অণুগল্পঃ কাজল

“আজ দেখা করবি?”
“হুঁ”
“স্কুলের পরে ?”
“হুঁ”
ফিসফিসিয়ে দুই সখীতে কথা চলছে। সামনে স্যার এদিকে পাইথাগোরাস নিয়ে ব্যস্ত।
“ভালো করে হাসা প্র্যাকটিস করেছিস তো?”
“হুঁ”
“হ্যাঁ – হাসিটা একেবারে চোখের কোলে গিয়ে পৌঁছয় যেন। চোখের তারায় ঝিলিক খেলবে, চোখের পাশের ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে হাসি ফুটে উঠবে, তবে না!”
“হ্যাঁ, সে তো বটেই। ওই চোখটাই তো শুধু দেখা যাবে। অ্যাই – আই-লাইনার দেবো রে? নাকি কাজল?
“যাই দে, কটাক্ষ ঝাড়তে ভুলিস না যেন ….”
দুই সখীতে এ-ওর গা টেপাটেপি করে হিহি হাসতে লাগলো।
না – গা টেপাটেপি নয় – অত কাছে যাওয়া এখন বারণ। সামাজিক দূরত্ব রেখে বেঞ্চের দুই কোনায় রয়েছে দুই সখী। মাঝে দু ফুট দূরত্ব।

ওদের পেছনের বেঞ্চে বসে আছে সেই ছেলেটা, যার সঙ্গে দেখা করার কথা মেয়েটার। যেহেতু দুই সখীর ফিসফিসটা তিনহাত দূর থেকে হচ্ছে, ছেলেটার কানেও আসছে সেগুলো। ভাগ্যে মাস্ক আছে মুখে, তাই ওর লাজুক হাসিটা কেউ টের পাচ্ছে না। যেমন কেউ শুনতে পাচ্ছে না ওর বুকের ভিতর বাজতে থাকা দ্রিমি-দ্রিমি বাজনা।
কালকে রাত্তিরে দেখা বাংলা ছবির ডায়লগটা মনে মনে ঝালিয়ে নিলো সে।
“তোমার চোখে কী আছে বলো তো?”

হয় তো উত্তরে বলে উঠবে “কাজল”! বলতেই পারে!

আফটার অল, এই মেয়েটার নামও তো অপর্ণা!

প্রথম প্রকাশ : ফেসবুক, ১০ মে, ২০২০

কোথা বাইরে দূরে

“এটা নিয়ে কী হবে আবার? একরাশ খরচা করলি শুধু শুধু…”

“মোটেই শুধু শুধু নয়। অনেক কাজে লাগবে। আমাদের সঙ্গে ভিডিও কলিং করতে পারবে। তাছাড়া ফেসবুক, হোয়াটস-অ্যাপ – তোমার বন্ধুদের সঙ্গে, দেখবে, নতুন করে যোগাযোগ হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে।”

“তুই-ও না…তুই কি ভাবিস আমার বন্ধুরা এসব ব্যবহার করে?”

“বাবা – ইউ উইল বি সারপ্রাইজড! তোমার বন্ধুদের অনেকেই বেশ টেকস্যাভি। ওই তো সমীরকাকু – যিনি এসেছিলেন কাল – তার হাতে তো একটা সামসুং এস সিরিজের ফোন ছিল। মাঝে মাঝেই তো উনি তাতে খুটখাট করছিলেন। নির্ঘাত উনি ফেসবুকে আছেন – দেখে নিও তুমি!”

“হুম – সমীর কী সব করছিলো বটে ফোন…”

কথা হচ্ছিল দেবরাজবাবু এবং তাঁর ছেলে দীপ্তর মধ্যে।

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB77/LEKHA/gAtanu77_baairedure.shtml

প্রথম প্রকাশঃ পরবাস-৭৭, জানুয়ারি , ২০২০

পছন্দ হলে একটু আমার ব্লগে কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ ?

ইন্টারভিউয়ের পরে

শার্ট আর তার সঙ্গে মানানসই টাই পছন্দ করতে আজকে অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই সময় লাগলো অনিরুদ্ধ মিত্রের। শেষমেশ হেরিংবন সাদা ট্যুইডের সঙ্গে পরলেন চওড়া ঘননীল টাই আর সিংগল প্লিটের কালো ট্রাউজার। আর চকচকে কালো জুতো। লিফটে নামতে নামতে ভেবে নিলেন যে কলেজে যাবার জন্যে রাস্তাটুকু আজ একটু দ্রুত হাঁটবেন। পোশাক পরতে যে দেরিটুকু হলো, সেটা মেকআপ করতে হবে তো!

আজকের দিনটা অ্যান্ডি—মানে অনিরুদ্ধ মিত্রের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আজ টেক্সাস টেকনোলজি আসছে ওঁর কলেজে।

এই আমেরিকান কোম্পানিটি এই প্রথম যাদবপুর ইউনিভারসিটিতে ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টে এলো। নতুন কোম্পানি, কিন্তু আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে এঁরা একেবারে যাকে বলে “কাটিং এজ” কাজ করছেন। …

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB76/LEKHA/gAtanu76_interview.shtml

প্রথম প্রকাশঃ পরবাস-৭৬, অক্টোবর , ২০১৯

পছন্দ হলে একটু আমার ব্লগে কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ ?

দুধেল গাই

একদা স্বীয় ইস্পাত বেলন কারখানার গদিতে বসিয়া একটি প্রমাণ সাইজের লস্যির গেলাসে চুমুক দিয়া অকস্মাৎ আকাশবাবুর একটি দুধেল গাই কিনিবার সাধ হইলো।

সামনেই বসে ছিলেন তাঁর ‘খাস আদমি’ — প্রোডাকশন ম্যানেজার ভক্তিবাবু — ভক্তিনারায়ন রাই। অনেকদিন ধরে আছেন — প্রায় বছর পনেরো হয়ে গেল। আকাশবাবুর থেকে বেশ কিছুটা বড় হলেও দুজনের মধ্যে বেশ একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। এঁকে আকাশবাবু বেশ মন খুলে নিজের কথা বলতে পারেন। এক্ষেত্রেও আকাশবাবু তাঁর কাছেই এই নতুন প্রস্তাবটি রাখলেন।

“কেন, লস্যিটা পছন্দ হল না? মানে খাঁটি দুধ হলে বেশি ভালো হবে…।” জিগ্যেস করলেন ভক্তিবাবু।

“আহা — সে জন্যে বলছি নাকি? গরু রাখা যেকোন ব্যবসাদার পরিবারের কালচার, ভাই! গোমাতা ব্যবসার লক্ষ্মী, জানেন না?”

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB76/LEKHA/gAtanu76_dudhelgaai.shtml

প্রথম প্রকাশঃ পরবাস-৭৬, অক্টোবর , ২০১৯

পছন্দ হলে একটু আমার ব্লগে কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ ?

দুই বুড়োর আখ্যান

“মেয়েটা একদম গোল্লায় গেছে কিন্তু,” বললেন মানসবাবু। “আর সেটা হয়েছে সম্পূর্ণ আপনার আশকারাতে।“

“আহা – আমি আবার কি করলাম! আর মেয়েটাই বা কি দোষ করলো?“ একটু থতমত অসহায়তা মিশিয়ে বললেন প্রসূনবাবু। উনি সবসময় এটা থতমতময় অবস্থায়ই থাকেন। স্ত্রী মারা যাবার পর সেটা আরো বেড়েছে।

“সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, একবার জিজ্ঞেস করবে তো চা বা কফির কথা! ছোটটি তো নেই, যথেষ্ট বড়ো হয়েছে – একটা কাণ্ডজ্ঞান হবে না?”

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB75/LEKHA/gAtanu75_duiburo.shtml

প্রথম প্রকাশঃ পরবাস-৭৫, জুন, ২০১৯

পছন্দ হলে একটু আমার ব্লগে কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ ?

অন্ধকারে

আততায়ী নিঃশ্বাস বন্ধ দাঁড়িয়ে আছে একটা থামের আড়ালে। একতলার এই অংশটা গাড়ির পার্কিং – তাই এখানে আলো খুব কম। চট করে কারোর চোখে পড়ার সম্ভবনা প্রায় নেই।

এখন অপেক্ষা, কখন রাতের গার্ডরা আসে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। একটু বাদেই দুদিক থেকে দুজন গার্ড এসে মুখোমুখি দাঁড়ালো। কথা বললো না, শুধু একবার ঘাড় হেলিয়ে একে ওপরের পাশ দিয়ে চলে গেল। সিকিউরিটি প্রোটোকল তাই বলে।

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB75/LEKHA/gAtanu75_andhakare.shtml

প্রথম প্রকাশঃ পরবাস-৭৫, জুন, ২০১৯

পছন্দ হলে একটু আমার ব্লগে কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ ?

ঘুষ

খেয়াল করে দেখেছেন, ঘুষ দেবার পর শিরদাঁড়াটা আর সোজা থাকে না? কেমন কোলকুঁজো করে দেয় মানুষকে? দেখেছেন?

বাড়ির পেছনের বাজারে চা খেতে গেছি। সেখানে একটা “রাজস্থানী” চায়ের দোকান আছে – খুব নাম। সবসময়ই বেশ ভিড়, মাঝেমাঝে লাইনও পড়ে যায়। দামও অন্য চায়ের দোকানের চেয়ে বেশি – ১৫ টাকা। মাটির ভাঁড়ে চা দেয় – বেশ বড়ো ডিজাইন-করা ভাঁড়। চায়ে নানান মশলা মেশানো থাকে, এলাচ তার মধ্যে অন্যতম। বাকিগুলো আলাদা করে বুঝতে পারি না। লোকটাও বলে না – হাজার হোক, ট্রেড সিক্রেট বলে কথা।

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB75/LEKHA/gAtanu75_ghush.shtml

প্রথম প্রকাশঃ পরবাস-৭৫, জুন, ২০১৯

পছন্দ হলে একটু আমার ব্লগে কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ ?

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৮

অন্তিম পর্বঃ চন্দ্রতাল

একটা পৌরাণিক গপ্পো শুনুন।

সে অনেক অনেককাল আগেকার কথা। সূর্যদেবের এক পুত্র ছিলো, নাম ভাগা। কি বলছেন ? সূর্যদেবের ছেলে বলে তো মনু, যম, কর্ণ এদেরকেই জানি। আরে বাবা, এর বাইরেও এদিক-সেদিক আরো অনেকে ছিলো। যাই হোক, সূর্যদেবের এক ছেলের নাম ছিলো ভাগা। আর চন্দ্রদেবের এক মেয়ে ছিলো, তার নাম – বুঝেই ফেলেছেন – চন্দ্রা। ছিলো তো ছিলো, এরা বেশ নিজের মনে ফুর্তিতে দিন কাটাচ্ছিলো। একদা এই দুটি তরুণ-তরুণীর দেখা হলো বারা-লাচ-লা তে। বারা-লাচ-লা কি? সেটি একটি পার্বত্য গিরিপথ, লাদাখের দিকে যেতে পড়ে। তখনকার দিনে যেরকম হতো আর কি – চারি চক্ষের মিলন হবামাত্র দ্যুলোক-ভূলোক কেঁপে উঠলো, আকাশে-বাতাসে বাঁশি আর বেহালা বেজে উঠলো আর দুজনে ওমনি একে ওপরের প্রেমে পড়ে গেল। আসলে তখন তো ছেলে-মেয়েদের এরকম ফ্রি-মিক্সিং সমাজ ছিলো না, যাকে দেখে তারই প্রেমে পড়ে যেত আর কি।

08A Bara Lach La

এই সেই বারা-লাচ-লা। এবার আমরা যাই নি। মনিদীপার তোলা দু বছরের পুরোনো ছবি

ঠিক বলিউডের সিনেমার মতো – দূই বাপ প্রবল আপত্তি করে বসলেন। এতো বড়ো আস্পদ্দা – ইহারা লভ করিতে চায় ? স্বয়ং পছন্দ করিয়া বিবাহ করিতে চায়? হারগিজ নেহি। এদিকে চন্দ্রদেব আর সূর্যদেব ব্যক্তিগত জীবনে যে কেচ্ছার ফোয়ারা ছুটিয়েছেন, তার বেলায় যেন কোন দোষই নেই। ওই তো, চন্দ্রদেব – তিনি তো বৃহস্পতি মুনির বৌ তারাকে ফুসলিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো ৪৯৭ ধারাটি বাতিল হয়ে যায় নি – বৃহস্পতি সোজা দেবতাদের কাছে কমপ্লেন করেছিলেন। তারপর তারাদেবী তো ফিরলেন, কিন্তু তখন তিনি গর্ভবতী। সে নিয়েও মেলা লাফড়া হয়েছিলো – জারজ পুত্রের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে। আর এদিকে সূর্যদেব, তার তো আবার কুন্তীর সঙ্গে কেলেঙ্কারি – যা থেকে কর্ণের জন্ম হয়। সে সবে দোষ নেই, কিন্তু ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিক নিয়মে বিয়ে করতে চেয়েছে, ওমনি দুজনে একদম কাদের-খান-অমরীশ-পুরী হয়ে উঠলেন। অজুহাত দিলেন যে সূর্যদেবের ইচ্ছে তার ছেলে জগতে আলো ছড়াবে আর চন্দ্রদেবের ইচ্ছে তার মেয়ে রাতের আকাশে তারা জ্বালবে। যেহেতু এক আকাশে চন্দ্র-সূর্য ওঠে না, তাই তাদের বিয়ে সম্ভব নয়। এইসব ছেঁদো অজুহাত দিয়ে নিজেদের ইগো আর ব্যক্তিগত অ্যাম্বিশনের সামনে একদম ‘কুরবান’ করে দিলেন তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে।

তবে সেযুগের ছেলে-পিলেরাও এযুগের মতোই তালেবর – অতো সহজে ‘কুরবান’ হবার পাত্রই নয় তারা। চন্দ্রা আর ভাগা ঠিক করলো তারা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে। তা পালিয়ে যাবে কোথায় ? বাঃ, সেটাও বলতে হবে – ওই বারা-লাচ-লা তে, যেখানে ওদের চারচক্ষুর মিলন হয়েছিলো! প্ল্যান একদম পাক্কা, দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। মেয়েরা তো একটু বেশী পাংচুয়াল হয়, তাই চন্দ্রা ঠিক সময়মতো বারা-লাচ-লা পৌঁছে গিয়েছিলো। গিয়ে দেখে ভাগার কোন পাত্তা নেই। ভাগা শেষমুহূর্তে ঘাবড়ে গিয়ে ভাগলবা হয়ে গেলো কিনা তার সরোজমিনে তদন্ত করতে বেরোলো চন্দ্রা। হাঁটতে লাগলো কুনজুম লা-র দিকে। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে যখন আর শরীর চলছে না, তখন চন্দ্রা এসে পৌঁছলো একটি ঘননীল, কাকচক্ষু হ্রদের ধারে। সেখানে দুদণ্ড জিরিয়ে আবার হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে একসময় চন্দ্রা পৌঁছলো তান্ডি নামক একটা জায়গায়। সেখানে গিয়ে দেখে ভাগা হনহন করে উল্টো দিক থেকে আসছে – এতক্ষণে বাবুর খেয়াল হয়েছে যে তার বিয়ে। ভাগ্যিস তখনো তাদের বিয়ে হয় নি, তখনো “প্রেমে-বিভোর” স্টেজ চলছে – তাই ভাগার গালে হাই-হিল স্যান্ডেলের বাড়ি পড়ে নি, বরং একটি সুমধুর “কি-যে-করো-না-তুমি” হাসি তার কপালে জুটেছিলো। ব্যাস – আর কি – দুজনের বিবাহ হলো ওই তান্ডিতেই, স্বর্গ থেকে দিগবধূরা পুষ্পবৃষ্টি করলেন, শুভশঙ্খধ্বনি আর নন্দী-ভৃঙ্গীর সিটির আওয়াজে তিনভুবন মাতোয়ারা হয়ে উঠলো। এদের দুজনের মিলিত নাম হলো চন্দ্রভাগা।

08A Tandi

তান্ডি। এবার আমরা যাই নি। মনিদীপার তোলা দু বছরের পুরোনো ছবি

08A Suraj Tal

সুরজ তাল। এবার আমরা যাই নি। মনিদীপার তোলা দু বছরের পুরোনো ছবি

সেই জন্যেই বলা হয় ভাগা নদীর উৎস সুরজতালে, চন্দ্রা নদীর উৎস বারা-লাচ-লার কাছের এক হিমবাহতে – যেখান থেকে সে এক অন্তঃসলিলা নদী হয়ে আসে চন্দ্রতালে, সেই সুনীলহ্রদ যেখানে সে দুদন্ড জিরিয়েছিল। তারপর চন্দ্রতাল থেকে সে নদীরূপে যায় স্পিতি উপত্যকা চিরে, এবং ভাগা নদীর সঙ্গে তান্ডিতে মিলিত হয়ে চন্দ্রভাগা নামে বয়ে চললো সিন্ধুর এক শাখানদী হিসেবে। অনেকে আবার এই চন্দ্রতাল থেকে ট্রেক করে বারা-লাচ-লা যায় – যে পথে একদিন চন্দ্রা এসেছিলো ভাগাকে খুঁজতে, যে পথে সে অন্তঃসলিলা হয়ে বয়ে চলেছে।

সেই চন্দ্রতাল হ্রদ দেখতে আমরা চলেছি।

কাজা থেকে চন্দ্রতাল যাবার একটা নতুন রাস্তা হয়েছে। এটা যায় কিব্বের হয়ে চিচাম হয়ে। কিব্বের মনে আছে তো ? যেখানে আমরা কাজা থেকে গিয়েছিলাম – পাহাড়ের মাথায় – কমিক গ্রামটি তৈরি হবার আগে এটাই এশিয়ার উচ্চতম গ্রাম ছিলো। সেই কিব্বের গ্রামের মধ্যে দিয়ে অতি সরু গলিপথ – যা কারুর বাড়ির উঠোন তো আরকারুর বাড়ির পেছনের দেয়াল ঘেঁষে যায় – সেই ধরে যেতে যেতে পৌঁছলাম একটা ১০০০ ফুট গভীর খাড়াই খাদের সামনে। যার বহু নিচে – প্রায় দেখাই যায় দূরে বয়ে চলেছে সাম্বা-লাম্বা নালা (সত্যিই এই নাম, আমি বানাই নি) আর ওপর একটা একদম নতুন ঝাঁ-তকতকে ব্রিজ। এই ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গেলেই চিচাম তাই এই ব্রিজের নাম চিচাম ব্রিজ। চিচাম ব্রিজটা এই একবছর হলো খুলেছে, তার আগে নাকি একটা হাতে টানা রোপওয়ে ছিলো, যাতে একজন করে লোক একটি ঝুড়ির মতো জিনিসে চড়ে নিজে নিজে দড়ি টেনে এদিক থেকে ওদিকে যেতো। যারা যেতো, তাদের কলিজাটা কি জিনিস দিয়ে তৈরি ভাবতে ভাবতে এই এশিয়ার উচ্চতম ব্রিজটা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম চিচাম।

08 Checham bridge

চিচামের সেই ব্রিজ

চিচাম থেকে হানসা – যাবার পথে একটা নাম-না-জানা অপূর্ব সুন্দর জায়গায় থামলাম। রাস্তার দুপাশে খয়েরি ঢেউপাহাড়, দূরে নীলদিগন্তে বরফিলা পাহাড়ের সাদা ম্যাজিক আর রাস্তার মাঝখানে একটি নিঃসঙ্গ চরটেন। একেবারে নিঃসঙ্গ নয়, যাত্রীরা এর আশেপাশে পাথরের ছোট ছোট ঢিপি বানিয়ে গেছে। শুনেছি অনেকবছর আগে, যখন এইসব পথ হেঁটে লোকে পেরোতো এবং প্রায়শই পথ হারিয়ে বেঘোরে মরতো, তখন যাত্রীরা কোন দুর্গম জায়গায় পৌঁছতে পারলে সেখানে একটা পাথরের ঢিবি বানিয়ে যেত। শুধু এই জানাতে নয় যে তারা এই দুর্গম জায়গাটিতে পৌঁছতে পেরেছে – ওই পাথরের ঢিবির পাশে কিছু শুকনো খাবার এবং জল রেখে দিয়ে যেতো তারা, পরবর্তী যাত্রীদের জন্যে। সেই রেওয়াজ আজো চলে আসছে – এইসব দুর্গম পয়েন্টে যাত্রীরা একটা করে ছোট ঢিপি বানিয়ে রেখে যায়। খাবার বা জল অবশ্য আর রেখে যায় না।

08 Checham (2)

আমরা – আদি, আমি, অমিত

08 checham

হানসার আগে সেই নাম না জানা জায়গা।

08 Chicham 8

হানসার আগে সেই নাম না জানা জায়গা।

Chicham

গিন্নি

হানসা- কিয়োটো পেরিয়ে, লোসার পেরিয়ে সেই কুনজুম পাস। একবার থামলাম, কুনজুম মাতার সামনে মাথা ঠেকালাম আর দুচোখ ভরে দেখলাম দুপাশের ছিটিয়ে পড়ে থাকা সৌন্দর্য। তারপর আবার ছুট-ছুট, নইলে দেরী হয়ে যাবে চন্দ্রতাল পৌঁছতে।

08A Spiti enroute to Hansa

স্পিতি নদী আর তার রঙের বাহার

চন্দ্রতালের কাছে থাকার ব্যবস্থা নেই। থাকতে হয় ক্যাম্প-সাইটে, সেখানে সারি-সারি তাঁবু খাটানো আছে। ক্যাম্পসাইট থেকে দু কিলোমিটার চড়াই বেয়ে গাড়ি করে যেতে হয় চন্দ্রতালের কাছের পার্কিং পয়েন্ট। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার মতো হেঁটে যেতে হয়। হেঁটে যেতে বয়স্ক লোকেদের একটু কষ্ট হতে পারে, বাকিদের হওয়া উচিৎ নয়। মানে আমাদের মতন আনফিট লোকেরাও তো যেতে পেরেছিলো মশাই। তবে বয়স্ক বা ছোঁড়া, সুস্থ বা খোঁড়া – যাই হোন না কেন, অবশ্যই যাবেন। কষ্ট হলেও যাবেন। সময় থাকলে একবার প্রদক্ষিণও করবেন – প্রায় আড়াই কিলোমিটার হবে, কিন্তু আস্তে আস্তে করলে ঠিক পারবেন। আমরা করতে পারি নি কারণ সময় ছিলো না।

চন্দ্রতাল কেমন, তা কিভাবে বর্ণনা করবো তাই ভাবছি। লিখতে গেলেই সেই লালমোহনবাবু যেমন কি যেন দেখে “অসাধারণ-অনবদ্য-অসামান্য” ইত্যাদি ১১খানা অ দিয়ে বিশেষণ ব্যবহার করেছিলেন, সেইরকম হয়ে যাবে। তার বদলে চাঁচাছোলা গোদা বাংলায় যাক – একটা নিঃসঙ্গ পর্বতমোড়া উপত্যাকা, তার মাঝখানে একটি ঐশ্বরীয় নীল হ্রদ, যে রোদের আলোয় ঝিলকিয়ে উঠছে। হাওয়ায় তার ওপরের জলে খেলে যাচ্ছে একটা হালকা তিরতির, আর তাই মুহূর্তে মুহূর্তে তার রূপ পাল্টে যাচ্ছে। রঙ দেখে মনে হচ্ছে যে কোন এক অতি বাজে ফোটোগ্রাফার ছবিতে একগাদা কালার স্যাচুরেসন করে ফেলে একটা অস্বাভাবিক রঙ করে ফেলেছে – বাস্তবে এরকম রঙ হয়ই না। কটা ছবি দিলাম – দেখুন যদি এর থেকে কিছু অনুভব করতে পারেন।

08 Chandrataal 2

08 Chandrataal 3

08 Chandrataal 4

08 Chandrataal 5

চন্দ্রতাল থেকে ক্যাম্পসাইটে ফিরলাম তখন বিকেল ফুরিয়ে এসেছে। আমরা থাকছি প্যারাসল ক্যাম্পে – খুব ভালো ব্যবস্থা। ক্যাম্পে পৌঁছনো মাত্রেই গরম চা আর একরাশ বিস্কুট নিয়ে হাজির তারা। টেন্টের বাইরে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল পাতা, সেখানে বসে পা লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে চায়ে চুমুক দিতে যা আনন্দ হলো কি বলবো। তারপর ঢুকলাম আমাদের তাঁবুতে।

হরি হরি – এ তাঁবু নাকি? এতো রীতিমত হোটেলের ঘর! সামনে একটা মালপত্র রাখার খুপরি ঘর, তার পেছনে বিশাল ডবলবেড, পাশে বেডসাইড টেবিল। খাটে বেশ মোলায়েম মোটা গদি, তার ওপর আরো মোটা লেপ। একপাশে টেবিল-চেয়ার। অ্যাট্যাচড বাথরুম – ওয়েসটার্ন স্টাইল উইথ রানিং ওয়াটার! নাথিং তো কমপ্লেন আবাউট, যাকে বলে। এদিকে তাঁবু বলতে তো আমি ভেবে নিয়েছিলাম যে মাটিতে বিছানা, মোটকা কম্বল বা স্লিপিং ব্যাগ – ওই হেমেন রায়ের “যকের ধন”এ যেরকম ছিলো আর কি।

এখানে তাঁবুতে দেখলাম ইলেকট্রিক আলোর ব্যবস্থা আছে। বাইরে আছে সোলার প্যানেল, তাতে চলে। রাত নটায় নিভিয়ে দেওয়া হয়। তখন ভরসা ইলেকট্রিক হ্যারিকেন – সেও চার্জ হয় ওই সৌরবিদ্যুতের জোরে। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম একটা জলের ট্যাঙ্ক আছে, ওই সৌরবিদ্যুতে গরম করা জল ধরা থাকে। খাবার আগে বা পরে হাত ধুতে ওই গরমজলটাই ভরসা।

বাইরে বসে বসে দেখতে থাকলাম সামনের পাহাড়ের বরফের সাদা রঙ মরে এলো। নীল আকাশ ক্রমে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠলো, দেখা দিলো চাঁদ – তার রূপোর মতো আলো ঠিকরে পড়লো পাহাড়ের সাদা শিখরে।

না, ভুল বললাম। বাইরে বসে থাকতে পারি নি একটানা। প্রথমে একটা মোটা জ্যাকেট পরে বসেছিলাম, একটু বাদে তাঁবুতে গিয়ে জ্যাকেটের তলায় সোয়েটার পরে এলাম। তারপর ক্রমাগত একটু বাদে বাদে তাঁবুতে যাচ্ছি আর কিছু চাপিয়ে আসছি। একে একে চাপলো থার্মাল ইনার, সয়েটশার্ট, সোয়েটার, জ্যাকেট, টুপি, মাফলার, গ্লাভস। স্ট্রিপটিজের ঠিক উল্টো প্রসেস আর কি। এসব করেও কিছুক্ষণ বাদে আর পারা গেলো না, গুটিগুটি ঢুকে পড়লাম ডাইনিংএর তাঁবুতে। সেখানে বুখারি জ্বলছে, তার ওমে কি আরাম!

সন্ধ্যেটা কাটলো ওই ডাইনিং টেন্টে তাস খেলে, গান শুনে, অতি-সাধরণ-কিন্তু-অসাধারণ-খেতে খাবার খেয়ে, আড্ডা মেরে। শুয়ে পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি, তাই ভোরের আলোয় চোখ খুলে দেখতে পেয়েছিলাম চাঁদের আলোয় পাহাড়ের রূপ, তারপর সকালের গোলাপী আভা। অবশ্য এইসব দেখে একটু বেশী উচ্ছ্বাস দেখিয়ে ফেলেছিলাম, একটু বেশী জোরে “আহা আহা” বলেছিলাম বলে বৌয়েরা আমাদের দুই বন্ধুকে অনেক নরমগরম শুনিয়ে দিলেন। তবে আমাদের মনে বোরোলীন লাগানো আছে কিনা, তাই জীবনের এসব ছোটখাটো ওঠাপড়া গায়েই লাগে না।

পরদিন ভোরে উঠে ফেরা।একেবারে ভোরের আলোয় বেরিয়ে পড়লাম। পথে পড়লো সেই সব চেনা জায়গা – ছোটি ধারার ভয়াবহ পাথুরে ঝর্ণা, বাতালে চাচা-চাচির ধাবা তারপর ছত্রু আর তার চন্দ্র ধাবা। সেখানে আলু-পরোটা আর চা সহযোগে উত্তম ব্রেকফাস্ট, তারপর রোটাং হয়ে গোলাবা হয়ে রানী নাল্লা আর তার সামনের মোবাইল ম্যাগি সেন্টার হয়ে, কোঠি পেরিয়ে মানালি দুপুর নাগাদ।

মানালিতে বিশেষ কিছু ঘুরে দেখি নি। যদিও আমাদের কেউ “কিচ্ছু

08 Keran's cafe (Rice Bowl)

করবেন না” বলে নি, কিন্তু যাত্রাশেষে মনটা কেমন কাটা-ঘুড়ির মতো উদ্দেশ্যহীন লাগে। মানালির বাজারে টি-শার্ট কিনলাম (সেখানে দেখলাম মহাত্মা-গান্ধী-বব-ডিলান-আভেঞ্জার-তিব্বতী-আর্ট-ভার্লি-আর্ট সবাই পাশাপাশি বিদ্যমান। পাশের রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে দেখা হয়ে গেলো তার মালকিন সেই ইজরায়েলি ভদ্রমহিলার সঙ্গে। ভারী হাসিখুশি, নাম বললেন “কেরান”। বললেন হিব্রুতে “কেরান” আর হিন্দিতে (বা বাংলাতে) “কিরণ” মানে একই – সূর্যালোক।

সূর্যের কিরণের একঝলক হাসি মেখে এযাত্রার নটেগাছটা মুড়োলাম আমরা।

———————————-

উপসংহারঃ

কাল রাত্রে লেখাটা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে দেখি ঘরের টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে আর তার সামনে আধাসিলুয়েটে একটা ছায়ামূর্তি। তার চোখে চশমা, ব্যাকব্রাশ করা চুল, আধকপালে টাক। ভদ্রলোক আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছেন। একসময় ভদ্রলোক কড়া গলায় জিগ্যেস করলেন

“হিমালয় নিয়ে ভ্রমণকাহিনী লিখছো?”

ঘাড় নিচু করে মুখে একটা হেঁহেঁ হাসি ফুটিয়ে তুলেছি সবে, তার আগেই ছায়ামূর্তি আবার প্রশ্ন করলেন

“তুমি একসময় কবিতা লিখতে না?”

“কবিতা? মানে সে তো বহুদিন আগে…”

“বলো তো, প্রবোধের শব্দের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মিল কোন শব্দের হবে?”

কি বলবো ভাবছি, ছায়ামূর্তি নিজেই উত্তর দিয়ে দিলেন “নির্বোধ। বুঝলে, নির্বোধ। কথাটা মনে রেখো।“

ছায়ামূর্তি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। দেখলাম খাটের ওপরে “দেবতাত্মা হিমালয়” বইটা পড়ে আছে।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৭

সপ্তম পর্বঃ হিকিম-কমিক-লাংজা

পিন ভ্যালি থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে আমরা ফিরে এলাম কাজাতে। কাজাতে ছোট্ট একটা চা-বিরতি, তারপর আমরা যাবো হিকিম, তারপর কমিক, শেষে লাংজা। লাংজাতে রাত্রিবাস – হোম-স্টে।

কাজাতে একটু চা খাবার জন্যে থামলাম “কুমফেন” নামের একটা মাঝারি গোছের হোটেলে। একদম রাস্তার ওপরেই, কাজার শাক্য মনাস্ট্রির একটা বাড়ি আগে। সেখানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিচ্ছি, হঠাৎ “হ্যালো স্যার” বলে “ইনক্রেডিবল স্পিতি”র সেই পূজা আচমকা কোথা থেকে এসে উপস্থিত। কিছুক্ষণ “আরে-আপনি-এখানে-তারপর-কেমন-বেড়ালেন” ইত্যাদি আমড়াগাছির পর বোঝা গেলো যে “শাক্য-এবোড” (মানে যে হোটেলে আমরা আগেরবার ছিলাম), “স্নো লায়ন” (এটা এখানকার একটা বেশ ভালো হোটেল) আর এই “কুমফেন”, তিনটে একই মালিকের। এবং তাদেরই ট্র্যাভেল বিজনেসের নাম “ইনক্রেডিবল স্পিতি”। এবং “ইনক্রেডিবল স্পিতি”র অফিস হলো এই “কুমফেন” হোটেলের রিসেপশনের পেছনের একটি এককামরার ঘর।

কুমফেন হোটেলের প্রধান আকর্ষণ এর বিশাল খাবার ঘর – যার একপ্রান্তের দেওয়ালে টাঙানো অজস্র তিব্বতী মুখোশ এবং অন্যান্য টুকিটাকি। একটা কোনায় সোফা রাখা আছে, তার পাশেই বইয়ের আলমারী – তাতে বেশ কিছু তিব্বতী সংস্কৃতি ও ধর্মের ওপর বই আছে। একটা কেনা গেল (তার থেকেই তো কিছু কিছু এখানে ঝেড়ে দিচ্ছি; নইলে কি ভাবছেন – আমি একেবারে বিদ্যাবোঝাই বাবুমশাই?) কাঁচের গেলাসে লেবু-আদা দেওয়া চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তবে বেরোবার আগে একটা মন্তব্যের বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

07 Kumpeng Hotel

কুমপেন হোটেলের দেয়ালের চমৎকার সাজসজ্জা

সকালবেলায় মাড গ্রাম থেকে বেরোবার আগে সোনু একটা রহস্যময় কথা বলেছিলো “যদি লাংজাতে গিয়ে শরীর খারাপ করে, তাহলে আমাকে বলবেন। আমরা কাজাতে নেমে আসবো।“ এই রহস্যজনক তথা ভয়জনক মন্তব্যটির অন্তর্নিহিত অর্থটা কি, মানে এখানে কবি ঠিক কি বলতে চেয়েছেন – সেটা বিস্তারিতভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। পূজার সঙ্গে কথা বলে যা আবছা বুঝলাম, তা হলো লাংজা বেশ হাই-অলটিচ্যুড জায়গা, সেখানে নাকি অনেকেরই রাত্রে শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে। এবং আমাদের সোনুবাবু সেখানে রাতে থাকেন না, নিচে নেমে আসেন। অতএব মাঝরাত্রে শরীর খারাপ করলে গাড়ি থাকবে না – ডাকাও যাবে না কারণ ওখানে ফোন চলে না। অতএব “ভগবান কি প্যারে” হয়ে যাবার একটা হালকা সম্ভবনা আছে।

যাই হোক, দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়লাম। পয়লা গন্তব্য – হিকিম। কাজা থেকে একটা হাড়হিমকারী এবং সৌন্দর্যে শ্বাসস্তব্ধকারী রাস্তা দিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার মিটার (সাড়ে চোদ্দহাজার ফিট) উচ্চতার এই পুঁচকে গ্রামটাতে পৌঁছতে হয়। এই গ্রামে আছে বিশ্বের উচ্চতম পোস্টঅফিসটি, যার পিনকোড হলো ১৭২১১৪। হিকিম গ্রামটা রাস্তা থেকে খাড়া নিচু কাদামাখা পথ বেয়ে অনবরত হড়কাতে হড়কাতে পৌঁছতে হয়। গ্রাম বলতে কয়েকটা পাথর-কাঠ দিয়ে বানানো সাদা বাড়ি (যাদের জানলায় এদিককার মার্কামারা কালো বর্ডার), পোস্টঅফিসটি এবং তার পাশে একটি ক্যাফে। এই ক্যাফেটির প্রধান ব্যবসা হলো সচিত্র পোস্টকার্ড বিক্রি করা এবং ঠিকানা লিখে দিলে সেগুলো পোস্ট করার ব্যবস্থাও করা। আমরাও কয়েকখানা পোস্টকার্ড ছেড়ে দিলুম এখান থেকে।

07 Hikkim

হিকিমের হড়কানো পথ

07 Hikkim 2

পোস্টকার্ড বিক্রেতা ছেলেটার অঙ্কে দক্ষতা দেখলাম হুবহু আমার মেয়ের মতো। তার দোকানের রেটকার্ড হচ্ছে “শুধু পোস্টকার্ড – ২৫ টাকা পিস; পোস্টকার্ড কিনে পোস্ট করার অর্ডার দিলে ৫০ টাকা পিস।“ এহেন অবস্থায় আমি যদি একসেট পোস্টকার্ড কিনি (১ সেট = ৬ পিস) এবং তার মধ্যে ৪টি পোস্টকার্ড পোস্ট করি, তাহলে কতো দিতে হবে ? ছোকরা প্রথমে ৬কে ২৫ দিয়ে গুণ করলো, তারপর ৪কে ৫০ দিয়ে গুণ করলো, তারপর আবার ৪ দিয়ে ২৫কে গুণ করলো তারপর…তারপর আর কিছু করতে পারে নি কারণ আমি তার খাতা কেড়ে নিয়ে ঘ্যাঁচ করে সব কেটে দিয়ে ২৫০/- লিখে দিয়েছিলাম আর দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিলাম “ত্রৈরাশিক না ভগ্নাংশ, কোনটা দিয়ে করছো, বাছা ?”

এখানে পোস্ট করা সব চিঠি গন্তব্যে পৌঁছয় না – গড়ে প্রতি দুটোতে একটা চিঠি হারায়। কিন্তু তবুও এখান থেকে পোস্টকার্ড পাঠাবেন অবশ্যই। ছোটবেলায় কাগজের নৌকো ভাসাবার সময় তাতে যখন নাম লিখতেন, ভাবতেন কি যে সে নৌকো আদৌ কারোর হাতে গিয়ে কোনদিন পড়বে কিনা? তবুও – ভাসাতেন তো?

পরের গন্তব্য কমিক গ্রাম। হিকিম থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। ৪৫৮৭ মিটার উচ্চতা, জনসংখ্যা ১১৪। পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” গ্রাম। গ্রামের ওপরে যেখানে গাড়ি থামে, সেখানে একটা ক্যাফে-রেস্তোরাঁটা রয়েছে – তারাও দেখলাম লিখে রেখেছে তারা নাকি পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” ক্যাফে! আশেপাশে দুএকটা হোমস্টেও আছে, তারাও নিজেদের পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” হোমস্টে বলে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। কি জানি – হয়তো এই উচ্চতম ব্যাপারটা না লিখলে ট্যুরিস্ট মহলে তেমন পাত্তা পাওয়া না। যদিও আশেপাশের দৃশ্য মনোমুগ্ধকারী।

কমিক গ্রামে দুটি মনাস্ট্রি আছে – দুটিরই একই নাম – তানগুড মনাস্ট্রি। কি হলো – অতো ভুরু কুঁচকে কি ভাবতে বসলেন? আরে মশাই, এই নামটা তো চেনা – কাজার শাক্য মনাস্ট্রিটারও অন্যনাম তো তানগুড মনাস্ট্রি। শাক্য সঙ্ঘের মনাস্ট্রি – মানে ওই বিক্রমশিলা – কদম সঙ্ঘের পরবর্তী যে তিনটি সঙ্ঘ উঠে আসে, তাদের একটি। এবার মনে পড়ছে? এই দুটি মনাস্ট্রির একটি পুরনো এবং প্রায় পরিত্যক্ত, নতুনটাতে প্রায় জনা-তিরিশ লামা থাকেন। একটা স্কুলও চালানো হয়।

DSC_1631_c

কমিকের “এখন-নতুন” মনাস্ট্রি – মনিদীপার তোলা ছবি

এই নতুন-পুরনো নিয়ে আবার গল্প আছে। লোকে বলে এই নতুনটা আসলে নাকি ব…হু বছর আগেকার। এখানে নাকি মহাকালের মূর্তি আছে। এটি পুরনো হয়ে যাওয়ায় লোকেরা হিকিমের কাছে নতুন একটি মনাস্ট্রি বানিয়ে তাতে চলে যায়। কিন্ত মহাকালের ওই মূর্তিটাকে কেউ নাড়াতে পারে নি। শেষে এক লামাকে মহাকালের সেবাইত হিসেবে রেখে বাকিরা চলে যায় হিকিমে, নতুন মঠে। পরে একটি ভূমিকম্পে হিকিমের নতুন মনাস্ট্রিটা নাকি ধুলিস্যাৎ হয়ে যায় কিন্তু এই পুরনো মনাস্ট্রি নাকি তার মহাকালের মূর্তি নিয়ে অটুট থাকে। তখন সবাই আবার ফিরে আসে এবং এই মনাস্ট্রিটা নতুন করে গড়ে তোলে।

এই “এখন-নতুন” মনাস্ট্রিটা চিনে স্টাইলে তৈরি। দোতলা, রেকট্যাংগুলার, সাদা-লাল-নীল রঙ, জানলার চারপাশে কালো বর্ডার। সামনে তিব্বতী দার-ইকগ পতাকা। (কি বললেন – দার-ইকগ আবার কি? তৃতীয় পর্বে গিয়ে রিভাইস করে আসুন মশাই – এতো ভুলোমন হলে চলবে কি করে?) মনাস্ট্রিতে মেয়েদের ঢোকা বারণ, তাই একাই গেলাম ভেতরে। ছবি তোলা যথারীতি বারণ। মনাস্ট্রিতে ঢুকেই দেখলাম একটি স্টাফ করা স্নো-লেপার্ড (এই একটিমাত্র স্নো-লেপার্ড দেখেছি আমি), লোকজন কেউ কোত্থাও নেই। মনাস্ট্রির প্রার্থনাঘরটি একতলায় একটু নিচুমতন, সেটা প্রথমটায় চোখে পড়ে না। তাই সেটাকে দেখতে না পেয়ে ভুল করে আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম একটা বেশ বড়ো হলঘর, দুজন মহিলা সেটা ঝাঁট দিচ্ছেন। বুঝলাম শতাব্দীপ্রাচীন ভণ্ডামি আজো চলিতেছে – মেয়েদের প্রার্থনা করতে দিতেই যতো আপত্তি, তাদেরকে মিনি-মাগনা খাটিয়ে নিতে বিশেষ আপত্তি নেই। তারপর কোনদিকে যাই ভাবতে ভাবতে ডাইনে মোচড় মেরে দেখি – ওবাবা, এতো লামাদের থাকবার জায়গা। আর তার প্রথম ঘরটাই হলো একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাথরুম।

একটুও বাড়িয়ে বলছি না, বাথরুমটা ঝকঝকে পরিষ্কার, রুচিপূর্ণ টালি মোড়া, ওয়েস্টার্ন স্টাইলের, তোয়ালে-জল-টয়লেট পেপার সব আছে। আমার এদিকে বাথরুম পাবো-পাবো করছিলো অনেকক্ষণ থেকেই, তাই এই চমৎকার বাথরুমটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে ফেললুম। মনে মনে ভাবলাম – এতো আমার নিছক বাথরুম করা নয়, এ আমার তীব্র সিম্বলিক প্রতিবাদ – মেয়েদেরকে এই মনাস্ট্রিতে ঢুকতে না দেওয়ার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। আমার মহিলা বন্ধুরা, যারা বলেন যে আমাকে কোনো নারীবাদী প্রতিবাদে পাওয়া যায় না – প্লিজ নোট!!

তীব্র প্রতিবাদটা সেরে নিচে এসে প্রার্থনাগৃহটায় উঁকি মারলাম। আহামরি কিছু নয়, মহাকালের মূর্তিটিও কোথায় কে জানে। অতএব মানে মানে কেটে পড়লাম।

এর তুলনায় আমার কমিকের পুরনো পরিত্যক্ত মনাস্ট্রিটা বেশ লাগলো। মাটির তৈরি, হলুদ দেয়াল, মূল প্রার্থনাগৃহের ওপরে সোনালী রঙের ধর্মচক্র ও দুপাশে দুটি হরিণ। চারকোনে চারটি সোনালী ধ্বজ, যা নাকি বুদ্ধের প্রতীক। কেউ নেই ভিতরে, তাই এখানে চুপ করে বসে থাকতে ভারী ভালো লাগে।

DSC_1623

কমিকের পুরনো মনাস্ট্রি – মনিদীপার তোলা ছবি

 

কমিকএর সেই পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” ক্যাফেতে দুপুরের খাওয়াটা সারা হলো। এখানে একটা কমলা রঙের বেশ অভিনব চা খেলাম, যার নাম “সি-বাক-থর্ন” চা (স্থানীয় নাম নাকি তিরকু চা)। এই সি-বাক-থর্ন তিব্বতী ওষুধে ব্যবহার হতো বহুশতাব্দী ধরে – এখন নানান আয়ুর্বেদিক ওষুধে এর প্রয়োগ হয়। আমাদের রামদেববাবার পতঞ্জলিও এর জুস বানিয়ে বিক্রি করছেন আজকাল!

কমিক থেকে লাংজায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। মেঘলা আকাশে কমলালেবু রঙের সূর্যমশাই টুপ করে ডুব মারবার মতলব ভাঁজছেন। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সোনালী আলোর চাদর। সেই বিকেলের কনে-দেখানো-আলোয় আমরা দেখে ফেললাম লাংজার হাজার বছরের পুরনো সোনালী রঙের বিশাল বুদ্ধমূর্তিটিকে। আর সামনের ল্যান্ডস্কেপ জুড়ে থাকা চাউ-চাউ-কাং-নেল্ডা পর্বতটিকে (আমাকে কিছু বলবেন না; নামটা ওইরকমই)।

লাংজা-কমিক-হিকিম – এই তিনটে জায়গাতেই পাওয়া যায় ট্রায়াসিক-জুরাসিক যুগের প্রাচীন ফসিল – আমোনয়েড, ট্রাইলোবাইট ইত্যাদি। এ সেই যুগের কথা, যখন হিমালয় বলে কিছু ছিলো না, ছিলো গন্ডোয়ানা আর কাইমেরা, তার মাঝে পেলিও-টেথিস সমুদ্র। সেই সমুদ্রের একটা অংশ পরে টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ায় ভাঁজ মেরে হয়ে যায় হিমালয়। সেই থেকে এখানে রয়ে গেছে সামুদ্রিক সব প্রাণীদের ফসিল।

DSC_1595_c

লাংজার সোনালী বুদ্ধ – মনিদীপার তোলা ছবি

07 Langza 2

লাংজায় বিকেল

লাংজায় ঘুরে বেড়াতে বেশ লাগছিলো। অবশেষে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো – এখানে কি রাতে থাকবো?

দেখলাম লাংজার গ্রাম যেটি (যার নাম লাংজা-ইয়ংমা), সেটি গাড়ির রাস্তা থেকে কর্দমাক্ত-পাকদণ্ডী বেয়ে মাইলখানেক নিচে। মালপত্র নিয়ে যাবার কুলি নেই, “আপনা-হাত-জগন্নাথ”। মেরে কেটে যদি নিচে নামতেও পারি, সকালে হার্গিজ উঠতে পারবো না বলেই আমার বিশ্বাস। এসব দেখেশুনে, ভেবেচিন্তে, পাতি-বাঙালীর অ্যাডভেঞ্চার ক্ষমতা আসলে কতটা তার একটা নিরপেক্ষ মাপজোক করে লাংজায় থাকার পরিকল্পনা ত্যাগ করলাম।

গুটিগুটি কাজাতে ফিরে এলাম সেরাত্রে।

(চলবে)

——————————-

উত্তরকথন

পরে জেনেছিলাম হিকিমের পোস্টঅফিসের পোস্টমাস্টারের নাম রিনচেন চেরিং; ১৯৮৩এ এই পোস্টঅফিস খোলা থেকেই তিনি এখানকার পোস্টমাস্টার। একাই চালান এই পোস্টঅফিস (মানে অফিসিয়াল কেউ নেই; একআধজন রতন থাকলেও থাকতে পারে)। তার সঙ্গে দেখা করি নি কেন ভেবে আপসোস হয়।

হিকিম থেকে চিঠি পায়ে হাঁটা পথে যায় কাজা; সেখান থেকে রেকং-পিও হয়ে সিমলা। সিমলা থেকে ট্রেনে কালকা, সেখান থেকে বাসে দিল্লি। তারপর সারা ভারতবর্ষে।

হিকিমের থেকেও উঁচু একটা পোস্টঅফিস আছে যেটা এভারেস্ট বেস-ক্যাম্পে। কিন্তু সেটা কোন পাকা পোস্টঅফিস নয় বলে সেটাকে হিসেবে ধরা হয় না। অন্তত গিনেস বা লিমকা বুক অফ রেকর্ডস সেটাকে ধরে না।

কমিকের সেই “এখন-নতুন” মনাস্ট্রি, যেখানে আমি আমার তীব্র প্রতিবাদ রেখে এসেছি, সেখানে নাকি নানান আশ্চর্য জিনিস লুক্কায়িত আছে। ড্রাগনের ডিম, একশৃঙ্গের সিং, ভেড়ার ওপরের মাড়ির দাঁত, এক ভয়ানক দানবের পাঁজরের টুকরো আর প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ল্যাজ। থাকতেই পারে, এতে অবাক হবার তো কিছু নেই। তবে ওই ভেড়ার ওপরের মাড়ির দাঁতটা আমার বিশ্বাস হয় নি মশাই। ওটা বড্ডো বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৬

ষষ্ঠ পর্বঃ পিন ভ্যালীতে একটি চমৎপ্রদ রাত্রি

পিন ভ্যালীর এই মাড ভিলেজে থাকবার বেশী জায়গা নেই। যে জায়গাটা সব থেকে জনপ্রিয় – বলতে পারেন অন্তর্জালে যার প্রায় একছত্র আধিপত্য – তার নাম “তারা হোম স্টে”।

06 Pin Valley 2

পিন উপত্যকা – সবুজের সমারহ

06 Pin Valley 3

পিন ভ্যালী যাবার পথে

এখন আবার হোম স্টেতে থাকার একটা হামলে-পড়া রেওয়াজ হয়েছে। হোম স্টেতে লোকাল খাবার না খেলে ও তার ড্রাই টয়লেট – যাকে আমাদের দাদু-দিদিমারা “খাটা পায়খানা” বলতেন, সেখানে প্রাতঃকৃত্য না সারলে আপনি পর্যটক হিসেবে সমাজে নাম কিনতে পারবেন না। তবে বাকিদের আওয়াজ দিয়ে আর কি হবে, আমরাও দু জায়গায় হোম স্টে বুক করবার চেষ্টা করেছিলাম – একটা লাংজায়, অন্যটি এই মাড গ্রাম। মাড গ্রামে আমরা ওই “তারা হোম স্টে” পাই নি, আমাদের বুকিং হয়েছে “পিন পার্বতী গেস্ট হাউস”এ। আমাদের ইনক্রেডিবল স্পিতির বিশেষবাবু অবশ্য বলে দিয়েছিলেন যে “পিন পার্বতী” হোটেলটির মধ্যে একমাত্র “হোটেল-সুলভ” ব্যাপার হচ্ছে এতে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের এট্যাচড বাথ রয়েছে – এ ছাড়া অন্য সব দিক থেকে একে হোম স্টে বলেই ধরে নিন। এর থেকে যা বুঝবেন, বুঝুন। আমরা অবশ্য এই বুঝেছিলাম যে একটা অখাদ্য হোটেল হতে চলেছে। সেই তুলনায় এখানে পৌঁছে দেখলাম হোটেলটা কিন্তু মোটেই মন্দ নয়। ঘরগুলো বড়ো, বাথরুম বড়ো এবং পরিষ্কার, তাতে গিজার আছে – সে গিজার চলেও বটে। বিছানার চাদরও পরিষ্কার, তার ওপর মোটা রেজাই দেওয়া। আর কি চান মশাই?

(এই ফাঁকে চুপি চুপি বলে রাখি, আমাদের গ্রুপের একজন – তার নাম বলা বারণ – সে হোটেলের বিছানার চাদরের ওপর পাতবার জন্যে বেডশীট কিনেছিলো মানালি থেকে। শেষ অব্দি পেতেছিলো কিনা তা অবশ্য জানা নেই।)

06 Pin Valley Hotel

বাঁদিকে আমাদের হোটেল, ডাইনে “তারা হোমস্টে”

হোটেলে দেখলাম ওসব রেজিস্ট্রার-মেজিস্টারের পাট নেই। একটা রোগা খেঁকুরে মতন লোক সোনুকে জিগ্যেস করলো আমরাই ‘তারা’ কিনা। তারপর সরু সিমেন্টের আধ-তৈরি রেলিংবিহীন সিঁড়ি দিয়ে হুস-হাপুস করতে করতে আমাদের মালপত্তর ওপরে তুলে দিলো। তারপর সেই দৌড়ে গেলো কিচেনে – চা বানাতে। মানে রিসেপশানিস্ট কাম ওয়েটার-কাম-কুক-কাম-সবকিছু ইনিই। স্যাটাবোস-গুড়বেড়িয়া-ন্যাটাহরি-জুনো-মার্কোপোলো – সব একই দেহে রামকৃষ্ণ হয়ে গেছে।

চা খেতে খেতেই এই খেঁকুরে লোকটা (তার নাম ততক্ষনে জেনে ফেলেছি – গোপাল) জিগ্যেস করলো কখন ডিনার নেবো। কি আছে ডিনারে জিগ্যেস করে জানলাম মেনুটি বিলকুল বাহুল্যবর্জিত – ভাত, রুটি, বাঁধাকপির তরকারি আর ডাল। আগের রাত্তিরেই অমন উমদা তিব্বতী ডিনারের পর একটু মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগলো। জিগ্যেস করলাম

“চিকেন মিলেগা ?”

“আপ লোগোন কি তো ভেজ মিল বুক কিয়া হুওা হ্যাঁয়…“

“আরে, হাম অলগ সা পায়সা দে দেঙ্গে। মিলাগা? “

গোপালবাবু তাও গোঁজ মেরে থাকে। বুঝলাম যে এসব বাড়তি বখেড়া নেওয়া তার চরিত্র-বিরোধী। আরেকটু পেড়াপেড়ি করাতে জানা গেল যে মুরগী নেই এবং এখানে পাওয়াও সম্ভব নয়। “মালিক গিয়া হ্যাঁয় কাজা। উহ আগার মুরগী লেকে আয়া রাত তক – তো হম জরুর বানা দেঙ্গে। উসমে ক্যা হ্যাঁয়? দস মিনিট হি তো লাগতা হ্যাঁয়!!“

দশ মিনিটে মুরগী রান্না? বলে কি রে এ ! যাক গে, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম এখানে ঘুরে দেখার খুব একটা কিছু নেই, তায় আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। সামনের পাহাড়টায় নাকি বরফ পড়ে শীতের সময় বরফের সুন্দর ঢাল তৈরি হয় আর এখানকার লোকেরা সেখানে স্কি করে। শীতে হয়তো হতেও পারে, এখন তো দেখলাম নিছক সবুজ পাহাড়। পিন ভ্যালী তো আবার ন্যাশনাল পার্ক, সেখানে তো নাকি সাইবেরিয়ান আইবেক্স (আচ্ছা – বলছে সাইবেরিয়ান, এদিকে পিন ভ্যালীতে পাওয়া যায় কেন? এতো মশাই হায়দ্রাবাদের মশহুর বেকারীর নাম ‘করাচী বেকারী’ কেন গোছের কেস!)আর স্নো লেপার্ড থাকে বলে শুনেছি – তারাই বা কোথায়? খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও তাদের দেখা পেলাম না, উল্টে ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে ভিজে আমার ১২টা প্রমাণ সাইজের হাঁচি হলো। অতএব ঘরের ছেলে গুটিগুটি গোপালবাবুর হোটেলে।

06 Pin Valley 4

বাঁদিকে “তারা হোমস্টে”

06 Pin Valley

হোটেলের সামনে পাহাড় আর ভেড়ার পাল

একটু বাদে আমরা সবাই একটা ঘরে বেশ জমিয়ে বসেছি। তাস, বৃদ্ধ-সন্ন্যাসী, ব্লু-টুথ স্পিকারে মৃদু কিশোর, কম্বলের তলায় পা – ঠিক যেরকমটি হওয়া উচিৎ আর কি। এমন সময় সুগতা ঘুরে এসে বললো “ব্যাপারটা রহস্যজনক।“

রহস্য? কিসের রহস্য? এদিকে দু নম্বর পেগ চলছে, ২১-এর ডাক – ডবল দেবো কিনা ভাবছি, এই মহেন্দ্রক্ষণে এসব আবার কি কথা! জিজ্ঞ্যেস করলাম “কি আবার রহস্য?”

সুগতা গিয়েছিলো গোপালবাবুর খোঁজে – যদি তাকে একটু পটিয়ে পাটিয়ে আলুভাজা বা পকোড়া বানাতে উদ্বুদ্ধ করা যায় দেখতে। “সে তো এককথায় না বলে দিলো। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম – সে রুটি বেলছে।“

রুটি বেলছে ? এতে আবার কি রহস্য রে বাবা!! বৌদের কল্পনাশক্তি নিয়ে যখন একটা তির্যক মন্তব্য করতে চলেছি, সুগতা ঝাঁঝিয়ে উঠলো

“আঃ !! ব্যাপারটা ভালো করে বোঝ। আমরা বলেছি আমরা রাত ন’টা নাগাদ খাবো। এখন বাজে সোয়া সাতটা। ও এখন থেকে রুটি করে রাখছে কেন?”

পয়েন্ট। লালমোহনবাবুর ভাষায় “হাইলি সাসপিশাস”। শার্লকসাহেব এইরকম সব ব্যাপার থেকে অনেক কিছু বের করে ফেলতেন বটে, আমরা অনেক ভেবেও কিছুই  পেলাম না। শুধু মনটা খচখচ করতে থাকলো।

ঘণ্টাখানেক বাদে একবার রান্নাঘরে দিকে উঁকি মারলাম। দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই,   রান্নাঘরের বাইরে থেকে হুড়কো টানা, ভেতরে একটা মৃদু আলো। হুড়কো খুলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম উনুনে খুব কম আঁচে কিছু একটা চাপানো আছে। বাইরে এসে এদিকে-সেদিকে-ওপরে-নীচে-ডাইনে-বাঁয়ে সব তন্নতন্ন করে খুঁজে বুঝলাম আমাদের গোপালবাবু হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন। বিলকুল গায়েব।

এরপর আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর রান্নাঘরে চক্কর লাগাতে থেকেছি (বাকিরা তাস খেলে চলেছে)। এই করতে করতে যখন সাড়ে ন’টা বেজে গেলো, তখন একটা টর্চ নিয়ে রীতিমত তদন্ত করতে বেরোলাম। গেলো কোথায় লোকটা ?

বাইরে তখনো ঝিরঝির, রাস্তায় ম্লান আলো, পথঘাট একেবারে জনশূন্য। হোটেলের সামনের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে দেখলাম রাস্তার একপাশে একটা বড়ো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আলো জ্বলছে, গান বাজছে আর তার পেছনের ডিকি খোলা। সেখানে জনাকয়েক লোক জটলা পাকিয়ে হই-হুল্লোড় করছে – মনে হলো ড্রাইভার শ্রেণীর লোকজন হবে। সেদিকে এগোতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখলাম তার মধ্যেই একটি রোগামতন লোক টলমল পায়ে আমাদের দিকেই আসছে।

রোগা লোকটা টলমল-কেষ্ট-মুখার্জি সম্পূর্ণ মাতালপায়ে আমার পাশ দিয়ে গিয়ে হোটেলের বাইরের রেলিঙের দরজা খুলে সটান ভেতরে ঢুকে পড়লো। দেখলাম হোটেলের বাইরের বাগানে একটি টয়লেট আছে এবং সেই টয়লেটের বাইরে একটা বেশ পরিচ্ছন্ন বেসিন রয়েছে। কিমআশ্চর্যপরম – সেই বেসিনে একটি গেলাসে আবার  টুথব্রাশ-টুথপেস্ট রাখা রয়েছে। রোগাবাবু সেই বেসিনের সামনে গিয়ে টুথব্রাশ নিয়ে তাতে টুথপেস্ট লাগিয়ে দাঁত মাজতে বসলো।

বাপ-রে-বাপ – সে কি ভীষণ দাঁতমাজা!! চলছে তো চলছেই। আমাদের ছোটবেলায় আমার ছোটমামা আমাদের তিন ভাই-বোনকে দাঁতমাজা শেখাবার চেষ্টা করতো – একেকদিক দেড়-মিনিট করে, তারপর সামনের দাঁত একমিনিট, রোল করে করে। এই লোকটা নির্ঘাত আমার ছোটমামার কাছে দাঁতমাজা শিখেছিলো আর ডিসটিংশন নিয়ে পাস করেছিলো – নইলে মাতাল অবস্থাতেও কেউ এতো মন দিয়ে দাঁত মাজে নাকি! আমি তার মুখে আলো ফেললাম – তাতে তার বোধহয় আরো সুবিধেই হলো – আরো জমিয়ে দাঁতমাজা চললো।

একসময় এই দন্তমর্জন পর্ব শেষ হলো আর এই রোগা-কেষ্টবাবুকে পাকড়াও করলাম। দেখলাম তিনি আমাদের গোপালবাবুকে চেনেন। আমাদের কথা শুনে তিনি এই বেসামাল অবস্থাতেও সিঁড়ি ভেঙে রান্নাঘর ইন্সপেক্ট করতে এলেন। দেখেটেখে বললেন “আমি আসছি” বলে কোথায় যেন গিয়ে একজন স্যাঙ্গাৎকে যোগার করে আনলেন। সেই স্যাঙ্গাৎএরও অবস্থা তেমন সুবিধের বলা চলে না – তিনিও বেশ টলটলায়মান অবস্থাতেই আছেন দেখলাম।

রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এই দুই নাম-না-জানা মদ্যপ ভদ্রলোক টলমল হাতে পরম যত্নে আমাদের রাতের খাবার বেড়ে আমাদের খেতে বসালো। গোপালবাবু রান্নাটা করেই গিয়েছিলেন, কাজেই এঁদের রান্নাটা আর করতে হয় নি। তবে আমাদের খাওয়া শেষ অব্দি এঁরা ছিলো, তারপর বাসন তুলে টেবিল মুছে তারপর গিয়েছিলো।  জানলাম এঁরা আসলে কাজ করেন “তারা হোমস্টে”তে। কিন্তু এইটুকু জায়গা বলে একে অপরকে সাহায্য করাটা এঁরা এদের কর্তব্য বলেই মনে করেন।

আজকের কমপিটিশন-এর যুগে এই পারস্পরিক সহযোগিতাটা কল্পনা করতে কিঞ্চিৎ অসুবিধেই হয়। এঁরা আবার সকালের বেড-টি কখন খেতে চাই জেনে নিয়েছিলেন এবং পরদিন ভোরবেলায় একটি ছোকরা এসে সেটা দিয়েও গিয়েছিলো সময়ের আগেই। একটু বাদে “তারা হোমস্টে”র ওই রোগা-কেষ্ট বাবু এক ভদ্রমহিলাকে বগলদাবা করে নিয়ে এলেন এবং তাঁর সহায়তায় গরম গরম অতি উত্তম আলু-পরোটা আর চা বানিয়ে প্রাতঃরাশ করালেন। গোপালবাবু সকালেও নিখোঁজ, তাই পয়সাকড়ি রোগা-কেষ্ট বাবুকেই দিয়ে এলাম (অবশ্য পেমেন্ট করাই ছিলো, শুধু বিকেলের চা-বিস্কুটের পয়সা)। গোপালবাবু কোথায় খোঁজ করাতে উদাসভাবে বললো “সে বোধহয় কাল রাত্রে আপনাদের জন্যে মুর্গি কিনতে গিয়েছে”।

এইরকম একটি অম্লমধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে মাড গ্রাম ত্যাগ করলাম। বেরোবার আগে এককাপ চা খাবো বলে গরম জলের খোঁজ করতে গিয়েছিলাম (টি-ব্যাগ আর কাপ সঙ্গেই ছিলো), দেখলাম একটি ছেলে রান্নাঘরের সামনে বসে আছে। তার কাছে গরমজল চাওয়াতে সোৎসাহে সে রান্নাঘর খুলে জল গরম করে দিলো। চা বানিয়ে দেবে কিনা, তাও জিগ্যেস করেছিলো – আমরা আর উৎপাত করি নি। যাবার সময় জিগ্যেস করলাম যে সেও “তারা হোমস্টে”র কর্মচারী কিনা – শুনলাম সে নাকি একজন মিস্তিরি – এই হোটেলে সিমেন্টের কাজ করতে এসেছিলো। আজ সকালের বাস পায় নি বলে বসে আছে।

আমরা চললাম কাজা হয়ে হিকিম-কমিক-লাংজার পথে। পেছনে পড়ে রইলো মাড গ্রাম নামক সেই আশ্চর্য যায়গাটা – যেখানে সম্পূর্ণ মাতাল অবস্থাতেও এক  হোটেলের কর্মচারী তার পাশের হোটেলের গেস্টদের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয় আর সিমেন্টের মিস্তিরি অবলীলায় গেস্টদের চা বানিয়ে দেয়।

06 Pin Valley Monastry

পিন ভ্যালী মনাস্ট্রি – এটা দেখেছিলাম পরদিন

না মশাই – এরা কেউ কোন বাড়তি পয়সা নেয় নি। এদের নামও জানা হয় নি। কি হতো জেনে? এরা যে জগতের লোক, আমরা তার থেকে অনেক দুরের জগতে বাস করি।

(চলবে)

————————————————

উত্তরকথনঃ

গোপালবাবু মুর্গি কিনতে সত্যিই রাতের অন্ধকারে ৫০ কিলোমিটার দূরে কাজাতে গিয়েছেন কিনা কে জানে! তাঁর দশমিনিটের মুর্গীটা এযাত্রা বাদ পড়লো।