর দিয়ে কালীর মালের ঠেকে ঠিক চলে আসে। একসময় এই অঞ্চলের নামকরা লেঠেল ছিলো তো, তাই লাঠিটা এখনো হাতের বশে আছে। এক বোতল চোলাই খায় একা একা। তারপর দোকান বন্ধের সময় কালী বুড়োকে ধরে ধরে বাড়ী পৌঁছে দেয়।

“কি বললি – ভুত?”

“হ্যাঁ খুড়ো – ভুত। জমিদারের লেঠেল হয়ে তো অনেককেই ঠেঙিয়ে মেরেছো, তাদের মধ্যে কেউ ফিরে আসে নি? তোমার ঘাড়টা মটকে দিতে?”

হাসলো শমীবুড়ো। ফোকলা দাঁতে। “দূর শালার পো – আমার ঘাড় মটকাতে আসবে কোন হারামির বাচ্চা রে? তবে কিনা…”

“তবে কিনা কি?” ছেলেপিলের দল ঘিরে ধরলো শমীবুড়োকে। কাজ কম্ম কিছু নেই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে, একটু জমাটি আড্ডা না হলে চলবে কেমন করে ?

“না, মানে এক ব্যাটা সম্বন্ধীর পো ফিরে এসেছিলো। কিন্ত সে শালা ভুত কিনা কে জানে।“

“মানে?”

শমীবুড়ো একটু গম্ভীর হলো। চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। এই সময় কালী একটু কিছু দিয়ে যায় – মুড়ি, চানাচুর, তেলেভাজা, যাই হোক। সেই একগাল চানাচুর মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললো বুড়ো

“তবে শোন। সেই বন্যার পরের বছর – যেবার ভূমিকম্পও হয়েছিলো পরে, সেই বছর একটা লোককে পিটিয়েছিলুম খুব। জমিদারবাবু বলেছিলো। শালা নাকি কি সব ধম্মের নামে বলছিলো – আমাদের বামুনঠাকুররা সেই নিয়ে নালিশ কল্লে জমিদারবাবুর কাছে। আমাদের কত্তামশাইএর তো দেবদ্বিজে খুব ভক্ত, অমনি তেড়ে মেড়ে উঠলেন। লোকটাকে ধরে এনে গাঁয়ের মধ্যে ওর বিচার হলো। কথা হলো ওকে গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। আর আমাকে কত্তামশাই আলাদা করে কাজ দিলেন – শয়তানের শেষ রাখবি না। রাখিও না। ব্যাটাকে দুর্দান্ত পিটলাম, তারপর ওই যে কাঠের ইলেকটিরির থাম আছে, তার গায়ে টাঙিয়ে দিলুম। পরে রাতের দিকে শালাকে নামিয়ে একটা গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে দিলাম। “

“তারপর ?”

শমীবুড়ো গেলাসে বড়ো চুমুক দিলো। তারপর বললো
“পরে ভাবলুম গোর দেওয়াটা ঠিক নয়, ব্যাটাকে পুড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। তা দুদিন পরে গিয়ে ওই যেখানে গোর দিয়েছিলাম, সেখানে খুঁড়তে গিয়ে দেখি লাশ হাওয়া !”

“বলো কি?”

“তবে আর বলছি কি! ব্যাপারটা কি হলো ভাবতে ভাবতে এই কালীর দোকানে এসে একটু বসেছি, দেখি কি সেই লোকটা কোত্থেকে এসে পড়েছে। মাথায় রক্তের দাগ, আমি যে ওকে টাঙিয়ে রেখেছিলাম, তার দাগ হাতে।“

“কি সব্বোনাস! তারপর ? কি করলো সে?”

“কিছুই না। আমার কাছে এসে হাসলো। আমার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর ওপর দিকে মুখ তুলে বললো “ওর দোষ ধরো না ঠাকুর। ও জানে না ও কি করছে।“

“এতো মরে ভুত হয়ে পাগলা হয়ে গেছে। হে হে হে হে পাগলা ভুত।“ ভিড়ের থেকে কে যেন বলে উঠলো।

“তা খুড়ো, এই লোকটার নাম কি ছিলো?”

“নামটাও  আজব। কিস্টো।“

“কি ? কেষ্ট ?”

“না না। কেষ্ট নয়। কিস্টো। কিস্টো।“


প্রথম প্রকাশ ঃ ফেবু – ১৪-এপ্রিল-২০১৭; গুড ফ্রাইডে