অনুগল্প ৩ঃ এক বর্ষণমুখর প্রভাতের কথা

পূজো শেষ করে ঘাটে চুপ বসেছিলেন ঠাকুরমশাই। আকাশে কালো মেঘ, সূর্যের দেখা নেই। বৃষ্টি আসবে।

পিছন থেকে একটা গলা খাকরানির আওয়াজ পেয়ে ঠাকুরমশাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন। কিছু বলবার দরকার হলো না, শিষ্যের মুখ দেখেই ঠাকুর বুঝে ফেললেন কি হয়েছে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করলেন।

প্রতি বছরই এই হয়। এই দিনটায় এসে ব্রাহ্মণী বড্ড বিচলিত হয়ে পড়েন। সামলে রাখা যায় না তখন।

হন হন করে ঠাকুরমশাই হাঁটতে লাগলেন নিজের কুটিরের দিকে। এই সময়গুলোতে অসহায় বোধ করেন উনি। রাগ হয়ে যায় তখন। ব্রাহ্মণীর এই অবুঝপনার সত্যি কোন মানে হয় না। এতোগুলো বছর কেটে যাবার পরেও…

কুটিরে ঢোকবার মুখে হাঁসটা এসে পায়ে ঠুকরে দিলো। উহুহুহু করে উঠলেন ঠাকুরমশাই।  ব্রাহ্মণীর যতো উৎকট শখ। হাঁস আবার কেউ পোষে নাকি ? রাগটা আরও চাগিয়ে উঠলো ওনার।

ঘরে ঢুকে ঠাকুরমশাই একটু থমকে গেলেন। ভেবেছিলেন বাড়িতে ঢুকেই ব্রাহ্মণীকে বেশ দু-কথা শোনাবেন। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখলেন ঘর অন্ধকার। বাইরের ঘন মেঘ সত্ত্বেও ঘরে আলো জ্বালা হয় নি। শ্বেতবস্ত্রা ব্রাহ্মণীকে আবছা দেখা যাচ্ছে – জানালার পাশে।  মুখখানা হাতে ভর দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। যন্ত্রটা অবহেলায় কোলের পড়ে রয়েছে। ব্রাহ্মণের পায়ের আওয়াজ পেয়েও মুখ ঘোরালেন না।

ঠাকুরমশাই আস্তে আস্তে ব্রাহ্মণীর পাশে এসে বসলেন। কি বলবেন ভেবে পেলেন না। শুধু দেখলেন ব্রাহ্মণীর চোখের কোলে একটি মাত্র অশ্রূ শিশিরবিন্দুর মতো লেগে রয়েছে।

ঠাকুরমশাই খুব নরম সুরে বললেন “এরকম করছো কেন বলো তো! এরকম করতে নেই।“ ছায়ামূর্তি উত্তর দিলো না।

ঠাকুরমশাই আবার খুব নরম সুরে বললেন “এরকম ভাবে নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। ও তো আর ফিরবে না। এতোগুলো বছর তো কেটে গেলো…”

“হ্যাঁ, এতগুলো বছর।“ বললেন ব্রাহ্মণী। “ওর মতো কেউ তো এলো না গো। তুমিও তো আর কাউকে আনতে পারলে না। পারলে ?”

প্রজাপতি ব্রহ্মা চুপ করে রইলেন। হঠাৎ ওই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার জন্যে বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠলো। একটা অক্ষম বেদনা পাঁজরে এসে ধাক্কা দিলো। মনটা বড্ডো খারাপ হয়ে গেলো ওনার।

সত্যি কতোগুলো বছর কেটে গেলো। আর কেউ এলো না, যার হাতে সরস্বতী তাঁর বীণাখানি তুলে দিতে পারেন। বলতে পারেন

“এই নে আমার বীণা, দিনু তোরে উপহার।

যে গান গাহিতে সাধ, ধ্বনিবে ইহার তার।“

আজকের দিনেই ছেলেটা চলে গিয়েছিলো। ছিয়াত্তর বছর আগে। ২২শে শ্রাবণে।

———————————————————————————————————————————

৮.৮.২০১৭

অনুগল্প ২: নিছক বিরিয়ানির গল্প

“শতরঞ্চ কি খিলাড়ী। তাঁর হাত ধরেই কলকাতায় এসেছিলো বিরিয়ানি। আর তার রূপান্তর হয়ে সৃষ্টি হলো কলকাতার বিরিয়ানি। সিরাজের বিরিয়ানি। আমিনিয়ার বিরিয়ানি। আপনার, আমার প্রানের আরাম, মনের শান্তি। কি বুঝলেন?”

“তা যা বলেছেন। কলকাতার বিরিয়ানি একটা অপার্থিব জিনিস মশায়।“

“ঠিক মতো বানালে তবে। তাওয়াতে শুকনো করে ভাজা গোটা মশলা। ঘি দিয়ে ভাজা পিঁয়াজ। ডেকচিতে স্তরে স্তরে মাংস আর বিরিয়ানির চাল। তার সঙ্গে মসলিনে মুড়িয়ে সঠিক পরিমানে মশলা। একগাদা দিয়ে দিলেই সর্বনাশ। সঙ্গে কেওড়ার জল আর এক ফোঁটা মিষ্টি আতর। আহা, আহা – যেন সেতারের সুর !“

“সিরাজের মতো কিন্ত কারুর নয়, বলুন!”

“না না, সেটা অন্যায় কথা। আমিনিয়া ? যেখানে একসময় মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের ভিড় থাকতো?

“ওদের আমিনিয়া স্পেশালটা দারুণ !“

“তেমনি উমদা চাঁপ আর রেজালা। যদিও চাঁপটা রয়েল বেশী ভালো করে।“

“রয়েলের বিরিয়ানিও তো খুব ভালো।“

“তা ভালো, তবে আমি সিরাজ আর আমিনিয়ার স্ট্যান্ডার্ডে ফেলবো না মশাই। তার বদলে বরং রেহমানিয়া বেশী ভালো ছিলো।“

“আর অ্যাম্বার এর নার্গিসি বিরিয়ানি ?”

“অন্য ঘরানার, সব হতে আলাদা,  মধুর। এমনকি ওদের সিস্টার কনসার্ন সাগর-এর থেকেও আলাদা। সুনীল-সমরেশ বসু-শংকর-বিমল মিত্রদের মাঝখানে যেন একপীস কমলকুমার মজুমদার। “

“এর সঙ্গে শেষ পাতের ফির্নি ?”

“সেজন্যে তো আবার আমিনিয়াতে ফিরে যেতে হবে ভাই। ফির্নির বাটি উল্টো করে দেখিয়ে দেবে কতো ভালো জমেছে। তবে না! “

এই সময় পর্দা সরিয়ে সুমিতা ঘরে ঢুকে বললো “লাঞ্চ টাইম। খাবার দিচ্ছি।“

“কি আছে ম্যাডাম ?”

“পেঁপের ঝোল আর ভাত।“

সুমিতা পেছন ফিরতেই অবিনাশবাবু বললেন “ওই মাগীর মাথায় ঢেলে দিতে হয় ওই পেঁপের ঝোল!”

“আহা, বড্ডো রেগে যাচ্ছেন।“

“রাগ হবে না?”

“ওর কি দোষ বলুন? গলব্লাডার অপারেশান করবার পাঁচদিনের মাথায় কি বিরিয়ানি দেবে নাকি? তাছাড়া বিরিয়ানি কোন হাসপাতালেরই পথ্য হিসেবে দেওয়া হয় না।“

————————————————————————————————————————————

প্রথম প্রকাশ ঃ ফেবু , ২৪-এপ্রিল-২০১৭

অনুগল্প ১ঃ পাগলা ভুত

“খুড়ো, তুমি ভুত দেখেছো ? “

শমীবুড়োর বয়েসের গাছ পাথর নেই। কেউ বলে নব্বই, কেউ বলে একশো। তবে নব্বই-ই হোক আর একশই হোক, এখনো রোজ লাঠি ভর দিয়ে কালীর মালের ঠেকে ঠিক চলে আসে। একসময় এই অঞ্চলের নামকরা লেঠেল ছিলো তো, তাই লাঠিটা এখনো হাতের বশে আছে। এক বোতল চোলাই খায় একা একা। তারপর দোকান বন্ধের সময় কালী বুড়োকে ধরে ধরে বাড়ী পৌঁছে দেয়।

“কি বললি – ভুত?”

“হ্যাঁ খুড়ো – ভুত। জমিদারের লেঠেল হয়ে তো অনেককেই ঠেঙিয়ে মেরেছো, তাদের মধ্যে কেউ ফিরে আসে নি? তোমার ঘাড়টা মটকে দিতে?”

হাসলো শমীবুড়ো। ফোকলা দাঁতে। “দূর শালার পো – আমার ঘাড় মটকাতে আসবে কোন হারামির বাচ্চা রে? তবে কিনা…”

“তবে কিনা কি?” ছেলেপিলের দল ঘিরে ধরলো শমীবুড়োকে। কাজ কম্ম কিছু নেই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে, একটু জমাটি আড্ডা না হলে চলবে কেমন করে ?

“না, মানে এক ব্যাটা সম্বন্ধীর পো ফিরে এসেছিলো। কিন্ত সে শালা ভুত কিনা কে জানে।“

“মানে?”

শমীবুড়ো একটু গম্ভীর হলো। চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। এই সময় কালী একটু কিছু দিয়ে যায় – মুড়ি, চানাচুর, তেলেভাজা, যাই হোক। সেই একগাল চানাচুর মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললো বুড়ো

“তবে শোন। সেই বন্যার পরের বছর – যেবার ভূমিকম্পও হয়েছিলো পরে, সেই বছর একটা লোককে পিটিয়েছিলুম খুব। জমিদারবাবু বলেছিলো। শালা নাকি কি সব ধম্মের নামে বলছিলো – আমাদের বামুনঠাকুররা সেই নিয়ে নালিশ কল্লে জমিদারবাবুর কাছে। আমাদের কত্তামশাইএর তো দেবদ্বিজে খুব ভক্ত, অমনি তেড়ে মেড়ে উঠলেন। লোকটাকে ধরে এনে গাঁয়ের মধ্যে ওর বিচার হলো। কথা হলো ওকে গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। আর আমাকে কত্তামশাই আলাদা করে কাজ দিলেন – শয়তানের শেষ রাখবি না। রাখিও না। ব্যাটাকে দুর্দান্ত পিটলাম, তারপর ওই যে কাঠের ইলেকটিরির থাম আছে, তার গায়ে টাঙিয়ে দিলুম। পরে রাতের দিকে শালাকে নামিয়ে একটা গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে দিলাম। “

“তারপর ?”

শমীবুড়ো গেলাসে বড়ো চুমুক দিলো। তারপর বললো
“পরে ভাবলুম গোর দেওয়াটা ঠিক নয়, ব্যাটাকে পুড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। তা দুদিন পরে গিয়ে ওই যেখানে গোর দিয়েছিলাম, সেখানে খুঁড়তে গিয়ে দেখি লাশ হাওয়া !”

“বলো কি?”

“তবে আর বলছি কি! ব্যাপারটা কি হলো ভাবতে ভাবতে এই কালীর দোকানে এসে একটু বসেছি, দেখি কি সেই লোকটা কোত্থেকে এসে পড়েছে। মাথায় রক্তের দাগ, আমি যে ওকে টাঙিয়ে রেখেছিলাম, তার দাগ হাতে।“

“কি সব্বোনাস! তারপর ? কি করলো সে?”

“কিছুই না। আমার কাছে এসে হাসলো। আমার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর ওপর দিকে মুখ তুলে বললো “ওর দোষ ধরো না ঠাকুর। ও জানে না ও কি করছে।“

“এতো মরে ভুত হয়ে পাগলা হয়ে গেছে। হে হে হে হে পাগলা ভুত।“ ভিড়ের থেকে কে যেন বলে উঠলো।

“তা খুড়ো, এই লোকটার নাম কি ছিলো?”

“নামটাও  আজব। কিস্টো।“

“কি ? কেষ্ট ?”

“না না। কেষ্ট নয়। কিস্টো। কিস্টো।“


প্রথম প্রকাশ ঃ ফেবু – ১৪-এপ্রিল-২০১৭; গুড ফ্রাইডে

 

অপরাহ্ণে

প্রমোদবাবু জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। বাইরে গাছের পাতাগুলো আস্তে আস্তে ঝরছে হাল্কা হাওয়ায়। কড়া রোদ, তাই কেউ বড়ো একটা নেই রাস্তায়। নিঃসঙ্গ রাস্তা।

“কি, মুখার্জি সাহেব, আসবো?” অরিন্দমবাবুর বাজখাঁই গলা ভেসে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন প্রমোদবাবু। মুখে আর চোখের কোলে একটা হাসি খেলে গেলো ওনার। চওড়া একটা হাসি মুখে মেখে নিয়ে সাড়া দিলেন একটু জোরেই—

“আসুন, আসুন অরিন্দমবাবু। আপনার কথাই ভাবছিলাম।”

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB65/LEKHA/gAtanu65.shtml

প্রথম প্রকাশ ঃ পরবাস-৬৫, ডিসেম্বর ২০১৬