পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৮

অন্তিম পর্বঃ চন্দ্রতাল

একটা পৌরাণিক গপ্পো শুনুন।

সে অনেক অনেককাল আগেকার কথা। সূর্যদেবের এক পুত্র ছিলো, নাম ভাগা। কি বলছেন ? সূর্যদেবের ছেলে বলে তো মনু, যম, কর্ণ এদেরকেই জানি। আরে বাবা, এর বাইরেও এদিক-সেদিক আরো অনেকে ছিলো। যাই হোক, সূর্যদেবের এক ছেলের নাম ছিলো ভাগা। আর চন্দ্রদেবের এক মেয়ে ছিলো, তার নাম – বুঝেই ফেলেছেন – চন্দ্রা। ছিলো তো ছিলো, এরা বেশ নিজের মনে ফুর্তিতে দিন কাটাচ্ছিলো। একদা এই দুটি তরুণ-তরুণীর দেখা হলো বারা-লাচ-লা তে। বারা-লাচ-লা কি? সেটি একটি পার্বত্য গিরিপথ, লাদাখের দিকে যেতে পড়ে। তখনকার দিনে যেরকম হতো আর কি – চারি চক্ষের মিলন হবামাত্র দ্যুলোক-ভূলোক কেঁপে উঠলো, আকাশে-বাতাসে বাঁশি আর বেহালা বেজে উঠলো আর দুজনে ওমনি একে ওপরের প্রেমে পড়ে গেল। আসলে তখন তো ছেলে-মেয়েদের এরকম ফ্রি-মিক্সিং সমাজ ছিলো না, যাকে দেখে তারই প্রেমে পড়ে যেত আর কি।

08A Bara Lach La

এই সেই বারা-লাচ-লা। এবার আমরা যাই নি। মনিদীপার তোলা দু বছরের পুরোনো ছবি

ঠিক বলিউডের সিনেমার মতো – দূই বাপ প্রবল আপত্তি করে বসলেন। এতো বড়ো আস্পদ্দা – ইহারা লভ করিতে চায় ? স্বয়ং পছন্দ করিয়া বিবাহ করিতে চায়? হারগিজ নেহি। এদিকে চন্দ্রদেব আর সূর্যদেব ব্যক্তিগত জীবনে যে কেচ্ছার ফোয়ারা ছুটিয়েছেন, তার বেলায় যেন কোন দোষই নেই। ওই তো, চন্দ্রদেব – তিনি তো বৃহস্পতি মুনির বৌ তারাকে ফুসলিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো ৪৯৭ ধারাটি বাতিল হয়ে যায় নি – বৃহস্পতি সোজা দেবতাদের কাছে কমপ্লেন করেছিলেন। তারপর তারাদেবী তো ফিরলেন, কিন্তু তখন তিনি গর্ভবতী। সে নিয়েও মেলা লাফড়া হয়েছিলো – জারজ পুত্রের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে। আর এদিকে সূর্যদেব, তার তো আবার কুন্তীর সঙ্গে কেলেঙ্কারি – যা থেকে কর্ণের জন্ম হয়। সে সবে দোষ নেই, কিন্তু ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিক নিয়মে বিয়ে করতে চেয়েছে, ওমনি দুজনে একদম কাদের-খান-অমরীশ-পুরী হয়ে উঠলেন। অজুহাত দিলেন যে সূর্যদেবের ইচ্ছে তার ছেলে জগতে আলো ছড়াবে আর চন্দ্রদেবের ইচ্ছে তার মেয়ে রাতের আকাশে তারা জ্বালবে। যেহেতু এক আকাশে চন্দ্র-সূর্য ওঠে না, তাই তাদের বিয়ে সম্ভব নয়। এইসব ছেঁদো অজুহাত দিয়ে নিজেদের ইগো আর ব্যক্তিগত অ্যাম্বিশনের সামনে একদম ‘কুরবান’ করে দিলেন তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে।

তবে সেযুগের ছেলে-পিলেরাও এযুগের মতোই তালেবর – অতো সহজে ‘কুরবান’ হবার পাত্রই নয় তারা। চন্দ্রা আর ভাগা ঠিক করলো তারা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে। তা পালিয়ে যাবে কোথায় ? বাঃ, সেটাও বলতে হবে – ওই বারা-লাচ-লা তে, যেখানে ওদের চারচক্ষুর মিলন হয়েছিলো! প্ল্যান একদম পাক্কা, দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। মেয়েরা তো একটু বেশী পাংচুয়াল হয়, তাই চন্দ্রা ঠিক সময়মতো বারা-লাচ-লা পৌঁছে গিয়েছিলো। গিয়ে দেখে ভাগার কোন পাত্তা নেই। ভাগা শেষমুহূর্তে ঘাবড়ে গিয়ে ভাগলবা হয়ে গেলো কিনা তার সরোজমিনে তদন্ত করতে বেরোলো চন্দ্রা। হাঁটতে লাগলো কুনজুম লা-র দিকে। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে যখন আর শরীর চলছে না, তখন চন্দ্রা এসে পৌঁছলো একটি ঘননীল, কাকচক্ষু হ্রদের ধারে। সেখানে দুদণ্ড জিরিয়ে আবার হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে একসময় চন্দ্রা পৌঁছলো তান্ডি নামক একটা জায়গায়। সেখানে গিয়ে দেখে ভাগা হনহন করে উল্টো দিক থেকে আসছে – এতক্ষণে বাবুর খেয়াল হয়েছে যে তার বিয়ে। ভাগ্যিস তখনো তাদের বিয়ে হয় নি, তখনো “প্রেমে-বিভোর” স্টেজ চলছে – তাই ভাগার গালে হাই-হিল স্যান্ডেলের বাড়ি পড়ে নি, বরং একটি সুমধুর “কি-যে-করো-না-তুমি” হাসি তার কপালে জুটেছিলো। ব্যাস – আর কি – দুজনের বিবাহ হলো ওই তান্ডিতেই, স্বর্গ থেকে দিগবধূরা পুষ্পবৃষ্টি করলেন, শুভশঙ্খধ্বনি আর নন্দী-ভৃঙ্গীর সিটির আওয়াজে তিনভুবন মাতোয়ারা হয়ে উঠলো। এদের দুজনের মিলিত নাম হলো চন্দ্রভাগা।

08A Tandi

তান্ডি। এবার আমরা যাই নি। মনিদীপার তোলা দু বছরের পুরোনো ছবি

08A Suraj Tal

সুরজ তাল। এবার আমরা যাই নি। মনিদীপার তোলা দু বছরের পুরোনো ছবি

সেই জন্যেই বলা হয় ভাগা নদীর উৎস সুরজতালে, চন্দ্রা নদীর উৎস বারা-লাচ-লার কাছের এক হিমবাহতে – যেখান থেকে সে এক অন্তঃসলিলা নদী হয়ে আসে চন্দ্রতালে, সেই সুনীলহ্রদ যেখানে সে দুদন্ড জিরিয়েছিল। তারপর চন্দ্রতাল থেকে সে নদীরূপে যায় স্পিতি উপত্যকা চিরে, এবং ভাগা নদীর সঙ্গে তান্ডিতে মিলিত হয়ে চন্দ্রভাগা নামে বয়ে চললো সিন্ধুর এক শাখানদী হিসেবে। অনেকে আবার এই চন্দ্রতাল থেকে ট্রেক করে বারা-লাচ-লা যায় – যে পথে একদিন চন্দ্রা এসেছিলো ভাগাকে খুঁজতে, যে পথে সে অন্তঃসলিলা হয়ে বয়ে চলেছে।

সেই চন্দ্রতাল হ্রদ দেখতে আমরা চলেছি।

কাজা থেকে চন্দ্রতাল যাবার একটা নতুন রাস্তা হয়েছে। এটা যায় কিব্বের হয়ে চিচাম হয়ে। কিব্বের মনে আছে তো ? যেখানে আমরা কাজা থেকে গিয়েছিলাম – পাহাড়ের মাথায় – কমিক গ্রামটি তৈরি হবার আগে এটাই এশিয়ার উচ্চতম গ্রাম ছিলো। সেই কিব্বের গ্রামের মধ্যে দিয়ে অতি সরু গলিপথ – যা কারুর বাড়ির উঠোন তো আরকারুর বাড়ির পেছনের দেয়াল ঘেঁষে যায় – সেই ধরে যেতে যেতে পৌঁছলাম একটা ১০০০ ফুট গভীর খাড়াই খাদের সামনে। যার বহু নিচে – প্রায় দেখাই যায় দূরে বয়ে চলেছে সাম্বা-লাম্বা নালা (সত্যিই এই নাম, আমি বানাই নি) আর ওপর একটা একদম নতুন ঝাঁ-তকতকে ব্রিজ। এই ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গেলেই চিচাম তাই এই ব্রিজের নাম চিচাম ব্রিজ। চিচাম ব্রিজটা এই একবছর হলো খুলেছে, তার আগে নাকি একটা হাতে টানা রোপওয়ে ছিলো, যাতে একজন করে লোক একটি ঝুড়ির মতো জিনিসে চড়ে নিজে নিজে দড়ি টেনে এদিক থেকে ওদিকে যেতো। যারা যেতো, তাদের কলিজাটা কি জিনিস দিয়ে তৈরি ভাবতে ভাবতে এই এশিয়ার উচ্চতম ব্রিজটা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম চিচাম।

08 Checham bridge

চিচামের সেই ব্রিজ

চিচাম থেকে হানসা – যাবার পথে একটা নাম-না-জানা অপূর্ব সুন্দর জায়গায় থামলাম। রাস্তার দুপাশে খয়েরি ঢেউপাহাড়, দূরে নীলদিগন্তে বরফিলা পাহাড়ের সাদা ম্যাজিক আর রাস্তার মাঝখানে একটি নিঃসঙ্গ চরটেন। একেবারে নিঃসঙ্গ নয়, যাত্রীরা এর আশেপাশে পাথরের ছোট ছোট ঢিপি বানিয়ে গেছে। শুনেছি অনেকবছর আগে, যখন এইসব পথ হেঁটে লোকে পেরোতো এবং প্রায়শই পথ হারিয়ে বেঘোরে মরতো, তখন যাত্রীরা কোন দুর্গম জায়গায় পৌঁছতে পারলে সেখানে একটা পাথরের ঢিবি বানিয়ে যেত। শুধু এই জানাতে নয় যে তারা এই দুর্গম জায়গাটিতে পৌঁছতে পেরেছে – ওই পাথরের ঢিবির পাশে কিছু শুকনো খাবার এবং জল রেখে দিয়ে যেতো তারা, পরবর্তী যাত্রীদের জন্যে। সেই রেওয়াজ আজো চলে আসছে – এইসব দুর্গম পয়েন্টে যাত্রীরা একটা করে ছোট ঢিপি বানিয়ে রেখে যায়। খাবার বা জল অবশ্য আর রেখে যায় না।

08 Checham (2)

আমরা – আদি, আমি, অমিত

08 checham

হানসার আগে সেই নাম না জানা জায়গা।

08 Chicham 8

হানসার আগে সেই নাম না জানা জায়গা।

Chicham

গিন্নি

হানসা- কিয়োটো পেরিয়ে, লোসার পেরিয়ে সেই কুনজুম পাস। একবার থামলাম, কুনজুম মাতার সামনে মাথা ঠেকালাম আর দুচোখ ভরে দেখলাম দুপাশের ছিটিয়ে পড়ে থাকা সৌন্দর্য। তারপর আবার ছুট-ছুট, নইলে দেরী হয়ে যাবে চন্দ্রতাল পৌঁছতে।

08A Spiti enroute to Hansa

স্পিতি নদী আর তার রঙের বাহার

চন্দ্রতালের কাছে থাকার ব্যবস্থা নেই। থাকতে হয় ক্যাম্প-সাইটে, সেখানে সারি-সারি তাঁবু খাটানো আছে। ক্যাম্পসাইট থেকে দু কিলোমিটার চড়াই বেয়ে গাড়ি করে যেতে হয় চন্দ্রতালের কাছের পার্কিং পয়েন্ট। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার মতো হেঁটে যেতে হয়। হেঁটে যেতে বয়স্ক লোকেদের একটু কষ্ট হতে পারে, বাকিদের হওয়া উচিৎ নয়। মানে আমাদের মতন আনফিট লোকেরাও তো যেতে পেরেছিলো মশাই। তবে বয়স্ক বা ছোঁড়া, সুস্থ বা খোঁড়া – যাই হোন না কেন, অবশ্যই যাবেন। কষ্ট হলেও যাবেন। সময় থাকলে একবার প্রদক্ষিণও করবেন – প্রায় আড়াই কিলোমিটার হবে, কিন্তু আস্তে আস্তে করলে ঠিক পারবেন। আমরা করতে পারি নি কারণ সময় ছিলো না।

চন্দ্রতাল কেমন, তা কিভাবে বর্ণনা করবো তাই ভাবছি। লিখতে গেলেই সেই লালমোহনবাবু যেমন কি যেন দেখে “অসাধারণ-অনবদ্য-অসামান্য” ইত্যাদি ১১খানা অ দিয়ে বিশেষণ ব্যবহার করেছিলেন, সেইরকম হয়ে যাবে। তার বদলে চাঁচাছোলা গোদা বাংলায় যাক – একটা নিঃসঙ্গ পর্বতমোড়া উপত্যাকা, তার মাঝখানে একটি ঐশ্বরীয় নীল হ্রদ, যে রোদের আলোয় ঝিলকিয়ে উঠছে। হাওয়ায় তার ওপরের জলে খেলে যাচ্ছে একটা হালকা তিরতির, আর তাই মুহূর্তে মুহূর্তে তার রূপ পাল্টে যাচ্ছে। রঙ দেখে মনে হচ্ছে যে কোন এক অতি বাজে ফোটোগ্রাফার ছবিতে একগাদা কালার স্যাচুরেসন করে ফেলে একটা অস্বাভাবিক রঙ করে ফেলেছে – বাস্তবে এরকম রঙ হয়ই না। কটা ছবি দিলাম – দেখুন যদি এর থেকে কিছু অনুভব করতে পারেন।

08 Chandrataal 2

08 Chandrataal 3

08 Chandrataal 4

08 Chandrataal 5

চন্দ্রতাল থেকে ক্যাম্পসাইটে ফিরলাম তখন বিকেল ফুরিয়ে এসেছে। আমরা থাকছি প্যারাসল ক্যাম্পে – খুব ভালো ব্যবস্থা। ক্যাম্পে পৌঁছনো মাত্রেই গরম চা আর একরাশ বিস্কুট নিয়ে হাজির তারা। টেন্টের বাইরে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল পাতা, সেখানে বসে পা লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে চায়ে চুমুক দিতে যা আনন্দ হলো কি বলবো। তারপর ঢুকলাম আমাদের তাঁবুতে।

হরি হরি – এ তাঁবু নাকি? এতো রীতিমত হোটেলের ঘর! সামনে একটা মালপত্র রাখার খুপরি ঘর, তার পেছনে বিশাল ডবলবেড, পাশে বেডসাইড টেবিল। খাটে বেশ মোলায়েম মোটা গদি, তার ওপর আরো মোটা লেপ। একপাশে টেবিল-চেয়ার। অ্যাট্যাচড বাথরুম – ওয়েসটার্ন স্টাইল উইথ রানিং ওয়াটার! নাথিং তো কমপ্লেন আবাউট, যাকে বলে। এদিকে তাঁবু বলতে তো আমি ভেবে নিয়েছিলাম যে মাটিতে বিছানা, মোটকা কম্বল বা স্লিপিং ব্যাগ – ওই হেমেন রায়ের “যকের ধন”এ যেরকম ছিলো আর কি।

এখানে তাঁবুতে দেখলাম ইলেকট্রিক আলোর ব্যবস্থা আছে। বাইরে আছে সোলার প্যানেল, তাতে চলে। রাত নটায় নিভিয়ে দেওয়া হয়। তখন ভরসা ইলেকট্রিক হ্যারিকেন – সেও চার্জ হয় ওই সৌরবিদ্যুতের জোরে। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম একটা জলের ট্যাঙ্ক আছে, ওই সৌরবিদ্যুতে গরম করা জল ধরা থাকে। খাবার আগে বা পরে হাত ধুতে ওই গরমজলটাই ভরসা।

বাইরে বসে বসে দেখতে থাকলাম সামনের পাহাড়ের বরফের সাদা রঙ মরে এলো। নীল আকাশ ক্রমে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠলো, দেখা দিলো চাঁদ – তার রূপোর মতো আলো ঠিকরে পড়লো পাহাড়ের সাদা শিখরে।

না, ভুল বললাম। বাইরে বসে থাকতে পারি নি একটানা। প্রথমে একটা মোটা জ্যাকেট পরে বসেছিলাম, একটু বাদে তাঁবুতে গিয়ে জ্যাকেটের তলায় সোয়েটার পরে এলাম। তারপর ক্রমাগত একটু বাদে বাদে তাঁবুতে যাচ্ছি আর কিছু চাপিয়ে আসছি। একে একে চাপলো থার্মাল ইনার, সয়েটশার্ট, সোয়েটার, জ্যাকেট, টুপি, মাফলার, গ্লাভস। স্ট্রিপটিজের ঠিক উল্টো প্রসেস আর কি। এসব করেও কিছুক্ষণ বাদে আর পারা গেলো না, গুটিগুটি ঢুকে পড়লাম ডাইনিংএর তাঁবুতে। সেখানে বুখারি জ্বলছে, তার ওমে কি আরাম!

সন্ধ্যেটা কাটলো ওই ডাইনিং টেন্টে তাস খেলে, গান শুনে, অতি-সাধরণ-কিন্তু-অসাধারণ-খেতে খাবার খেয়ে, আড্ডা মেরে। শুয়ে পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি, তাই ভোরের আলোয় চোখ খুলে দেখতে পেয়েছিলাম চাঁদের আলোয় পাহাড়ের রূপ, তারপর সকালের গোলাপী আভা। অবশ্য এইসব দেখে একটু বেশী উচ্ছ্বাস দেখিয়ে ফেলেছিলাম, একটু বেশী জোরে “আহা আহা” বলেছিলাম বলে বৌয়েরা আমাদের দুই বন্ধুকে অনেক নরমগরম শুনিয়ে দিলেন। তবে আমাদের মনে বোরোলীন লাগানো আছে কিনা, তাই জীবনের এসব ছোটখাটো ওঠাপড়া গায়েই লাগে না।

পরদিন ভোরে উঠে ফেরা।একেবারে ভোরের আলোয় বেরিয়ে পড়লাম। পথে পড়লো সেই সব চেনা জায়গা – ছোটি ধারার ভয়াবহ পাথুরে ঝর্ণা, বাতালে চাচা-চাচির ধাবা তারপর ছত্রু আর তার চন্দ্র ধাবা। সেখানে আলু-পরোটা আর চা সহযোগে উত্তম ব্রেকফাস্ট, তারপর রোটাং হয়ে গোলাবা হয়ে রানী নাল্লা আর তার সামনের মোবাইল ম্যাগি সেন্টার হয়ে, কোঠি পেরিয়ে মানালি দুপুর নাগাদ।

মানালিতে বিশেষ কিছু ঘুরে দেখি নি। যদিও আমাদের কেউ “কিচ্ছু

08 Keran's cafe (Rice Bowl)

করবেন না” বলে নি, কিন্তু যাত্রাশেষে মনটা কেমন কাটা-ঘুড়ির মতো উদ্দেশ্যহীন লাগে। মানালির বাজারে টি-শার্ট কিনলাম (সেখানে দেখলাম মহাত্মা-গান্ধী-বব-ডিলান-আভেঞ্জার-তিব্বতী-আর্ট-ভার্লি-আর্ট সবাই পাশাপাশি বিদ্যমান। পাশের রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে দেখা হয়ে গেলো তার মালকিন সেই ইজরায়েলি ভদ্রমহিলার সঙ্গে। ভারী হাসিখুশি, নাম বললেন “কেরান”। বললেন হিব্রুতে “কেরান” আর হিন্দিতে (বা বাংলাতে) “কিরণ” মানে একই – সূর্যালোক।

সূর্যের কিরণের একঝলক হাসি মেখে এযাত্রার নটেগাছটা মুড়োলাম আমরা।

———————————-

উপসংহারঃ

কাল রাত্রে লেখাটা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে দেখি ঘরের টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে আর তার সামনে আধাসিলুয়েটে একটা ছায়ামূর্তি। তার চোখে চশমা, ব্যাকব্রাশ করা চুল, আধকপালে টাক। ভদ্রলোক আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছেন। একসময় ভদ্রলোক কড়া গলায় জিগ্যেস করলেন

“হিমালয় নিয়ে ভ্রমণকাহিনী লিখছো?”

ঘাড় নিচু করে মুখে একটা হেঁহেঁ হাসি ফুটিয়ে তুলেছি সবে, তার আগেই ছায়ামূর্তি আবার প্রশ্ন করলেন

“তুমি একসময় কবিতা লিখতে না?”

“কবিতা? মানে সে তো বহুদিন আগে…”

“বলো তো, প্রবোধের শব্দের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মিল কোন শব্দের হবে?”

কি বলবো ভাবছি, ছায়ামূর্তি নিজেই উত্তর দিয়ে দিলেন “নির্বোধ। বুঝলে, নির্বোধ। কথাটা মনে রেখো।“

ছায়ামূর্তি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। দেখলাম খাটের ওপরে “দেবতাত্মা হিমালয়” বইটা পড়ে আছে।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৭

সপ্তম পর্বঃ হিকিম-কমিক-লাংজা

পিন ভ্যালি থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে আমরা ফিরে এলাম কাজাতে। কাজাতে ছোট্ট একটা চা-বিরতি, তারপর আমরা যাবো হিকিম, তারপর কমিক, শেষে লাংজা। লাংজাতে রাত্রিবাস – হোম-স্টে।

কাজাতে একটু চা খাবার জন্যে থামলাম “কুমফেন” নামের একটা মাঝারি গোছের হোটেলে। একদম রাস্তার ওপরেই, কাজার শাক্য মনাস্ট্রির একটা বাড়ি আগে। সেখানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিচ্ছি, হঠাৎ “হ্যালো স্যার” বলে “ইনক্রেডিবল স্পিতি”র সেই পূজা আচমকা কোথা থেকে এসে উপস্থিত। কিছুক্ষণ “আরে-আপনি-এখানে-তারপর-কেমন-বেড়ালেন” ইত্যাদি আমড়াগাছির পর বোঝা গেলো যে “শাক্য-এবোড” (মানে যে হোটেলে আমরা আগেরবার ছিলাম), “স্নো লায়ন” (এটা এখানকার একটা বেশ ভালো হোটেল) আর এই “কুমফেন”, তিনটে একই মালিকের। এবং তাদেরই ট্র্যাভেল বিজনেসের নাম “ইনক্রেডিবল স্পিতি”। এবং “ইনক্রেডিবল স্পিতি”র অফিস হলো এই “কুমফেন” হোটেলের রিসেপশনের পেছনের একটি এককামরার ঘর।

কুমফেন হোটেলের প্রধান আকর্ষণ এর বিশাল খাবার ঘর – যার একপ্রান্তের দেওয়ালে টাঙানো অজস্র তিব্বতী মুখোশ এবং অন্যান্য টুকিটাকি। একটা কোনায় সোফা রাখা আছে, তার পাশেই বইয়ের আলমারী – তাতে বেশ কিছু তিব্বতী সংস্কৃতি ও ধর্মের ওপর বই আছে। একটা কেনা গেল (তার থেকেই তো কিছু কিছু এখানে ঝেড়ে দিচ্ছি; নইলে কি ভাবছেন – আমি একেবারে বিদ্যাবোঝাই বাবুমশাই?) কাঁচের গেলাসে লেবু-আদা দেওয়া চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তবে বেরোবার আগে একটা মন্তব্যের বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

07 Kumpeng Hotel

কুমপেন হোটেলের দেয়ালের চমৎকার সাজসজ্জা

সকালবেলায় মাড গ্রাম থেকে বেরোবার আগে সোনু একটা রহস্যময় কথা বলেছিলো “যদি লাংজাতে গিয়ে শরীর খারাপ করে, তাহলে আমাকে বলবেন। আমরা কাজাতে নেমে আসবো।“ এই রহস্যজনক তথা ভয়জনক মন্তব্যটির অন্তর্নিহিত অর্থটা কি, মানে এখানে কবি ঠিক কি বলতে চেয়েছেন – সেটা বিস্তারিতভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। পূজার সঙ্গে কথা বলে যা আবছা বুঝলাম, তা হলো লাংজা বেশ হাই-অলটিচ্যুড জায়গা, সেখানে নাকি অনেকেরই রাত্রে শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে। এবং আমাদের সোনুবাবু সেখানে রাতে থাকেন না, নিচে নেমে আসেন। অতএব মাঝরাত্রে শরীর খারাপ করলে গাড়ি থাকবে না – ডাকাও যাবে না কারণ ওখানে ফোন চলে না। অতএব “ভগবান কি প্যারে” হয়ে যাবার একটা হালকা সম্ভবনা আছে।

যাই হোক, দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়লাম। পয়লা গন্তব্য – হিকিম। কাজা থেকে একটা হাড়হিমকারী এবং সৌন্দর্যে শ্বাসস্তব্ধকারী রাস্তা দিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার মিটার (সাড়ে চোদ্দহাজার ফিট) উচ্চতার এই পুঁচকে গ্রামটাতে পৌঁছতে হয়। এই গ্রামে আছে বিশ্বের উচ্চতম পোস্টঅফিসটি, যার পিনকোড হলো ১৭২১১৪। হিকিম গ্রামটা রাস্তা থেকে খাড়া নিচু কাদামাখা পথ বেয়ে অনবরত হড়কাতে হড়কাতে পৌঁছতে হয়। গ্রাম বলতে কয়েকটা পাথর-কাঠ দিয়ে বানানো সাদা বাড়ি (যাদের জানলায় এদিককার মার্কামারা কালো বর্ডার), পোস্টঅফিসটি এবং তার পাশে একটি ক্যাফে। এই ক্যাফেটির প্রধান ব্যবসা হলো সচিত্র পোস্টকার্ড বিক্রি করা এবং ঠিকানা লিখে দিলে সেগুলো পোস্ট করার ব্যবস্থাও করা। আমরাও কয়েকখানা পোস্টকার্ড ছেড়ে দিলুম এখান থেকে।

07 Hikkim

হিকিমের হড়কানো পথ

07 Hikkim 2

পোস্টকার্ড বিক্রেতা ছেলেটার অঙ্কে দক্ষতা দেখলাম হুবহু আমার মেয়ের মতো। তার দোকানের রেটকার্ড হচ্ছে “শুধু পোস্টকার্ড – ২৫ টাকা পিস; পোস্টকার্ড কিনে পোস্ট করার অর্ডার দিলে ৫০ টাকা পিস।“ এহেন অবস্থায় আমি যদি একসেট পোস্টকার্ড কিনি (১ সেট = ৬ পিস) এবং তার মধ্যে ৪টি পোস্টকার্ড পোস্ট করি, তাহলে কতো দিতে হবে ? ছোকরা প্রথমে ৬কে ২৫ দিয়ে গুণ করলো, তারপর ৪কে ৫০ দিয়ে গুণ করলো, তারপর আবার ৪ দিয়ে ২৫কে গুণ করলো তারপর…তারপর আর কিছু করতে পারে নি কারণ আমি তার খাতা কেড়ে নিয়ে ঘ্যাঁচ করে সব কেটে দিয়ে ২৫০/- লিখে দিয়েছিলাম আর দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিলাম “ত্রৈরাশিক না ভগ্নাংশ, কোনটা দিয়ে করছো, বাছা ?”

এখানে পোস্ট করা সব চিঠি গন্তব্যে পৌঁছয় না – গড়ে প্রতি দুটোতে একটা চিঠি হারায়। কিন্তু তবুও এখান থেকে পোস্টকার্ড পাঠাবেন অবশ্যই। ছোটবেলায় কাগজের নৌকো ভাসাবার সময় তাতে যখন নাম লিখতেন, ভাবতেন কি যে সে নৌকো আদৌ কারোর হাতে গিয়ে কোনদিন পড়বে কিনা? তবুও – ভাসাতেন তো?

পরের গন্তব্য কমিক গ্রাম। হিকিম থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। ৪৫৮৭ মিটার উচ্চতা, জনসংখ্যা ১১৪। পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” গ্রাম। গ্রামের ওপরে যেখানে গাড়ি থামে, সেখানে একটা ক্যাফে-রেস্তোরাঁটা রয়েছে – তারাও দেখলাম লিখে রেখেছে তারা নাকি পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” ক্যাফে! আশেপাশে দুএকটা হোমস্টেও আছে, তারাও নিজেদের পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” হোমস্টে বলে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। কি জানি – হয়তো এই উচ্চতম ব্যাপারটা না লিখলে ট্যুরিস্ট মহলে তেমন পাত্তা পাওয়া না। যদিও আশেপাশের দৃশ্য মনোমুগ্ধকারী।

কমিক গ্রামে দুটি মনাস্ট্রি আছে – দুটিরই একই নাম – তানগুড মনাস্ট্রি। কি হলো – অতো ভুরু কুঁচকে কি ভাবতে বসলেন? আরে মশাই, এই নামটা তো চেনা – কাজার শাক্য মনাস্ট্রিটারও অন্যনাম তো তানগুড মনাস্ট্রি। শাক্য সঙ্ঘের মনাস্ট্রি – মানে ওই বিক্রমশিলা – কদম সঙ্ঘের পরবর্তী যে তিনটি সঙ্ঘ উঠে আসে, তাদের একটি। এবার মনে পড়ছে? এই দুটি মনাস্ট্রির একটি পুরনো এবং প্রায় পরিত্যক্ত, নতুনটাতে প্রায় জনা-তিরিশ লামা থাকেন। একটা স্কুলও চালানো হয়।

DSC_1631_c

কমিকের “এখন-নতুন” মনাস্ট্রি – মনিদীপার তোলা ছবি

এই নতুন-পুরনো নিয়ে আবার গল্প আছে। লোকে বলে এই নতুনটা আসলে নাকি ব…হু বছর আগেকার। এখানে নাকি মহাকালের মূর্তি আছে। এটি পুরনো হয়ে যাওয়ায় লোকেরা হিকিমের কাছে নতুন একটি মনাস্ট্রি বানিয়ে তাতে চলে যায়। কিন্ত মহাকালের ওই মূর্তিটাকে কেউ নাড়াতে পারে নি। শেষে এক লামাকে মহাকালের সেবাইত হিসেবে রেখে বাকিরা চলে যায় হিকিমে, নতুন মঠে। পরে একটি ভূমিকম্পে হিকিমের নতুন মনাস্ট্রিটা নাকি ধুলিস্যাৎ হয়ে যায় কিন্তু এই পুরনো মনাস্ট্রি নাকি তার মহাকালের মূর্তি নিয়ে অটুট থাকে। তখন সবাই আবার ফিরে আসে এবং এই মনাস্ট্রিটা নতুন করে গড়ে তোলে।

এই “এখন-নতুন” মনাস্ট্রিটা চিনে স্টাইলে তৈরি। দোতলা, রেকট্যাংগুলার, সাদা-লাল-নীল রঙ, জানলার চারপাশে কালো বর্ডার। সামনে তিব্বতী দার-ইকগ পতাকা। (কি বললেন – দার-ইকগ আবার কি? তৃতীয় পর্বে গিয়ে রিভাইস করে আসুন মশাই – এতো ভুলোমন হলে চলবে কি করে?) মনাস্ট্রিতে মেয়েদের ঢোকা বারণ, তাই একাই গেলাম ভেতরে। ছবি তোলা যথারীতি বারণ। মনাস্ট্রিতে ঢুকেই দেখলাম একটি স্টাফ করা স্নো-লেপার্ড (এই একটিমাত্র স্নো-লেপার্ড দেখেছি আমি), লোকজন কেউ কোত্থাও নেই। মনাস্ট্রির প্রার্থনাঘরটি একতলায় একটু নিচুমতন, সেটা প্রথমটায় চোখে পড়ে না। তাই সেটাকে দেখতে না পেয়ে ভুল করে আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম একটা বেশ বড়ো হলঘর, দুজন মহিলা সেটা ঝাঁট দিচ্ছেন। বুঝলাম শতাব্দীপ্রাচীন ভণ্ডামি আজো চলিতেছে – মেয়েদের প্রার্থনা করতে দিতেই যতো আপত্তি, তাদেরকে মিনি-মাগনা খাটিয়ে নিতে বিশেষ আপত্তি নেই। তারপর কোনদিকে যাই ভাবতে ভাবতে ডাইনে মোচড় মেরে দেখি – ওবাবা, এতো লামাদের থাকবার জায়গা। আর তার প্রথম ঘরটাই হলো একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাথরুম।

একটুও বাড়িয়ে বলছি না, বাথরুমটা ঝকঝকে পরিষ্কার, রুচিপূর্ণ টালি মোড়া, ওয়েস্টার্ন স্টাইলের, তোয়ালে-জল-টয়লেট পেপার সব আছে। আমার এদিকে বাথরুম পাবো-পাবো করছিলো অনেকক্ষণ থেকেই, তাই এই চমৎকার বাথরুমটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে ফেললুম। মনে মনে ভাবলাম – এতো আমার নিছক বাথরুম করা নয়, এ আমার তীব্র সিম্বলিক প্রতিবাদ – মেয়েদেরকে এই মনাস্ট্রিতে ঢুকতে না দেওয়ার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। আমার মহিলা বন্ধুরা, যারা বলেন যে আমাকে কোনো নারীবাদী প্রতিবাদে পাওয়া যায় না – প্লিজ নোট!!

তীব্র প্রতিবাদটা সেরে নিচে এসে প্রার্থনাগৃহটায় উঁকি মারলাম। আহামরি কিছু নয়, মহাকালের মূর্তিটিও কোথায় কে জানে। অতএব মানে মানে কেটে পড়লাম।

এর তুলনায় আমার কমিকের পুরনো পরিত্যক্ত মনাস্ট্রিটা বেশ লাগলো। মাটির তৈরি, হলুদ দেয়াল, মূল প্রার্থনাগৃহের ওপরে সোনালী রঙের ধর্মচক্র ও দুপাশে দুটি হরিণ। চারকোনে চারটি সোনালী ধ্বজ, যা নাকি বুদ্ধের প্রতীক। কেউ নেই ভিতরে, তাই এখানে চুপ করে বসে থাকতে ভারী ভালো লাগে।

DSC_1623

কমিকের পুরনো মনাস্ট্রি – মনিদীপার তোলা ছবি

 

কমিকএর সেই পৃথিবীর উচ্চতম “গাড়িতে-করে-যাওয়া-যায়-এমন” ক্যাফেতে দুপুরের খাওয়াটা সারা হলো। এখানে একটা কমলা রঙের বেশ অভিনব চা খেলাম, যার নাম “সি-বাক-থর্ন” চা (স্থানীয় নাম নাকি তিরকু চা)। এই সি-বাক-থর্ন তিব্বতী ওষুধে ব্যবহার হতো বহুশতাব্দী ধরে – এখন নানান আয়ুর্বেদিক ওষুধে এর প্রয়োগ হয়। আমাদের রামদেববাবার পতঞ্জলিও এর জুস বানিয়ে বিক্রি করছেন আজকাল!

কমিক থেকে লাংজায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। মেঘলা আকাশে কমলালেবু রঙের সূর্যমশাই টুপ করে ডুব মারবার মতলব ভাঁজছেন। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সোনালী আলোর চাদর। সেই বিকেলের কনে-দেখানো-আলোয় আমরা দেখে ফেললাম লাংজার হাজার বছরের পুরনো সোনালী রঙের বিশাল বুদ্ধমূর্তিটিকে। আর সামনের ল্যান্ডস্কেপ জুড়ে থাকা চাউ-চাউ-কাং-নেল্ডা পর্বতটিকে (আমাকে কিছু বলবেন না; নামটা ওইরকমই)।

লাংজা-কমিক-হিকিম – এই তিনটে জায়গাতেই পাওয়া যায় ট্রায়াসিক-জুরাসিক যুগের প্রাচীন ফসিল – আমোনয়েড, ট্রাইলোবাইট ইত্যাদি। এ সেই যুগের কথা, যখন হিমালয় বলে কিছু ছিলো না, ছিলো গন্ডোয়ানা আর কাইমেরা, তার মাঝে পেলিও-টেথিস সমুদ্র। সেই সমুদ্রের একটা অংশ পরে টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ায় ভাঁজ মেরে হয়ে যায় হিমালয়। সেই থেকে এখানে রয়ে গেছে সামুদ্রিক সব প্রাণীদের ফসিল।

DSC_1595_c

লাংজার সোনালী বুদ্ধ – মনিদীপার তোলা ছবি

07 Langza 2

লাংজায় বিকেল

লাংজায় ঘুরে বেড়াতে বেশ লাগছিলো। অবশেষে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো – এখানে কি রাতে থাকবো?

দেখলাম লাংজার গ্রাম যেটি (যার নাম লাংজা-ইয়ংমা), সেটি গাড়ির রাস্তা থেকে কর্দমাক্ত-পাকদণ্ডী বেয়ে মাইলখানেক নিচে। মালপত্র নিয়ে যাবার কুলি নেই, “আপনা-হাত-জগন্নাথ”। মেরে কেটে যদি নিচে নামতেও পারি, সকালে হার্গিজ উঠতে পারবো না বলেই আমার বিশ্বাস। এসব দেখেশুনে, ভেবেচিন্তে, পাতি-বাঙালীর অ্যাডভেঞ্চার ক্ষমতা আসলে কতটা তার একটা নিরপেক্ষ মাপজোক করে লাংজায় থাকার পরিকল্পনা ত্যাগ করলাম।

গুটিগুটি কাজাতে ফিরে এলাম সেরাত্রে।

(চলবে)

——————————-

উত্তরকথন

পরে জেনেছিলাম হিকিমের পোস্টঅফিসের পোস্টমাস্টারের নাম রিনচেন চেরিং; ১৯৮৩এ এই পোস্টঅফিস খোলা থেকেই তিনি এখানকার পোস্টমাস্টার। একাই চালান এই পোস্টঅফিস (মানে অফিসিয়াল কেউ নেই; একআধজন রতন থাকলেও থাকতে পারে)। তার সঙ্গে দেখা করি নি কেন ভেবে আপসোস হয়।

হিকিম থেকে চিঠি পায়ে হাঁটা পথে যায় কাজা; সেখান থেকে রেকং-পিও হয়ে সিমলা। সিমলা থেকে ট্রেনে কালকা, সেখান থেকে বাসে দিল্লি। তারপর সারা ভারতবর্ষে।

হিকিমের থেকেও উঁচু একটা পোস্টঅফিস আছে যেটা এভারেস্ট বেস-ক্যাম্পে। কিন্তু সেটা কোন পাকা পোস্টঅফিস নয় বলে সেটাকে হিসেবে ধরা হয় না। অন্তত গিনেস বা লিমকা বুক অফ রেকর্ডস সেটাকে ধরে না।

কমিকের সেই “এখন-নতুন” মনাস্ট্রি, যেখানে আমি আমার তীব্র প্রতিবাদ রেখে এসেছি, সেখানে নাকি নানান আশ্চর্য জিনিস লুক্কায়িত আছে। ড্রাগনের ডিম, একশৃঙ্গের সিং, ভেড়ার ওপরের মাড়ির দাঁত, এক ভয়ানক দানবের পাঁজরের টুকরো আর প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ল্যাজ। থাকতেই পারে, এতে অবাক হবার তো কিছু নেই। তবে ওই ভেড়ার ওপরের মাড়ির দাঁতটা আমার বিশ্বাস হয় নি মশাই। ওটা বড্ডো বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৬

ষষ্ঠ পর্বঃ পিন ভ্যালীতে একটি চমৎপ্রদ রাত্রি

পিন ভ্যালীর এই মাড ভিলেজে থাকবার বেশী জায়গা নেই। যে জায়গাটা সব থেকে জনপ্রিয় – বলতে পারেন অন্তর্জালে যার প্রায় একছত্র আধিপত্য – তার নাম “তারা হোম স্টে”।

06 Pin Valley 2

পিন উপত্যকা – সবুজের সমারহ

06 Pin Valley 3

পিন ভ্যালী যাবার পথে

এখন আবার হোম স্টেতে থাকার একটা হামলে-পড়া রেওয়াজ হয়েছে। হোম স্টেতে লোকাল খাবার না খেলে ও তার ড্রাই টয়লেট – যাকে আমাদের দাদু-দিদিমারা “খাটা পায়খানা” বলতেন, সেখানে প্রাতঃকৃত্য না সারলে আপনি পর্যটক হিসেবে সমাজে নাম কিনতে পারবেন না। তবে বাকিদের আওয়াজ দিয়ে আর কি হবে, আমরাও দু জায়গায় হোম স্টে বুক করবার চেষ্টা করেছিলাম – একটা লাংজায়, অন্যটি এই মাড গ্রাম। মাড গ্রামে আমরা ওই “তারা হোম স্টে” পাই নি, আমাদের বুকিং হয়েছে “পিন পার্বতী গেস্ট হাউস”এ। আমাদের ইনক্রেডিবল স্পিতির বিশেষবাবু অবশ্য বলে দিয়েছিলেন যে “পিন পার্বতী” হোটেলটির মধ্যে একমাত্র “হোটেল-সুলভ” ব্যাপার হচ্ছে এতে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের এট্যাচড বাথ রয়েছে – এ ছাড়া অন্য সব দিক থেকে একে হোম স্টে বলেই ধরে নিন। এর থেকে যা বুঝবেন, বুঝুন। আমরা অবশ্য এই বুঝেছিলাম যে একটা অখাদ্য হোটেল হতে চলেছে। সেই তুলনায় এখানে পৌঁছে দেখলাম হোটেলটা কিন্তু মোটেই মন্দ নয়। ঘরগুলো বড়ো, বাথরুম বড়ো এবং পরিষ্কার, তাতে গিজার আছে – সে গিজার চলেও বটে। বিছানার চাদরও পরিষ্কার, তার ওপর মোটা রেজাই দেওয়া। আর কি চান মশাই?

(এই ফাঁকে চুপি চুপি বলে রাখি, আমাদের গ্রুপের একজন – তার নাম বলা বারণ – সে হোটেলের বিছানার চাদরের ওপর পাতবার জন্যে বেডশীট কিনেছিলো মানালি থেকে। শেষ অব্দি পেতেছিলো কিনা তা অবশ্য জানা নেই।)

06 Pin Valley Hotel

বাঁদিকে আমাদের হোটেল, ডাইনে “তারা হোমস্টে”

হোটেলে দেখলাম ওসব রেজিস্ট্রার-মেজিস্টারের পাট নেই। একটা রোগা খেঁকুরে মতন লোক সোনুকে জিগ্যেস করলো আমরাই ‘তারা’ কিনা। তারপর সরু সিমেন্টের আধ-তৈরি রেলিংবিহীন সিঁড়ি দিয়ে হুস-হাপুস করতে করতে আমাদের মালপত্তর ওপরে তুলে দিলো। তারপর সেই দৌড়ে গেলো কিচেনে – চা বানাতে। মানে রিসেপশানিস্ট কাম ওয়েটার-কাম-কুক-কাম-সবকিছু ইনিই। স্যাটাবোস-গুড়বেড়িয়া-ন্যাটাহরি-জুনো-মার্কোপোলো – সব একই দেহে রামকৃষ্ণ হয়ে গেছে।

চা খেতে খেতেই এই খেঁকুরে লোকটা (তার নাম ততক্ষনে জেনে ফেলেছি – গোপাল) জিগ্যেস করলো কখন ডিনার নেবো। কি আছে ডিনারে জিগ্যেস করে জানলাম মেনুটি বিলকুল বাহুল্যবর্জিত – ভাত, রুটি, বাঁধাকপির তরকারি আর ডাল। আগের রাত্তিরেই অমন উমদা তিব্বতী ডিনারের পর একটু মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগলো। জিগ্যেস করলাম

“চিকেন মিলেগা ?”

“আপ লোগোন কি তো ভেজ মিল বুক কিয়া হুওা হ্যাঁয়…“

“আরে, হাম অলগ সা পায়সা দে দেঙ্গে। মিলাগা? “

গোপালবাবু তাও গোঁজ মেরে থাকে। বুঝলাম যে এসব বাড়তি বখেড়া নেওয়া তার চরিত্র-বিরোধী। আরেকটু পেড়াপেড়ি করাতে জানা গেল যে মুরগী নেই এবং এখানে পাওয়াও সম্ভব নয়। “মালিক গিয়া হ্যাঁয় কাজা। উহ আগার মুরগী লেকে আয়া রাত তক – তো হম জরুর বানা দেঙ্গে। উসমে ক্যা হ্যাঁয়? দস মিনিট হি তো লাগতা হ্যাঁয়!!“

দশ মিনিটে মুরগী রান্না? বলে কি রে এ ! যাক গে, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম এখানে ঘুরে দেখার খুব একটা কিছু নেই, তায় আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। সামনের পাহাড়টায় নাকি বরফ পড়ে শীতের সময় বরফের সুন্দর ঢাল তৈরি হয় আর এখানকার লোকেরা সেখানে স্কি করে। শীতে হয়তো হতেও পারে, এখন তো দেখলাম নিছক সবুজ পাহাড়। পিন ভ্যালী তো আবার ন্যাশনাল পার্ক, সেখানে তো নাকি সাইবেরিয়ান আইবেক্স (আচ্ছা – বলছে সাইবেরিয়ান, এদিকে পিন ভ্যালীতে পাওয়া যায় কেন? এতো মশাই হায়দ্রাবাদের মশহুর বেকারীর নাম ‘করাচী বেকারী’ কেন গোছের কেস!)আর স্নো লেপার্ড থাকে বলে শুনেছি – তারাই বা কোথায়? খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও তাদের দেখা পেলাম না, উল্টে ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে ভিজে আমার ১২টা প্রমাণ সাইজের হাঁচি হলো। অতএব ঘরের ছেলে গুটিগুটি গোপালবাবুর হোটেলে।

06 Pin Valley 4

বাঁদিকে “তারা হোমস্টে”

06 Pin Valley

হোটেলের সামনে পাহাড় আর ভেড়ার পাল

একটু বাদে আমরা সবাই একটা ঘরে বেশ জমিয়ে বসেছি। তাস, বৃদ্ধ-সন্ন্যাসী, ব্লু-টুথ স্পিকারে মৃদু কিশোর, কম্বলের তলায় পা – ঠিক যেরকমটি হওয়া উচিৎ আর কি। এমন সময় সুগতা ঘুরে এসে বললো “ব্যাপারটা রহস্যজনক।“

রহস্য? কিসের রহস্য? এদিকে দু নম্বর পেগ চলছে, ২১-এর ডাক – ডবল দেবো কিনা ভাবছি, এই মহেন্দ্রক্ষণে এসব আবার কি কথা! জিজ্ঞ্যেস করলাম “কি আবার রহস্য?”

সুগতা গিয়েছিলো গোপালবাবুর খোঁজে – যদি তাকে একটু পটিয়ে পাটিয়ে আলুভাজা বা পকোড়া বানাতে উদ্বুদ্ধ করা যায় দেখতে। “সে তো এককথায় না বলে দিলো। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম – সে রুটি বেলছে।“

রুটি বেলছে ? এতে আবার কি রহস্য রে বাবা!! বৌদের কল্পনাশক্তি নিয়ে যখন একটা তির্যক মন্তব্য করতে চলেছি, সুগতা ঝাঁঝিয়ে উঠলো

“আঃ !! ব্যাপারটা ভালো করে বোঝ। আমরা বলেছি আমরা রাত ন’টা নাগাদ খাবো। এখন বাজে সোয়া সাতটা। ও এখন থেকে রুটি করে রাখছে কেন?”

পয়েন্ট। লালমোহনবাবুর ভাষায় “হাইলি সাসপিশাস”। শার্লকসাহেব এইরকম সব ব্যাপার থেকে অনেক কিছু বের করে ফেলতেন বটে, আমরা অনেক ভেবেও কিছুই  পেলাম না। শুধু মনটা খচখচ করতে থাকলো।

ঘণ্টাখানেক বাদে একবার রান্নাঘরে দিকে উঁকি মারলাম। দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই,   রান্নাঘরের বাইরে থেকে হুড়কো টানা, ভেতরে একটা মৃদু আলো। হুড়কো খুলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম উনুনে খুব কম আঁচে কিছু একটা চাপানো আছে। বাইরে এসে এদিকে-সেদিকে-ওপরে-নীচে-ডাইনে-বাঁয়ে সব তন্নতন্ন করে খুঁজে বুঝলাম আমাদের গোপালবাবু হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন। বিলকুল গায়েব।

এরপর আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর রান্নাঘরে চক্কর লাগাতে থেকেছি (বাকিরা তাস খেলে চলেছে)। এই করতে করতে যখন সাড়ে ন’টা বেজে গেলো, তখন একটা টর্চ নিয়ে রীতিমত তদন্ত করতে বেরোলাম। গেলো কোথায় লোকটা ?

বাইরে তখনো ঝিরঝির, রাস্তায় ম্লান আলো, পথঘাট একেবারে জনশূন্য। হোটেলের সামনের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে দেখলাম রাস্তার একপাশে একটা বড়ো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আলো জ্বলছে, গান বাজছে আর তার পেছনের ডিকি খোলা। সেখানে জনাকয়েক লোক জটলা পাকিয়ে হই-হুল্লোড় করছে – মনে হলো ড্রাইভার শ্রেণীর লোকজন হবে। সেদিকে এগোতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখলাম তার মধ্যেই একটি রোগামতন লোক টলমল পায়ে আমাদের দিকেই আসছে।

রোগা লোকটা টলমল-কেষ্ট-মুখার্জি সম্পূর্ণ মাতালপায়ে আমার পাশ দিয়ে গিয়ে হোটেলের বাইরের রেলিঙের দরজা খুলে সটান ভেতরে ঢুকে পড়লো। দেখলাম হোটেলের বাইরের বাগানে একটি টয়লেট আছে এবং সেই টয়লেটের বাইরে একটা বেশ পরিচ্ছন্ন বেসিন রয়েছে। কিমআশ্চর্যপরম – সেই বেসিনে একটি গেলাসে আবার  টুথব্রাশ-টুথপেস্ট রাখা রয়েছে। রোগাবাবু সেই বেসিনের সামনে গিয়ে টুথব্রাশ নিয়ে তাতে টুথপেস্ট লাগিয়ে দাঁত মাজতে বসলো।

বাপ-রে-বাপ – সে কি ভীষণ দাঁতমাজা!! চলছে তো চলছেই। আমাদের ছোটবেলায় আমার ছোটমামা আমাদের তিন ভাই-বোনকে দাঁতমাজা শেখাবার চেষ্টা করতো – একেকদিক দেড়-মিনিট করে, তারপর সামনের দাঁত একমিনিট, রোল করে করে। এই লোকটা নির্ঘাত আমার ছোটমামার কাছে দাঁতমাজা শিখেছিলো আর ডিসটিংশন নিয়ে পাস করেছিলো – নইলে মাতাল অবস্থাতেও কেউ এতো মন দিয়ে দাঁত মাজে নাকি! আমি তার মুখে আলো ফেললাম – তাতে তার বোধহয় আরো সুবিধেই হলো – আরো জমিয়ে দাঁতমাজা চললো।

একসময় এই দন্তমর্জন পর্ব শেষ হলো আর এই রোগা-কেষ্টবাবুকে পাকড়াও করলাম। দেখলাম তিনি আমাদের গোপালবাবুকে চেনেন। আমাদের কথা শুনে তিনি এই বেসামাল অবস্থাতেও সিঁড়ি ভেঙে রান্নাঘর ইন্সপেক্ট করতে এলেন। দেখেটেখে বললেন “আমি আসছি” বলে কোথায় যেন গিয়ে একজন স্যাঙ্গাৎকে যোগার করে আনলেন। সেই স্যাঙ্গাৎএরও অবস্থা তেমন সুবিধের বলা চলে না – তিনিও বেশ টলটলায়মান অবস্থাতেই আছেন দেখলাম।

রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এই দুই নাম-না-জানা মদ্যপ ভদ্রলোক টলমল হাতে পরম যত্নে আমাদের রাতের খাবার বেড়ে আমাদের খেতে বসালো। গোপালবাবু রান্নাটা করেই গিয়েছিলেন, কাজেই এঁদের রান্নাটা আর করতে হয় নি। তবে আমাদের খাওয়া শেষ অব্দি এঁরা ছিলো, তারপর বাসন তুলে টেবিল মুছে তারপর গিয়েছিলো।  জানলাম এঁরা আসলে কাজ করেন “তারা হোমস্টে”তে। কিন্তু এইটুকু জায়গা বলে একে অপরকে সাহায্য করাটা এঁরা এদের কর্তব্য বলেই মনে করেন।

আজকের কমপিটিশন-এর যুগে এই পারস্পরিক সহযোগিতাটা কল্পনা করতে কিঞ্চিৎ অসুবিধেই হয়। এঁরা আবার সকালের বেড-টি কখন খেতে চাই জেনে নিয়েছিলেন এবং পরদিন ভোরবেলায় একটি ছোকরা এসে সেটা দিয়েও গিয়েছিলো সময়ের আগেই। একটু বাদে “তারা হোমস্টে”র ওই রোগা-কেষ্ট বাবু এক ভদ্রমহিলাকে বগলদাবা করে নিয়ে এলেন এবং তাঁর সহায়তায় গরম গরম অতি উত্তম আলু-পরোটা আর চা বানিয়ে প্রাতঃরাশ করালেন। গোপালবাবু সকালেও নিখোঁজ, তাই পয়সাকড়ি রোগা-কেষ্ট বাবুকেই দিয়ে এলাম (অবশ্য পেমেন্ট করাই ছিলো, শুধু বিকেলের চা-বিস্কুটের পয়সা)। গোপালবাবু কোথায় খোঁজ করাতে উদাসভাবে বললো “সে বোধহয় কাল রাত্রে আপনাদের জন্যে মুর্গি কিনতে গিয়েছে”।

এইরকম একটি অম্লমধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে মাড গ্রাম ত্যাগ করলাম। বেরোবার আগে এককাপ চা খাবো বলে গরম জলের খোঁজ করতে গিয়েছিলাম (টি-ব্যাগ আর কাপ সঙ্গেই ছিলো), দেখলাম একটি ছেলে রান্নাঘরের সামনে বসে আছে। তার কাছে গরমজল চাওয়াতে সোৎসাহে সে রান্নাঘর খুলে জল গরম করে দিলো। চা বানিয়ে দেবে কিনা, তাও জিগ্যেস করেছিলো – আমরা আর উৎপাত করি নি। যাবার সময় জিগ্যেস করলাম যে সেও “তারা হোমস্টে”র কর্মচারী কিনা – শুনলাম সে নাকি একজন মিস্তিরি – এই হোটেলে সিমেন্টের কাজ করতে এসেছিলো। আজ সকালের বাস পায় নি বলে বসে আছে।

আমরা চললাম কাজা হয়ে হিকিম-কমিক-লাংজার পথে। পেছনে পড়ে রইলো মাড গ্রাম নামক সেই আশ্চর্য যায়গাটা – যেখানে সম্পূর্ণ মাতাল অবস্থাতেও এক  হোটেলের কর্মচারী তার পাশের হোটেলের গেস্টদের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয় আর সিমেন্টের মিস্তিরি অবলীলায় গেস্টদের চা বানিয়ে দেয়।

06 Pin Valley Monastry

পিন ভ্যালী মনাস্ট্রি – এটা দেখেছিলাম পরদিন

না মশাই – এরা কেউ কোন বাড়তি পয়সা নেয় নি। এদের নামও জানা হয় নি। কি হতো জেনে? এরা যে জগতের লোক, আমরা তার থেকে অনেক দুরের জগতে বাস করি।

(চলবে)

————————————————

উত্তরকথনঃ

গোপালবাবু মুর্গি কিনতে সত্যিই রাতের অন্ধকারে ৫০ কিলোমিটার দূরে কাজাতে গিয়েছেন কিনা কে জানে! তাঁর দশমিনিটের মুর্গীটা এযাত্রা বাদ পড়লো।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৫

পঞ্চম পর্বঃ টাবো থেকে ধনকর হয়ে পিন ভ্যালী

পরদিন সকালে সাজো-সাজো রব। আজ লম্বা যাত্রা – টাবো দেখে ধনকর দেখে পিন ভ্যালিতে রাত্রিবাস। মানে সকালে ব্যাগ গোছানো ইত্যাদি। সকালে তাই ব্রেকফাস্টে সাদাসাপটা পুরি-ভাজি-পরোটা-ডিম (বউ পুনরায় তিব্বতী সাম্পা)। কিন্তু তার আগে পূর্বরাত্রের তিব্বতী সায়মাসে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যাক।

তিব্বতী খাবার বললেই আমার মনে পড়ে আমার মামারবাড়ীর পাড়া এলগিন রোডের তিব্বতী দোকানগুলো। আশীর দশকে সম্ভবত কলকাতার শুধু ওইখানেই তিব্বতী খাবার (যা প্রধানত ছিলো মোমো) পাওয়া যেতো। চারটে দোকান ছিলো (আজো তারা আছে) – সুবার্বান হসপিটাল রোডের ওপর একটি গ্যারেজের মধ্যে “হামরো মোমো”, পুরোনো বাড়ির ভিতর “মোমো প্লাজা” আর “অর্কিড”, এবং বড়ো রাস্তা থেকে সরু একটা গলি দিয়ে গিয়ে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় “টিবেটান ডিলাইট”। তখন টিবেটান ডিলাইটের সবচেয়ে হিট আইটেম ছিলো স্টিম পর্ক মোমো, ওসব চিকেন মোমো-টোমোকে আমরা পাত্তাই দিতাম না। স্টিম পর্ক মোমোর সঙ্গে একটা বাটিতে দেওয়া হতো গরম স্যুপ – যে জলে মোমো স্টিম করা হয়েছে, সেটাই – সামান্য কলি পিঁয়াজের টুকরো দিয়ে। টেবিলে ছোট্ট ছোট্ট কৌটোয় থাকতো পাঁচ রকমের সস – সয়া, সবুজ চিলি (কিন্তু চিনে চিলি সসের থেকে একটু আলাদা), লাল লঙ্কার বেদম ঝাল একটা সস, একটা সম্ভবত কাঁচা লংকা- ভিনিগার , শেষেরটা মনে নেই। ওই স্যুপে এইসব সস ছোট্ট ছোট্ট চামচে করে মিশিয়ে নিয়ে খেতে হতো। কোন সস কতটা দিতে হয়, সে নিয়ে প্রচণ্ড বিতর্ক ছিলো – অনেকটা ফুটবলের লাইনআপের মতন – কোন ছকে খাওয়া হবে – ৫-৩-৩-১-১ নাকি ৪-২-২-১-১। যারা হার্ডকোর মোমো খাইয়ে, তারা ওই ৫-৩-৩-১-১ ছকে খেতো – অর্থাৎ দুরকম চিলি সসই তিন চামচ করে। এলেবেলেরা ৪-২-২-১-১। মনে আছে একবার এক বন্ধু সেখানে টম্যাটো সস চাওয়ায় ওয়েটার তার দিকে বিশ্রীভাবে তাকিয়েছিলো। বেশী খিদে থাকলে এর পর ১/২ থুপকা – অর্থাৎ নুডলস আর ভাসমান পর্ক এবং কিছু সবজী দেওয়া একটা স্যুপ। তাতে কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য ছকে সস মেশাতে হতো – মোমোর ছকে থুপকা খেলে তাকে বেজায় হ্যাটা করা হতো। দাম ছিলো অবিশ্বাস্য রকম কম – স্কুলের পকেটমানিতেও এখানে খাওয়া যেত সহজেই।

এই গলির মোমোর দোকান জাতে উঠে গেল ১৯৯০ সালের কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সময় থেকে। সেবছর সিনেমা দেখানো হয়েছিলো নন্দন, নন্দন ২, শিশির মঞ্চ, রবীন্দ্র সদন আর সম্ভবত সরলা মেমোরিয়ালে। সেই বাবদ গুচ্ছের ফিল্ম-বাফরা এলো কলকাতায় – দাড়িওয়ালা ঝোলাধারী ইন্টেলেকচুয়াল সব। তখনো আঁতেলরা সরকারী-বেসরকারী চ্যানেল ধরে টুপাইস কামিয়ে নেবার কালচারটা ঠিক তৈরি করে উঠতে পারে নি কাজেই এরা নেহাতই সিনেমা ভালোবাসা একদল পাগল। এবং ফলত সব ব্যাটা ট্যাঁকখালির জমিদার। দুপুরে এবং রাত্তিরে খাবে কি? অতএব সব ব্যাটা ভিড় জমাতো এই মোমোর দোকানগুলোতে। সেই থেকে এই পাতি মোমোওয়ালাদের নামডাক হয়ে গেল চাদ্দিকে। ব্যাস – এদের দর গেলো বেড়ে, খাবারের দামও গেলো বেড়ে। তারপর তো মোমো জিনিসটা এদিকওদিক ছড়িয়ে পড়লো, সর্বত্রই পাওয়া যায় এখন – ফুচকা বা রোলের মতোই স্ট্রিট-ফুড – তার সেই এক্সক্লুসিভ মেজাজটাই গেছে চলে। বেশী কথা কি – আমাদের গুরগাঁওয়ে বাড়ির পেছনের রাস্তাতে ছোলে-কুলচার দোকানের পাশে অবদি দুটো মোমোর ঠেলাগাড়ি বসে! মুজতবা আলির থেকে প্যারাফ্রেজ করে বলি “ছি ছি বললে যথেষ্ট নয়, তোবা তোবা বলতে হয়।”

যাক গে, এসব “সে আমাদের দিন ছিলো রে ভাই” বলে আপনাদের বিরক্ত করে লাভ নেই। কি খেলাম সেটা বলি।

প্রথম পদঃ থেমথুক। এক প্রকারের স্যুপ। সাধরনত নুডলস দেওয়া থাকে, আমাদেরটাতে কিন্তু ছিলো না। কিছু সবজি দেওয়া ছিলো। একটু লেবু কচলে দিতে স্বাদবৃদ্ধি পেলো। তিব্বতীরা অবিশ্যি লেবু চিপকে খায় কিনা জানা নেই।

দ্বিতীয় পদঃ আলুর ফিং। আলু, পালং শাক এবং গ্লাস নুডলস দিয়ে অতি উপাদেয় একটি খাবার। আপনারা কেউ কি জো নেসবোর হ্যারি হোল সিরিজ পড়েছেন? তাহলে নিশ্চয়ই আপনার মনে পড়বে কাজা সলনেস নামের সেই সুন্দরী পুলিশ ইনস্পেকটরকে, যে হ্যারির জন্যে হংকং-এর বিখ্যাত লি-উয়ানের দোকান থেকে গ্লাস নুডলস আনিয়েছিলো ক্যুরিয়ার করে আনিয়েছিলো সুদূর নরওয়েতে। আমাদের জন্যে কোনো সুন্দরী এরকম কখনো করে নি কেন ভেবে বুকচেরা একটা দীর্ঘশ্বাসও পড়বে। তারপর… যাক গে, বইটা পড়েন নি যখন, বাদ দিন। আগে বাড়া যাক।

তৃতীয় পদঃ শাপটা। তিব্বতী স্টাইলের চিকেন কারী। পিঁয়াজ আর সবুজ লঙ্কা দেওয়া। ঝাল ঝাল। হুল্লাট খেতে।

চতুর্থ পদঃ থিংমো। স্টিম করা বান। অনেকে এটাকে চিনে রুটিও বলে থাকেন। অনেকটা মাথার পাগড়ি-টুপির মতো দেখতে। আলাদা করে এমন কিছু ভালো খেতে নয় তবে শাপটার সঙ্গে জমে ভালো। আলু ফিংএর সঙ্গেও বেশ লাগে।

পঞ্চম পদঃ চিকেন মোমো। বলাই বাহুল্য। বেশ ভালো, তবে ওই টিবেটান ডিলাইটের মতো হয় নি মশাই।

চলুন, খাবার গপ্পো ছেড়ে এবার মনাস্ট্রির দিকে নজর দেওয়া যাক। পয়লা মনাস্ট্রি হলো গিয়ে টাবো।

টাবো মনাস্ট্রির ভালো নাম “টাবো চোসখোর মনাস্ট্রি” – “চোসখোর” মানে “একটি বিদ্বান গোষ্ঠী” গোছের কিছু। ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয় এটা। এটা বানিয়ে ছিলেন ইয়েশে-ওদ নামের একজন, তিনি ছিলেন গুয়ে রাজ্যের রাজা। তখন সম্ভবত এই অঞ্চলটি গুয়ে রাজ্যেরই অংশ ছিলো। কিন্নরের দিক দিয়ে যারা আসবেন, তারা গুয়ে মনাস্ট্রি সহজেই দেখে আসতে পারবেন।

এখানে কিঞ্চিৎ সাল-তারিখ নিয়ে গোলমাল আছে। বলা আছে এই গুম্ফা তৈরি করেছিলেন রিনচেন জাংপো, গুয়ের রাজার হয়ে। এই রিনচেন জাংপোই কি সেই রাজা, যিনি অতীশ দীপঙ্করকে তিব্বতে আনিয়েছিলেন? তাই যদি হয়, তবে তো সে ঘটনা ৫০ বছর পরের, কারণ অতীশ দিপঙ্কর তিব্বতে এসেছিলেন ১০৪০ বা ১০৪২ সালে। এর একমাত্র সন্তোষজনক ব্যাখ্যা হচ্ছে ইয়েশে-ওর নাতি এই গুম্ফাটি মেরামত (প্রায় পুনর্নির্মাণ) করেছিলেন এটি নির্মাণের ৪৬ বছর বাদে। সম্ভবত তিনিই রিনচেন জাংপোকে এই কাজটি দিয়েছিলেন। এইটে ধরে নিলে অঙ্কটা বেশ নিখুঁত মিলে যাচ্ছে।

মরুক গে ওসব অঙ্ক আর ইতিহাসের টাইমলাইন – আমরা একটু ঘুরে দেখে নি। এটি আদতে একটি মাড মনাস্ট্রি – মাটির তৈরি। না মশাই – “মাটি দিয়ে বুঁদির মতো নকল কেল্লা পাতি” নয় – মাটি এবং কাঠ দিয়ে তৈরি আসল গুম্ফা এটি। এইভাবেই কালের সঙ্গে যুদ্ধ করে এই মনাস্ট্রিটির অবস্থা এখন সঙ্গীন। ১৯৭৫এর ভূমিকম্পে এর বেশ কিছু অংশ ভেঙেও পড়েছিলো – তার পরে এর প্রধান প্রার্থনাগৃহ, যাকে বলে “দু-কাং”, সেটি নতুন করে বানানো হয় ১৯৮৩তে। সেখানেই দালাই লামা দুবার “কালচক্র” প্রক্রিয়া করেছিলেন। কালচক্র কি জিনিস জিগ্যেস করবেন না – সেটা এই তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্মের অতি জটিল একটি অঙ্গ। বিশদ জানতে হলে একটু অন্তর্জাল ঘাঁটুন মশাই!

05 Tabo Monastry

দু-কাং – যেটা নতুন তৈরি হয় ১৯৮৩তে

05 Tabo - Mud Monastry

মাড মনাস্ট্রি – মাটির তৈরি

টাবো মনাস্ট্রির প্রধান আকর্ষণ হলো এর থাঙ্কা-ফ্রেসকো-ম্যুরালস এর সংগ্রহ। মূল দু-কাংকে একপাশে রেখে তার ডানদিকে একটু গেলে একটা নিচু দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখতে পাবেন দেয়ালে আশ্চর্য সব চিত্রমালা। এর জন্যেই একে অনেকে “হিমালয়ের অজন্তা” বলে থাকেন। এক অর্থে এটি অজন্তার থেকেও ভালো কারণ এর চিত্রমালাগুলো, যেগুলো ওই পুরনো মন্দিরের ভিতরে আছে, সেগুলোর অবস্থা অজন্তার থেকে অনেক ভালো। ছবি তোলা নিষিদ্ধ – তাছাড়া ভিতরে আলো কেবলমাত্র একটি স্কাইলাইট দিয়ে আসে। কাজেই দেখতে হলে এখানে যেতে হবে কর্তা। তবে বাইরের কয়েকটা ছবি দিলাম।

05 Tabo Monastry Golden

গোল্ডেন টেম্পল – টাবোতে

এখান থেকে আমরা একটু তাড়াহুড়ো করেই বেরোলাম – কারণ আসার রাস্তায় গুড়িগুড়ি করে মাটি আর পাথর পড়ছিলো পাহাড়ের গা বেয়ে। তার ওপরে আকাশে কালো মেঘ। বৃষ্টি নামলে মোক্ষম ঝামেলা হবে আশঙ্কা করে সোনু আমাদের নিয়ে গেলো টাবো থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে ধনকর গুম্ফায়। যা ছিলো সপ্তদশ শতাব্দীতে স্পিতির রাজধানী।

ধনকর গুম্ফা নিয়ে নানান কিংবদন্তী আছে। এই ধনকর মনাস্ট্রি নাকি একটি পদ্মফুলের মতো – এর চারপাশে আটটি পর্বত আসলে আটটি প্রাচীন স্থানীয় দেবতার প্রতীক। এই অঞ্চলের অনেকে বিশ্বাস করেন এটি এই অঞ্চলের সবথেকে পুরোনো গুম্ফা – টাবোর থেকেও পুরোনো। প্রমাণস্বরূপ তাঁরা বলেন যে প্রাচীন পুঁথিতে নাকি আছে যে ইয়েশে-ওদ (মানে যিনি টাবো মনাস্ট্রি তৈরি করেছিলেন) এটির মেরামত করিয়েছিলেন (অর্থাৎ তার আগে থেকেই ছিলো)। কেউ কেউ এও বলেন যে এখানে এক দানবের অধিষ্ঠান ছিলো; সেই দানবকে সংহার করেই নাকি এই বর্তমান ধনকর মনাস্ট্রি তৈরি হয়েছে গেলুগ সম্প্রদায়ের হাতে – সম্ভবত সেই রিনচেন জাংপোর হাতেই (কোন রিনচেন জাংপো মনে আছে তো ? যিনি টাবো মনাস্ট্রির পুনর্নির্মাণ করেছিলেন আর অতীশ দীপঙ্করকে এনেছিলেন তিব্বতে, তিনিই। আরে মশাই, এই তো বললুম একটু আগে!!)

05 Dhankar

ধনকর গ্রাম ও মনাস্ট্রি

ধনকর মনাস্ট্রির গঠন কিছুটা কিই মনাস্ট্রিকে মনে করায় – ওই রকম দুর্গের মতোর বহুতল ধাঁচে তৈরি। পাহাড়ের গায়ে এই মনাস্ট্রিটি আছে, আর সেই পাহাড়ের গায়ে গায়েই নিচের দিকেই ধনকর গ্রাম। গুম্ফাটির ভেতরেও রয়েছে অপূর্বসুন্দর কিছু থাঙ্কা। আর আছে প্রমাণ সাইজের একটি রুপোর মূর্তি – বুদ্ধের বজ্রধারা রূপে। এই বজ্রধারা রূপের বুদ্ধই নাকি তিব্বতে তান্ত্রিক বৌদ্ধ রীতির জনক। এখানে অবশ্য ছবি তোলাতে বাধা নেই – বা বলা ভালো বাধা দেবার জন্যে কেউ নেই – চারদিক বিলকুল খালি। মিত্রজায়া সুগতার মতে অবশ্য এর মধ্য কোন “তুকতাক” করা আছে, কারণ তার বা তার ছেলের ছবি নাকি কিছুতেই তোলা যাচ্ছিলো না গুম্ফার ভিতরে। কে জানে বাবা, আমি যেগুলো তুললাম, সেগুলো তো দিব্বি উঠলো! তবে আমি যে ঘোর পুণ্যাত্মা ব্যক্তি, সে বিষয়ে আমার বরাবরই বিশ্বাস ছিলোই; সেই পুণ্যফলে উঠেছে কিনা বলতে পারি না। তবে বজ্রধারা বুদ্ধের ছবি তুলতে পারি নি – তিনি অজস্র স্কার্ফ এবং ফুলের পাহাড়ে চাপা পড়ে ছিলেন বলে। তাছাড়া আমার পুণ্যের জোর অতটা কিনা তাও জানা ছিলো না – রিস্ক নিয়ে লাভ নেই।

05 Dhankar Buddha

ধনকর মনাস্ট্রির মধ্যে – পিছনে বজ্রায়ন বুদ্ধ

05 Dhankar 2

ধনকর মনাস্ট্রির ভিতরে

06 Dhankar Thanka 2

ধনকর মনাস্ট্রির দেওয়ালে ঝোলানো থাঙ্কা

05 Enroute Pin Valley

পিন ভ্যালীর পথে

 

ধনকর ছেড়ে চললাম পিন ভ্যালীর দিকে। পিন ভ্যালী আসলে একটি ন্যাশনাল পার্ক, সেখানে নাকি সাইবেরিয়ান আইবেক্স আর স্নো লেপার্ড দেখতে পাওয়া যায়। আমরা মশাই ওসব দেখতে পাই নি, তবে এই রাস্তায় সবুজের বাহার আছে, তা নিশ্চিত। একসময় আমাদের স্পিতি নদীর সঙ্গে পিন নদীর দেখা হলো, তখন স্পিতিদেবীকে টা-টা বলে পিনের সঙ্গে চললুম। তারপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যের আগে পৌঁছলাম পিন ভ্যালীর মাড গ্রামে – হোটেল পিন-পার্বতী গেস্ট হাউসে। তারপর সেই রাত্রে …

উঁহুহুহু – সেকথা পরের পর্বে! আজ এই অব্দি।

05 Pin and Spiti

পিন-স্পিতির সঙ্গম

উত্তরকথন

————————————————–

টাবো মনাস্ট্রির মধ্যে নাকি থাকার ব্যবস্থা আছে ! খোঁজ করে দেখতে পারেন।

টাবোর মনাস্ট্রিতে নাকি একটি কালভৈরব এবং গনেশের মূর্তি আছে। অবশ্যই তারা তিব্বতী তন্ত্রের অংশ হয়ে বেনামে বিরাজ করছেন। চমকে গেলেন নাকি? আরে কাঠমান্ডুতে দরবার স্কোয়ারে যে একটি তিব্বতী কালভৈরবের মন্দির আছে, সেটা দেখে এই প্রশ্ন মনে জাগে নি? অবশ্য নেপালের ভূমিকম্পের পর সে আর আছে কিনা সন্দেহ।

ধনকর মনাস্ট্রির কাছেই মনাস্ট্রির গেস্টহাউস। সেখানেই আমরা লাঞ্চ সেরেছিলাম। খাবার পরে বাইরে বেরিয়ে দেখেছিলাম একদল বাচ্চা লামারা একটা মাটির ঢিবি নিয়ে খেলছে। সেটাই তাদের কেল্লা-গুহা-খেলনাবাটি। ওদের সঙ্গে খেলতে বড্ডো ইচ্ছে করছিলো – কিন্তু এই সরল খেলাটার নিয়মগুলো বহুদিন আগে ভুলে গেছি।

পিন ভ্যালীর মাড গ্রামটি কিন্তু একটু একটেরে মতন জায়গা। অর্থাৎ সন্ধ্যার পরে বিশেষ কিছু করবার থাকে না। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক ঘরে বসে উপভোগ করার মতো নয় – যদি যাকে বলে “হলিডে ওয়েদার” থাকে, তবে সকালে উঠে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগবে। কাজেই অন্তত দুটি পরিবার হলেই সুবিধে – অন্তত বাদলা দিনে ২৯ খেলতে পারবেন।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৪

চতুর্থ পর্বঃ কি-কিব্বের আর কিঞ্চিৎ পাতিহাঁস

আগেরদিন বিকেলে আমাদেরকে হোটেলে নামাবার সময়ই আমাদের রথচালক সোনু বলে দিয়েছিলো “কাল সকালে তাড়াহুড়ো করবেন না। বিশ্রাম নেবেন ঠিকমতো। আমরা বেরোবো বেলা দশটায় – একটু দেরী হলেও ক্ষতি নেই।“ আবার সন্ধ্যেবেলা “ইনক্রেডিবল স্পিতি”র কাজা অফিসের “পূজা” এসে খোঁজ নিয়ে গেলো আমরা ঠিকমতো পৌঁছেছি কিনা আর পইপই করে বলে গেলো “বিশ্রাম নিন। অতিরিক্ত স্ট্রেন দেবেন না নিজের ওপর।“

বিশ্রাম নেবার এতো পেড়াপেড়ি যখন, একটু নাহয় গড়িয়েই নেওয়া যাক। পরদিন সকালবেলায় তাই বেশ রয়েবসে তৈরি হলাম আমরা। তারপর একসময় লাঞ্চরুমে গমন – ব্রেকফাস্ট।

আমাদের হোটেল শাক্য এবোড এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো হোটেল। ঘরগুলো খুব বড়ো নয়, তবে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এদের লাঞ্চরুমটা দেখবার মতো। বিশাল হলঘর, তার আধখানা জুড়ে সোফা আর তার সামনের টেবিলে তিব্বতী সংস্কৃতি – ইতিহাস – ধর্ম সংক্রান্ত অজস্র বই ছড়ানো। মানে সকালে আর রাতে খাওয়া শুধু নয়, এটা একটা আড্ডা দেবার জায়গাও বটে। তার ওপর এই হোটেলের এই একটিমাত্র ঘরে অন্তর্জালের আগমন ঘটে, এদের ওয়াই-ফাই এর হাত ধরে। কাজেই যারা বইটই পছন্দ করে না, তারাও এখানে খাবার কিছুটা আগে থেকেই এসে বসে পড়েন। বেড়াতে এসে দিনান্তে ফেবুতে দুটি সেলফি পোস্ট না করলে যে ভদ্রসমাজে মুখ দেখানো যাবে না! হোটেলের ওয়েটারদেরও সুবিধে, একটু খাবার দিতে দেরী হলেও কেউ কিচ্ছুটি মনে করে না।

ব্রেকফাস্টে দেখলাম এলাহি আয়োজন। যাকে বলে “স্পয়েল্ট ফর চয়েসেজ ” আর কি। আলু পরোটা-পুরি ভাজি-মসালা অমলেটের পাশেই বিরাজ করছেন নিউটেলা প্যানকেক বা স্প্যানিশ অমলেটের মতো কেতাওয়ালা সব সুখাদ্য। আছে পরিজ-ম্যুসলি-কর্ণফ্লেক্সরা, সংগে ফলমূল। আমরা ওই সানি সাইড আপ-পরোটা-অমলেট এসব নিলাম। গিন্নি স্বাস্থ্যসচেতন, তাই তিনি নিলেন তিব্বতী “সাম্পা” – বার্লির আটা শুকনো কড়াইয়ে ভাজা, তাতে একটু মধু আর দুধ দেওয়া। জব্বর খেতে বস্তুটা। পরে শুনলাম এটা নাকি আবার তিব্বতী চা, মাখন আর নুন দিয়েও খাওয়া যায় – আমাদের নোনতা সুজির মতো কিছু একটা হবে আর কি। এই দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে বলে দিলুম যে ডিনারে আমাদের যেন বিশুদ্ধ তিব্বতী খানা দেওয়া হয়।

তা – আপনাদের খাওয়াদাওয়া হয়েছে তো ? একদম চাঙ্গা ? তবে এককাপ চা খেতে খেতে একটু শুনে নিন তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস। ভয় নেই, ইতিহাসে পাতিহাঁস করবো না, সাঁটে সারবো। বেশী বলতে গেলে তো আমার জ্ঞানভাণ্ডারের তালপুকুরে যে আসলে ঘটি ডোবে না, সেটা সবাই ধরে ফেলবে যে !!

তিব্বত জায়গাটা একরাশ ছোট গোষ্ঠপতির হাতে ছিলো। সপ্তম শতাব্দীতে সংতসেন গাম্পো নামের এক রাজা তিব্বতকে একটি রাজত্ব হিসেবে দাঁড় করান। অন্যান্য ছোট রাজা বা গোষ্ঠপতিদের জয় করে তাদের রাজত্ব নিজের রাজত্বে জুড়ে নেন তিনি। এবং জয় করেন তিব্বতের জাংজুং নামক অতি প্রাচীন এলাকা –তিব্বতী সংস্কৃতি-ধর্ম-ইতিহাসের আঁতুড়ঘর আর কি। এই জাংজুং এলাকা হলো আজকের লাদাখ-লাহুল-স্পিতি-গিলগিট-বালটিস্থান – এই অঞ্চল। আজো এই অঞ্চলে ইতিহাসের অনেক হারানো পৃষ্ঠা, মানব সভ্যতার মিসিং লিঙ্ক লুকিয়ে আছে।

যাই হোক, এই সংতসেন গাম্পো রাজ্য বিস্তার করার সঙ্গে সঙ্গে আইন আদালত তৈরি করলেন, রাজ্য শাসনের নিয়ম কানুন তৈরি করলেন আর তিব্বতী ভাষাটির একটি লিখিত রূপ সৃষ্টি করলেন। মানে একেবারে দেশ জুড়ে সুশাসনের সুবাতাস বইয়ে দিলেন আর কি। তাঁর বদান্যতায় বেশ কিছু বৌদ্ধ সুত্র তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হয়। গুটিগুটি পায়ে তিব্বত রাজ্যে বৌদ্ধ ধর্ম পা রাখলো।

সংতসেন গাম্পোর রাজত্বকালের প্রায় দেড়শো বছর বাদে আরেক জবরদস্ত রাজা এলেন – নাম – ট্রাইসঙ দেৎসেন (যাই বলুন, তিব্বতীদের নামগুলো ঠিক আমাদের কুসুমকোমল বাংলাভাষার জন্যে তৈরি হয় নি। কি ভিরকুটে নাম রে বাপু!)। দেৎসেন ভারতবর্ষ থেকে নানান বৌদ্ধ পণ্ডিতদের নিয়ে এলেন তিব্বতে; তাদের প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে একসময় তিব্বতের রাষ্ট্রধর্ম হয়ে উঠলো।

দেৎসেন ভারতবর্ষ থেকে যে সব বৌদ্ধ পণ্ডিতদের তিব্বতে এনেছিলেন, তার মধ্যে সবচেয়ে নামজাদা হলেন পদ্মসম্ভবা – যাকে তিব্বতীরা রিমপো-চে নামেও ডেকে থাকেন। ইনি তিব্বতের প্রাচীনতম বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পত্তন করেন, যার নাম “নিংমা”। সাময়ে নামের একটা জায়গায় ইনিই প্রথম তিব্বতী গুম্ফাও তৈরি করেন।

এই পদ্মসম্ভবা বা রিমপো-চে কে নিয়ে কিংবদন্তীর ছড়াছড়ি। কারুর কারুর মতে ইনি স্বয়ং “দ্বিতীয় বুদ্ধ”, কারুর কারুর মতে ইনিই অমিতাভ – বুদ্ধের এক রূপ। তাঁকে নিয়ে এতো গল্পকথা রয়েছে যে সত্য আর কিংবদন্তীকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। তবে যা পড়েছি, তাতে এই অব্দি বলা যায় যে পদ্মসম্ভবা সত্যিই তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের একটি শাখাকে নিয়ে এসেছিলেন। প্রধানত মহায়ন বৌদ্ধ রীতি হলেও এই শাখাটিতে মিশে আছে অনেক তান্ত্রিক আচার-বিচার মেশানো বৌদ্ধ রীতির নাম হলো “বজ্রায়ন”। এই তান্ত্রিক-ঘেঁষা বৌদ্ধ রীতিটা তিব্বতীদের বেশ মনে ধরলো, কারণ এর সঙ্গে তাদের প্রাচীন ধর্ম “বন” এর বেশ মিল আছে। পদ্মসম্ভবা বা রিংপো-চে তাঁর ব্যক্তিত্বের জোরে বৌদ্ধধর্মকে জনপ্রিয় করে তুললেন এবং একসময় “বন” ধর্মটিকে সম্পূর্ণই ধামাচাপা দিয়ে দিলেন। প্রমাণ করে দিলেন যে “বন” এক অতি বর্বর ধর্মচিন্তা এবং এর কোন স্থান নেই আমাদের সমাজে। “বন” ধর্মের প্রবক্তারা হয় বজ্রায়ন-ঘেঁষা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন, অথবা জনসমাজের থেকে দূরে চলে গেলেন।

নবম শতাব্দীতে তিব্বতের রাজত্ব ভেঙে পড়ে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মও। জানাই ছিলো – কবি তো কবেই বলে গেছেন “একদিন নেবে তারে চিনে।“ – তা সেই চিনেরা এসে তিব্বতটা কব্জা করে বসলো। এই ভাবে আবার প্রায় দেড়শো বছর কেটে যাবার পর এর পুনরুত্থান ঘটে – এক অর্থে একে তিব্বতী রেনেসাঁ বলা যায়। এই রেনেসাঁ আসে রিনচেন জামবো বলে এক রাজার আমলে। এই রাজা রিনচেন জামবো আবার বেশ ধার্মিক ছিলেন – অজস্র গুম্ফা তৈরী করেন, ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে আসেন বৌদ্ধ পণ্ডিতদের। তার মধ্যে যার নাম আমরা সবাই জানি, তিনি হলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান – বিক্রমশিলা বিদ্যালয়ের প্রখর বিদ্বান – যিনি তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্মে পাল-যুগের মহায়ন বৌদ্ধ ধর্মের ছোঁয়া এনে দিলেন। তৈরি হলো কদম সম্প্রদায়। পরে এই বিক্রমশিলা “ঘরানা”র বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতেই থেকে আরো তিনটি সম্প্রদায় তৈরি হয় – তাদের নাম কাগ্য, শাক্য এবং গেলুগ। কদম সম্প্রদায় এদেরই একটির সঙ্গে মিশে যায় (কোনটা জিজ্ঞ্যেস করবেন না – এদের মধ্যে বেজায় ঝগড়া!)। কাজেই এখন চারটি বৌদ্ধ সঙ্ঘ আছে – নিংমা, কাগ্য, শাক্য এবং গেলুগ।

ও মশাই – শুয়ে পড়লেন নাকি ? উঠুন, উঠুন – বেরোতে হবে তো !! আমরা যাচ্ছি “কিই” মনাস্ট্রি দেখতে যাচ্ছি – কাজার খুব কাছে। এটা তৈরি হয়েছিলো এগারো শতাব্দীতে, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের এক ছাত্রের হাতে – কদম সম্প্রদায়ের গুম্ফা হিসেবে। তখন এটি ছিলো রামরিকে – কাজা পৌঁছোবার আগে যে মোটামুটি বড়ো গ্রামটা পেলাম, সেইখানে। যেটা চোদ্দশো শতাব্দীতে শাক্য সঙ্ঘের সাধুরা এটি তছনছ করে এই নামের নতুন একটি গুম্ফাটি তাঁর বর্তমান জায়গায় বানায়। তারপর আবার গেলুগ সঙ্ঘের সাধুরা সতেরোশো শতাব্দীতে শাক্যদের হটিয়ে দিয়ে নিজেরা এটিকে বেশ আপন করে নেয়। সেই থেকে এটা গেলুগ সঙ্ঘের দায়িত্বে। একুশ শতকের শুরুতে বর্তমান দালাই লামা এসে করেন।

কিই মনাস্ট্রিটা দেখে প্রথমটায় এটাকে একটা দুর্গ বলে ভুল হবে। ইয়া উঁচু প্রাচীর, ঢালু রাস্তা ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠেছে – দেখলে মনে হয় ঘোড়া বা হাতী যাতায়তের জন্য কিম্বা নিদেনপক্ষে ছোট কামান নিয়ে ওঠা নামার জন্যে। সেরকম কিছু কোনদিন হয়েছে বলে তো শুনি নি (যদিও এই কিই মনাস্ট্রি সতেরো শতকের পরেও বারতিনেক বিজিত ও লুণ্ঠিত হয়েছে)। চরাই ভেঙে উঠে, মনাস্ট্রির গেট পেরোলেই চোখে পড়ে লম্বা বারান্দা আর সারিসারি জপস্তম্ভ। কিই মনাস্ট্রির তিনটি তলা – তার মধ্যে একটি তলার দেয়ালে রয়েছে অসাধারণ সব ম্যুরালস আর থানকা। দুঃখের বিষয় ছবি তোলা একেবারেই বারণ এবং ভেতরে আলোও একটু কম।

04 Key Monastry

এই তিনতলা মণাস্ট্রিকে বলে পাসাদা স্টাইল – এটা এসেছে চিনেদের থেকে। এর দ্বিতলে আছে একটি চাতাল, যেখানে একটি তাম্রপাত্রে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে বহুবছর ধরে – যে সব তিব্বতীরা চিনে সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে মারা যায়, তার স্মৃতিতে। মনাস্ট্রির ছাত থেকে স্পিতি নদীর উপত্যকাটা দেখায় ভারী সুন্দর – দিগন্তঅবদি রুক্ষ পাহাড় আর তার মাঝখানে বয়ে চলা একচিলতে শীর্ণ স্পিতি নদী।

04 From Kye Monastry.jpg

04 Kye Monastry Flame

কিই মনাস্ট্রি লামাদের একটি বড়োসড়ো বিদ্যালয়ও বটে – প্রায় তিনশো লামা পড়ে এখানে। এই মনাস্ট্রির প্রধান লামার নাম রিনচেন নামগ্যাল, বয়েস ষোল ! ইনি নাকি কাচেন দুগ্যাল নামক এক অতি প্রাচীন সুপণ্ডিত লামার পুনর্জন্ম। সার্টিফায়েড বাই নান আদার দ্যান হিজ হোলিনেস – দালাই লামা, ইন দ্য ইয়ার ২০১১। তখন আমাদের রিনচেনবাবুর বয়েস দশ। কি বুঝলেন? মনে পড়লো জিগমে ওয়াংচুক নামের এক আট বছরের বালককে ২০১৩ সালে গালপা লোরেপা লামার পুনর্জন্ম বলে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিলো । শুধু তাই নয়, পণ্ডিতরা দিব্যচক্ষে দেখে ফেলেছেন যে জিগমে ওয়াংচুক নাকি আবার কালে কালে হয়ে উঠবেন পরবর্তী রিমপো চে। রিমপো চে কে, সেটা আশা করি এর মধ্যেই ভুলে মেরে দেন নি। মানে এই লামাদের মধ্যে চাইল্ড প্রটিজিদের ছড়াছড়ি আর কি।

কিই মনাস্ট্রি থেকে আমরা গেলাম ১৪০০০ ফুট উচ্চতায় একটা ছোট্ট গ্রাম কিব্বের। এই বর্ণহীন খয়েরির মাঝখানে একটুকরো সবুজ। শুনলাম এখানে অল্প চাষবাস হয় – মূলত কড়াইশুঁটি আর বার্লি (যা আজ সকালে খেলুম আর কি)। গ্রামের বাসিন্দার সংখ্যা তিনশোর একটু বেশী – সোনু সগর্বে বললো “বেশ বড়ো গ্রাম।“

কিব্বের এবং এই স্পিতির এইরকম আরো অনেক গ্রামেই আলাদা করে দেখবার কিছু নেই। করবার মতোও কিছু নেই। শুধু এখানকার নির্জনটা আর ভিজে মেঘ গায়ে মেখে একা দাঁড়িয়ে থাকা হয়তো হালকা ঝিরঝির এসে ভিজিয়ে দেবে আপনাকে, তারপরেই শনশনে হাওয়া ছোবল মেরে যাবে অকস্মাৎ । তখন চায়ের খোঁজ করতে আশেপাশের ছোট্ট রেস্তোরাঁর ভিতরে ছুটবেন তড়িঘড়ি – সাহস করে তিব্বতী মাখন দেওয়া নোনতা চাও হয়তো খেয়ে নেবেন। খেতে খেতে দেখবেন জানলার কাঁচে কয়েকফোঁটা চোখের জল এসে পড়লো, তারপর মিলিয়ে গেল মন-খারাপের কুয়াশায়।

বেলা পড়ে এলো। চলুন, বাড়ির দিকে ফেরা যাক। রাতে আবার তিব্বতী খানা – তবে সে গল্প আজ নয়, কালকের জন্যে তোলা থাক। আপাতত – আলবিদা।

(চলবে)

————–

উত্তরকথন

কি আর কিব্বের ঘুরতে বেশী সময় লাগে না। যদি তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন, তবে বিকেলে রামরিকের দিকে লম্বা হাঁটা লাগাতে পারেন।

ফেরবার সময় আমাদের সোনুবাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। বাইশ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তায় বৃষ্টিসিক্ত হাওয়ায় হাঁটতে হবে, এই আশঙ্কায় আমাদের শহুরে ফিনফিনে রোম্যানটিসিজম একদম ছেঁড়া ঘুড়ির মতো লটকে পড়েছিলো। ভাগ্যিস ব্যাপার বেশীদূর গড়ায় নি, তাই মানে মানে গাড়িতে চড়ে ঘরের ছেলে ঘরে (মানে হোটেলে) ফিরেছিল!

কিই মনাস্ট্রির ছাতে উঠে ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাড়ে বেশ হিহি কাঁপন ধরেছিলো। নামার পথে ওই মনাস্ট্রির লামারা আমাদেরকে ডেকে নিয়ে গেলেন তাদের রান্নাঘরে আর অতি চমৎকার চা খাওয়ালেন। ওই প্রাচীন রান্নাঘর, তাতে আলো কেবল ওপরের স্কাইলাইট দিয়ে, সেখানে বসে গরম গরম চা-টা বড্ডো ভালো লেগেছিলো। ছবি তোলা এখানে বারণ ছিলো না, কিন্তু ওই এক শতাব্দী বা তার চেয়েও পুরোনো পরিবেশ আর ওই লামাদের অনাড়ম্বর সেবার ছবি তুলতে গেলে অন্য জাতের ফটোগ্রাফার হতে হয়।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ৩

তৃতীয় পর্বঃ কুনজুম পেরিয়ে কাজা

দিল্লির ট্র্যাভেল কোম্পানিদের মধ্যে কুনজুম পাস নিয়ে একটা আবেগমিশ্রিত রোম্যান্টিসিজম আছে। দিল্লিতে কুনজুম ক্যাফে নামে একটা অতীব জনপ্রিয় “ট্র্যাভেল ক্যাফে” আছে, তাছাড়া গোটা চারেক কুনজুম নামের ট্যুর-অ্যান্ড-ট্র্যাভেল কোম্পানি আছে। যাই হোক, আসল কুনজুম লা হলো লাহুল আর স্পিতির মধ্যবর্তী ১৫০০০ ফিট উচ্চতার অপূর্ব সুন্দর একটি গিরিপথ। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে যাতায়তের গাড়ি যাবার উপযুক্ত পাকা রাস্তা এই একটিই – অবশ্য যদি ঝুরঝুরে পাথরের কুঁচি আর নুড়ির রাস্তাকে পাকা রাস্তা বলে স্বীকার করেন, তবেই।

কুনজুম লা এর উচ্চতম জায়গায় পৌঁছে দেখতে পাওয়া যায় তিনটি বৌদ্ধ স্থুপ, যার তিব্বতী নাম চোরটেন। চোরটেনের প্রতিটি অংশের একটি করে প্রতীকী অর্থ আছে (সেগুলো আবার স্থানবিশেষে একটু আলাদা; অর্থাৎ তিব্বত, ভূটান বা শ্রীলঙ্কার চোরটেনের চেহারা এবং তার অংশের প্রতীকী ব্যাখ্যায় সামান্য তফাত আছে)। তিব্বতী স্থুপ বা চোরটেনের একদম নিচের যে চৌকো অংশটি, তা হলো পৃথিবীর প্রতীক। তার ওপর যে উল্টোনো ট্র্যাপিজয়েডের মতন অংশ (যেটার ভালো নাম “বুমপা”), সেটা জলের প্রতীক। বুমপার ওপর তেরোটি চুড়ির লম্বা খাম্বাটি (যার নিচের অংশের নাম “হার্মিকা” আর চুড়িগুলির নাম “ভূমি”) হলো অগ্নির প্রতীক। তার ওপরের মুকুটের মতো জিনিসটি (নাম পারাসল) হলো বায়ু আর তারও ওপরে চন্দ্র-সূর্য-রত্ন হলো শূন্য। অর্থাৎ আমাদের ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম পঞ্চভূতের এর তিব্বতী ভার্সন আর কি! আবার চোরটেনকে ধ্যানরত বুদ্ধের রূপ হিসেবেও কল্পনা করা হয়, এবং সেই রূপের সঙ্গে চোরটেনের অংশগুলোর রূপক, অর্থাৎ নিচের চৌকো ধাপ – বুমপা – হার্মিকা – ভূমি – পারাসলের অর্থ পাল্টে গিয়ে হয়ে যায় বৌদ্ধ ধম্মের নানান স্তর – প্রজ্ঞ্যা-শীলা-সমাধি ইত্যাদি। একই স্থাপত্যের দুরকম রূপক কেন তার ব্যাখ্যা অন্তর্জালে পেলাম না । তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলো ওই পঞ্চভূতের সিম্বলিজমটি প্রাক-বৌদ্ধ জমানার তিব্বতী বন-পা ধর্ম থেকে এসেছে, যেটি প্রথমযুগে ছিলো মূলত প্রকৃতির উপাসনা । পরে এই বন-পা এবং বৌদ্ধ ধর্ম মিলেমিশে এখনকার তিব্বতী ধর্মের চেহারা নিয়েছে আর তাই এই চোরটেনে বন-পা এবং বৌদ্ধ, দুরকম প্রতীকই রয়েছে।

তিব্বতী ধর্ম নিয়ে পরে আবার লিখবো – এই অঞ্চলে এতো মনাস্ট্রি ছড়িয়ে আছে যে একটু সেগুলো বলে না দিলে ধরতাই পাবেন না। আপাতত চোরটেন এবং তার সিম্বলিজম নিয়ে অন্তর্জাল থেকে পাওয়া কয়েকটি ছবি জুড়ে দিলাম; এতে একটা ধারণা হবে। আর যদি “গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও” গাইতে চান, তাহলে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করতে হবে মশাই। আমার এই হালকা-ফুলকা দুলকি চালের ভ্রমণআখ্যান কোনো মতেই, যাদবপুরের ভাষায়, “মাদার” হিসেবে কাজ করবে না।

03 Stupa Section Name-4

চরটেন

03 StupaTemplate1web

চরটেন

কুনজুম পাসের তিনটি চোরটেনকে ঘিরে রেখেছে পাঁচ রঙওয়ালা তিব্বতি পতাকা, যা সব পাহাড়ি মনাস্ট্রিতেই কম বেশী দেখা যায়। এই পতাকার নাম দার-ইকগ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো “খাড়াভাবে রাখা কাপড়”। নামটি খুব গভীর অর্থপূর্ণ তা বলা চলে না, তবে এই পতাকাতে যে পাঁচটি রঙ আছে – নীল-সাদা-লাল-সবুজ-হলুদ তা হলো আকাশ-মেঘ-অগ্নি-জল-পৃথিবীর প্রতীক। মানে আবার সেই পঞ্চভূত (বায়ুর বদলে মেঘ আর শূন্যর বদলে আকাশ)। এও ওই বন-পা’র প্রভাব হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ এই পতাকাও বৌদ্ধ ধর্মের আগে থেকেই আছে। শুনলাম বহুপূর্বে এগুলো নাকি যুদ্ধের পতাকা ছিলো, পরে এটি ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এই বিভিন্ন বর্ণের আলাদা প্রতীকী ব্যাখ্যা এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।

03 Kunzum Pass (M)

তাজ্জব ব্যাপার হলো এই পাক্কা তিব্বতী বৌদ্ধ অঞ্চলে, দার-ইকগ-বেষ্টিত তিব্বতি চোরটেনগুলির গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মন্দির, যার নাম কুনজুম মাতার মন্দির। কুনজুম মাতা আসলে দুর্গার এক রূপ – তিনিই নাকি এই কুনজুম পাসের দেখভাল করেন যাতে এখানে কোনো অঘটন না ঘটে। তাই সব ড্রাইভাররাই মাতার স্থলে একবার মাথা না ঠেকিয়ে এগোয় না।

03 kunjum mata

কুনজুম মাতার মন্দিরে আবার নিজের মনস্কামনা পূর্ণ হলো কিনা বোঝবার একদম স্পটচেক সিস্টেম আছে। মন্দিরে প্রণাম করে মনে মনে কিছু কামনা করে যে কোন মুল্যের একটি মুদ্রা মন্দিরের সামনের পাথরে ঠেকাতে হবে। পাথরটি একটি চুম্বকের মতো, আপনার মুদ্রাটি যদি আটকে যায়, তার মানে আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবেই। সত্যি দেখলাম অজস্র মুদ্রা আটকে রয়েছে ওই পাথরে। এই ব্যাপারটা তো জানা ছিলো না, কাজেই আমি দেবীর কাছে কিছু না চেয়ে এমনিই একটা মুদ্রা ঠেকিয়েছিলাম। “কিছু-চাই-না-কিন্তু-কয়েন-ঠেকাবো” এই আবদারে নিশ্চয়ই স্পটচেক সিস্টেমে ডিভাইডেড-বাই-জিরো গোছের কিছু এরর এসে গিয়ে থাকবে, তাই আমার কয়েনটি আটকালো না সেখানে। পাঠকগন, আশা করি খেয়াল করেছেন যে এই দেবীর কাছে মুখফুটে কিছু না চাওয়ার ব্যাপারটাতে আমার সঙ্গে ওই সিমলেপাড়ার নরেণ দত্তের সঙ্গে আশ্চর্য মিল ? কাজেই, বুঝলেন কিনা, আমাকে ল্যাল্যা পাবলিক বলে হ্যাটা করবেন না। হেঃ !!

কুনজুম পেরিয়ে গেলেই আমরা লাহুল ছেড়ে ঢুকে পড়ি স্পিতিতে। কুনজুমে শেষ বারের মতো দেখা যায় গেইফাং পর্বতচূড়া – লাহুলের প্রাচীন আরাধ্য দেবতা গেইফাংএর নামে। গেইফাংএর নাকি একটিই মন্দির আছে, সিসু নামের একটা পুঁচকে গ্রামে। তিন বছরে একবার করে তার মূর্তি নিয়ে যাত্রা হয়, কতকটা জগন্নাথের রথের মতন। সিসু আমাদের রাস্তায় পড়বে না, সেটা কেলংএর দিকে। তাছাড়া ওই মন্দিরে বাইরের লোকেদের যাওয়াটা নাকি লাহুলিদের ঠিক পছন্দ করে না।

কুনজুম পেরিয়েই হঠাৎ পেলাম সবুজ কেয়ারি করা ঘাসের একটা উপত্যকা, সেখানে ইতস্তত কয়েকটি ঘোড়া চরছে। এতক্ষণ রুক্ষ খয়েরি খিটখিটে দেখতে পাহাড়ের পর আচমকা একরাশ সবুজ দেখে চোখের ভারী তৃপ্তি হলো। পাঠক হিসেবে তো আমি একেবারে চার-আনার পাবলিক – পেডিগ্রিওয়ালা সাহিত্যপ্রেমী নই, তাই কোন বিখ্যাত কবিতা-টবিতা আমার মনে পড়ে নি। বরং মনে পড়লো প্রফেসার শঙ্কুর একশৃঙ্গ অভিযান-এর সেই অসামান্য সবুজ কল্পনার ডুংলুং-ডো রাজ্যের বর্ণনা – স্পিতি জায়গাটা প্রাচীন তিব্বত রাজ্যের অংশ বলেই বোধহয়।

03 Valley after Kunzum

স্পিতিতে ঢুকে দেখলাম আমাদের পাশে আর চন্দ্রা নদী নেই। আছে একটি নতুন নদী, যার নাম – ঠিক ধরেছেন – স্পিতি নদী। তবে ক্রমাগত ল্যান্ডস্লাইডে পাথর মাটি পড়ে সে নদী নিতান্ত শীর্ণকায়া, তবুও নদী বটে। তার ধার ধরে যেতে যেতে গিয়ে পড়লাম লোসার-এ। এরপর রামরিখ পেরিয়ে, একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর লোহার পুল পেরিয়ে কাজা। এই রামরিখের একটু আগে রাস্তাটা অনেকটা ভালো হয়ে হয়ে যাওয়ায় কাজার আগে মাজার ব্যথাটা একটু কমে এসেছিলো।

02A Spiti River

কাজার সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গা হলো শাক্য মনাস্ট্রি যার আরেকটা নাম শাক্য তানগুড মনাস্ট্রি। এটির অবস্থান হলো কাজার দ্বিতীয় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা – কাজার পেট্রোলপাম্প (এই অঞ্চলের একমাত্র পেট্রোলপাম্প) – তার ঠিক পাশেই। এই অঞ্চলের মনাস্ট্রি মাত্রেই বেশ রংচঙে, এটা ব্যতিক্রম তো নয়ই – বরঞ্চ রীতিমত রঙ্গিলা। ভেতরে ছবি তুলতে দেয় না (বেশীরভাগ মনাস্ট্রিতেই তাই), যদিও আমি লুকিয়ে লুকিয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম। ভেতরে ঢুকে দেখি কেউ কোত্থাও নেই, তাই উদাসভাবে এদিক ওদিক কারুকার্য দেখার ভান করতে করতে ঘুরছি। একসময় ফাঁকায় ফাঁকায় অতি সন্তর্পণে মোবাইলটা বের করে খুচ করে ছবিটা তুলতে যাচ্ছি, ওমনি দেখি একটা বাচ্চা লামা জুলজুল আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম নির্ঘাত চেল্লা-মেল্লি করে মহা হট্টগণ্ডগোল বাধাবে, তা করলো না – কারণ সেও এই লোকজন না থাকায় ওই গুম্ফার মূল বেদী থেকে একটা রংচঙে ঢাক নামিয়ে সেটাকে বাজাবার পরিকল্পনা করছিলো। দুই অপরাধীর এই অকস্মাৎ শুভদৃষ্টির ফলবশত ছোকরা ঢাকটা আবার বেদীতে তুলে রেখে উদাসভাবে কোথায় যেন চলে গেল আর আমার হাতটা বেমক্কা নড়ে গিয়ে ছবিটা খুব বাজে উঠলো। তা সত্ত্বেও ছবিটা দিয়ে দিলাম – এইটে বোঝাবার জন্যে যে পাপের ফল ভালো হয় না।

03 Inside Sakya Monastry03 Sakya Monastry corridor

শাক্য মনাস্ট্রির সামনেই আছে একসার চোরটেন – যে চোরটেন হলো – আচ্ছা, আচ্ছা – চোরটেন নিয়ে আর একটি কথাও বলবো না। অতো রেগে যাবার কি আছে মশাই? আচ্ছা শাক্য মানে কি জানেন তো ? প্রাচীন ভারতের মোটামুটি খৃষ্টপূর্ব দশম থেকে পঞ্চম শতাব্দী – এই সময় এরা নেপাল আর ভারতের একটা অংশে বাস করতো। এদের নিজস্ব রাজত্ব ছিলো – তবে সেটাকে অভিজাত-তন্ত্র বললেই চলে। সেনানায়করা এবং রাজ্যের প্রধান কিছু লোকে মিলে আলোচনা করে তাদের শাসক স্থির করতো। এই গোষ্ঠীর রাজধানী তথা প্রধান শহর ছিলো কপিলাবস্তু এবং এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন – বুঝে ফেলেছেন নিশ্চয়ই – শাক্যসিংহ অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধ।

03 Chortens at Kaza

কাজাতে আমরা তিন রাত্তির ছিলাম। যে হোটেলে ছিলাম, সেটা এই শাক্য মনাস্ট্রির পাশেই, তার নাম – যা ভেবেছেন তাই – শাক্য এবোড। এখান থেকেই আমরা গিয়েছিলাম আশেপাশের ছোট্ট ছোট্ট গ্রামগুলোতে – কী-কিব্বের-লাংজা-হিকিম-কমিক, এইগুলো। তবে সে হলো পরের পর্বের গল্প।

03 Kaza Market

এখন আমরা কাজার বড়ো রাস্তা ছেড়ে নিচে নেমে নদী পেরিয়ে যাবো ওপারে। অর্থাৎ কাজা খাস (পুরনো কাজা) ছেড়ে কাজা সোমা (নতুন কাজা)। যেখানে বাজার-হাট রয়েছে। সেখান থেকে কিনবো একটু দারচিনি, পাতি লেবু আর একবোতল “বৃদ্ধ সন্ন্যাসী” – মোহনমেকিন কোম্পানির অমর সৃষ্টি, আমাদের অনেক সুখ-দুঃখের দিনের সাথী।

কবোষ্ণ জলে এগুলো মিশিয়ে এট্টু না খেলে গায়ের ব্যথা মরবে নাকি?

(চলবে)

————————————————

উত্তরকথনঃ

ওল্ড মঙ্কের কথা লিখলাম বটে, কিন্তু এইসব পাহাড়ে মদ না খাওয়াই ভালো। ডি-হাইড্রেশন হয়ে মাউনটেন সিকনেস বেড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। আমাদের সহযাত্রীদের একজন, তার নাম বলা বারণ, আরেকজনের প্ররোচনায় (তারও নাম বলা বারণ) ঢকঢক করে একপেগ ওল্ড মঙ্ক মেরে দিয়ে বাকি যাত্রায় কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। কাজেই মন্দার বোসের মতো “স্রেফ হরলিক্স” ।

কাজা সোমার বাজারের পাশে “হিমালায়ান ক্যাফে” বলে একটা ক্যাফে-রেস্তোরাঁ আছে, বেশ নামকরা। আমাদের যাওয়া হয় নি, আপনারা কিন্তু যাবেন অবশ্যই।

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ২

ভোর সাড়ে পাঁচটায় তৈরি হয়ে মাল-পত্র-আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে হুড়ুম-দুড়ুম করে উঠে পড়লাম গাড়িতে।

ব্যাপারটা যেরকম এক লাইনে লিখলাম, তত সহজে হয় নি কিনতু। কারণ আমরা দুটি পরিবার, আর টিপিক্যাল বাঙালীদের মতো মেলাই জিনিস নিয়ে বেরিয়েছি।

সোনু, যে এই যাত্রায় আমাদের ড্রাইভার, সে গাড়ি নিয়ে ভোর পাঁচটা থেকে তৈরি বসে আছে। এই অঞ্চলে সোনু নামটা অনেকটা আমাদের বাংলার “গোপালের মা” অথবা “রামু”র মতন। একসময় অধিকাংশ বাঙালী বাড়ির পুরুষ কাজের লোক মাত্রেই রামু, আর মহিলা কাজের লোক মানেই সে গোপালের মা – তাদের আসল নাম যাই হোক না কেন। এ অঞ্চলেও এতো ড্রাইভারের নাম সোনু যে সন্দেহ হয় যে এটা নাম নয়, একটা পদ বা উপাধি। খোঁজ করলে হয়তো বেরোবে তার আসল নাম পদ্মলোচন কিম্বা বজ্রপাণি !!

আমাদের সোনুর নাম আসলে পদ্মলোচন কিনা, এই গুরুতর খোঁজটা নেওয়া হয়ে ওঠে নি, কারণ গাড়িতে চড়ামাত্র সোনু বিনা-খেজুরেই সটান গাড়ি চালু করে দিয়েছিলো। এইসব অঞ্চলে লম্বা জার্নি করতে হলে যথাসম্ভব ভোরে বেরোতে হয়। তার একটা কারণ ট্র্যাফিক (অনেক রাস্তাই সিঙ্গল লেন, তাই অপেক্ষা করতে হয়), আরো গুরুতর কারণ হলো অনেক রাস্তার ওপর দিয়েই ঝর্নার জল বইতে থাকে। একটু বেলা বাড়লে গ্লেসিয়ারের বরফগলা জল পেয়ে এইসব শীর্ণকায়া জলধারারা বেশ ডাগর-ডগর হয়ে ওঠে এবং বাহনচালকদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যাচ্ছি কাজা – দশ ঘণ্টার পথ, বেশী বই কম নয়। এবং এই রাস্তায় এরকম পথের ওপর বহতি ঝর্ণা কম করে দশটি আছে বলে শুনেছি।

এই যাত্রায় আমি আর অমিত আমাদের পরিবারবর্গ নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছি। অমিতের বউ সুগতাও আমার কলেজের বন্ধু, কাজেই সে শুধু বন্ধুপত্নীই নয়, বন্ধুনিও বটে। আমরা দুজনে কলেজজীবনে নিয়মিত বেড়াতে যেতাম আরো কিছু বন্ধুদের সঙ্গে, আর সেই সব ট্যুরের ব্যবস্থাপনা আমাদের হাতেই থাকতো। এই ব্যাপারে আমাদের খ্যাতি এতোটাই ছিলো যে আমাদেরকে ঠাট্টা করে “দে-চক্রবর্তী ট্রাভেলস” বলা হয়ে থাকতো। এই পুরো যাত্রাতেও দে-চক্রবর্তী ট্রাভেলস সাংগঠনিক দায়িত্বে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছে (এ ব্যাপারে আমাদের বউদের মতামত কিছুটা আলাদা, কিন্তু আমরা ওইধরনের অল্ট-ফাক্টসকে পাত্তা দিই না; আপনারাও দেবেন না একদম)।

সকালে হুড়ো-তাড়ায় চা জোটে নি, তাই ড্রাইভার সাহেব গাড়ি থামালেন “কোঠি” বলে একটা সুন্দর জায়গায়। কোঠি বললেই আপনাদের আবার ঘুঙুরের আওয়াজ, নূপুরের নিক্কন, গহরজানের গজল, কাজল চোখ এসব মনে পড়ে যাবে, কিনতু এ কোঠি সেই কোঠি নয় মশাই। এটা হলো মানালি থেকে রোটাং যাবার পথে শেষ লোকালয়। এখানে কয়েকটা হোটেল আছে, রেস্তোরাঁগুলোও বেশ ঝাঁ-তকতকে – একটা ট্যুরিস্টি পালিশ আছে। মানালির ট্যুরিস্ট ট্যাক্সিরা যে আশেপাশের “পয়েন্ট” দেখতে নিয়ে যায়, এটা তার অন্যতম।

কোঠিতে হাফব্রেকফাস্ট (“বেশী খাবেন না, সামনে রাস্তা খারাপ) খেয়ে এবং তাদের ঝকঝকে বাথরুম ব্যবহার করে আবার বেরিয়ে পড়া গেলো। রাস্তায় পরপর এলো “গোলাবা” (সুন্দর জায়গা, তবে এখানে একটা পুলিশ চেকপোস্ট আছে, তাই লম্বা লাইন পড়ে; মূর্তিমান রসভঙ্গ), “রাহানা ফলস”, সবুজ পাহাড়ে মোড়া “মারহি” আর তারপর “রানী নাল্লা” (যেখানে, মানালির ট্যুরিস্ট গাইডবুক অনুযায়ী, একটি হিমবাহ আছে, তাই সারা বছর বরফ থাকে। আমরা অবশ্য বরফ-টরফ কিছু দেখতে পাই নি, শুধু একটা সরু মতন ঝর্ণা আর তার সামনে গাড়িতে একটি মারুতি ভ্যানে “মোবাইল ম্যাগি সেন্টার” দেখতে পেলাম)। এরপর সটান সোজা ওপরে উঠেই রোটাং পাস – মানালির সমস্ত ট্যুরিস্টরা যেখানে হামলে পড়ে মোক্ষ লাভ করে থাকে। সব পথ এসে মিলে যায় শেষে।

রোটাং পাস পিরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণীর অংশ এবং এই অঞ্চলের প্রাচীনতম পাসগুলির একটি। এই পাস পার করা মানেই আমরা বিপাশা-প্লাবিত কুলু উপত্যকা ত্যাগ ঢুকে পড়লাম চন্দ্রভাগা-স্নাত লাহুল উপত্যকায় এসে পড়লাম। মনু-বশিষ্ঠ-রঘুনাথজিদের এলাকা ছেড়ে বন-বুদ্ধ-লামাদের এলাকা শুরু হলো আর কি।

এই রোটাঙের পরের রাস্তাটার নাম মানালি-লেহ হাইওয়ে – এটা চলে গেছে লাহুল প্রদেশের হেড-কোয়ার্টার কেয়লং হয়ে লাদাখ প্রদেশের হেড-কোয়ার্টার লেহ-তে। কার্গিল যুদ্ধের পর থেকেই এই রাস্তাটি মিলিটারির লোকেদের একটি বিকল্প সড়ক হয়ে ওঠে; প্রচুর মিলিটারি ট্রাক চলে এই রাস্তায়। তাছাড়া লাহুলের সাধরণ লোকেদের কাছেও এই রাস্তাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে ক’মাস এটা খোলা থাকে, সেই সময় লাহুল/স্পিথির লোকেরা তাদের সামান্য যেটুকু চাষের ফসল, সেটুকু নিয়ে আসে কুলুর বাজারে। যে ৮.৮ কিলমিটারের টানেল তৈরি হচ্ছে দেখলাম – যেটা রোটাং পাসকে বাইপাস করে দিয়ে সোজা মানালি-লেহ হাইওয়েতে উঠবে – সেটা হয়ে গেলে এ ব্যাপারে সুবিধে হবে নিশ্চয়ই।

লাদাখের স্থানীয় ভাষায় (ভোটি ভাষায়) রোটাং মানে শবদেহের স্থুপ ! ১৩০০০ ফিটের উচ্চতা, অক্সিজেন-স্বল্পতা, বরফপাত, মৃত্যুর ছায়া – সব মিলিয়ে রোটাং ঘিরে ট্যুরিস্টদের এই আকর্ষণ তৈরি করেছে। আমরা গিয়েছিলাম জুলাই মাসের শেষে, তখন বরফ নেই এবং হামলে পড়া ট্যুরিস্টরাও নেই। দেখতে ভালোই লাগলো, কিনতু প্রথমবার দেখে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম, সেই মুগ্ধতাটা আর খুঁজে পাই নি। একসময় বলা হতো রোটাং নাকি ইরাবতী নদীর উৎস (কেউ কেউ বলতো বিপাশা নদীর উৎস) – এখন তো শুনি এটা নাকি বিলকুল একটা “জুমলা” – একটা টক-ঝাল-মিষ্টি ট্যুরিস্টি গল্প মাত্র।

রোটাং পাসে যাবার এবং রোটাং পেরোবার পরের রাস্তাটা যায় সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে, সেখানে মেঘেরা এসে লুকোচুরি খেলে যায় যখন তখন। এই মেঘ, এই কুয়াশা, এই একটু বৃষ্টি আর পাশে খাদ পেরিয়ে পাশের পাহাড়ের সবুজ, তাকে বেয়ে উঠেছে সরু সুতোর মতো পাকমারা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে এঁকেবেকে চলতে চলতে এসে পৌঁছলাম গ্রাম্পু বলে একটা জায়গায়। এইখান থেকে ডাইনে মোচড় মেরে একটা সরু-ভাঙ্গাচোরা-নেইরাস্তা ধরে আমরা চললাম লাহুলের পথে। মানালি-লেহ হাইওয়েতে চলে গেল – ঠিক ধরেছেন – লেহ-লাদাকের দিকে।

নেইরাস্তা না নেইরাস্তা। একে সরু, একপাশে খাড়া খাদ, আর রাস্তাটা অজস্র ছোট-বড় বোল্ডারে মোড়া, তাতে গাড়ির চারটে চাকা একসঙ্গে মাটিতে প্রায় থাকেই না। আর সারা রাস্তা সে কি মারাত্মক ঝাঁকুনি আর ঝটকা! পেছনের সিটে কিছু মালপত্র রাখা হয়েছিলো – সেগুলো, খাবারের ব্যাগ, ওষুধের (এবং টয়লেট পেপারের) ব্যাগ বাসের মেঝেতে পড়ে প্রথমে গড়াগড়ি, পরে বহতি নদীরে মতো কখনো সামনে, কখনো পেছনে চলে বেড়াচ্ছে। আমরা সকলেই আলাদা আলাদা সীটে বসে সামনের সীটের পেছনের হাতল প্রানপনে চেপে ধরে আছি আর বাসটা তার প্রবল ঝটকায় কখনো আমাদের মেঝেতে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে, কখনো বা গদাম করে বাসের দেয়ালে আছাড় মারছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মন্দ লাগছিলো না – নিজেকে বেশ রাণা প্রতাপ মনে হচ্ছিলো – যেন চেতকের পিঠে চড়ে হলদিঘাটির পাহাড়ি রাস্তা ধরে যুদ্ধে যাচ্ছি। মুখের ভাবটা সেরকমই করে রেখেছিলাম, হাতের মাসলও বেশ ফুলিয়ে রেখে পোজ দিচ্ছিলাম আগাগোড়া । আমার বউ আর বন্ধুনি অবশ্য বিশ্বনিন্দুক, তাদের মতে আমাকে নাকি আসলে লালমোহনবাবুর মতো দেখাচ্ছিলো। আমি অবশ্য ওসব একদম গায়ে মাখি না – কারুর যদি সাধরণ কল্পনাশক্তিই না থাকে তো আমি আর কি করতে পারি।

এদিকে বাইরের দৃশ্যাবলী বদলে গিয়েছে। পাহাড়ের সবুজ দাড়ি কেউ শক্ত ব্লেডে অযত্নে, এবড়ো-খেবড়ো ভাবে কামিয়ে দিয়েছে – বাইরের পাহাড় তাই রুক্ষ ও কঠোর। ছাই আর খয়েরি রঙের পাহাড়ের প্রকৃতিও বেশ অদ্ভুত – কেমন যেন পাথরগুলো গুঁড়ো হয়ে পাহাড় বানিয়েছে মনে হয়। একটু বাদে কোথা থেকে চন্দ্রা নদী এসে আমাদের পাশে পাশে চলতে লাগলো। এই চন্দ্রা নদী হলো চন্দ্রভাগার “চন্দ্র”; এর সঙ্গে “ভাগা”-র দেখা হয় কেয়লংএর কাছে তান্ডি বলে একটা জায়গায়, যেটা আমাদের যাবার রাস্তায় পড়বে না। চন্দ্রভাগার মতো মিষ্টি নাম কোন বেরসিকের হাতে পড়ে চেনাব হয়ে গেছে – যাকে বলে ঘোর রসভঙ্গ।

 

02 Lahul (2)
02 Lahul
এভাবে নাচতে নাচতে, ঝটকা খেতে খেতে, রাণা প্রতাপ হতে হতে পৌঁছে গেলাম ছত্রু বলে একটা জায়গায়। ছোট্ট জায়গা, চন্দ্রা নদীর কুলে, পাশে একটা ভারী মনোরম লোহার ব্রিজ আছে, যার গায়ে অজস্র পতাকা লাগানো – এখানকার তিব্বতি রীতি অনুযায়ী। আর আছে অত্যন্ত জনপ্রিয় চন্দ্রা ধাবা, প্রায় সবাই সেখানে বাকি-আধখানা-ব্রেকফাস্ট সারবার ভিড় করে। খাবারের বৈচিত্র তেমন নয় – আলু পরোটা – ম্যাগি – ওমলেট ইত্যাদি কিন্তু প্রত্যেকটাই অত্যন্ত সুস্বাদু। খাওয়াটা বেশীর দিকেই হয়ে গেলো।
02 Chatru - Chandra Dhaba02 Chatru (old)
ছত্রু জায়গাটা ট্রেকারদের কাছেও জনপ্রিয়। যারা মানালি-হামটা পাস-চন্দ্রতাল ট্রেক করে, তারা হামটা পাস পেরিয়ে ইন্দ্রাসন পর্বতের সামনে দিয়ে (ইন্দ্রাসন – কি সুন্দর নামটা!) এই ছত্রুতেই এসে পড়ে। ট্রেকিংয়ের রাস্তা নদীর ওপার দিয়ে, এখানেই ট্রেকাররা তাঁবু খাটায় – এপারে আসে খাওয়াদাওয়া করতে এবং রসদ কিনতে। আমি কোনদিন ট্রেকিং করি নি, কিন্তু এদের দেখতে বেশ লাগছিলো।
ছত্রুর পরে আবার সেই “পাগলা-ঘোড়া-ছুটেছে” স্টাইলে গাড়ি চলেছে। রাস্তা আরো খারাপ হয়েছে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বাতাল বলে একটা পুঁচকে জায়গা। কিন্তু তার আগে পার হতে হবে “ছোটা ধারা” বলে একটা গোলমেলে জায়গা, যেখানে অত্যন্ত খারাপ রাস্তাটার ওপর দিয়ে কুলকুল করে জল বয়ে যায়, প্রায় একটা ছোট ঝর্নার মতোই। সেই পথে চড়াই ভেঙে গাড়ি নিয়ে ওপরে যেতে হয়। রাস্তাটা আবার সিঙ্গল লেন, অর্থাৎ ছোট ছোট কনভয় করে একেকবারে হয় ওপরের গাড়িগুলো নামবে, নয় নিচের গুলো উঠবে। আমাদের ঠিক আগে যে নিচে নামার গাড়ির কনভয় নামছিলো, সেই গাড়িগুলো প্রায় সবই আটকে গেল। তারপর তার থেকে যাত্রীদের নামিয়ে, মাল নামিয়ে, পাথর সরিয়ে কোনক্রমে গাড়ি চালানো হচ্ছিলো। কাণ্ড দেখে আমাদের তো হৃৎকমল একেবারে ধুকুর-পুকুর। তবে দেখে ভালো লাগছিলো যে গাড়ি আটকে গেলে অন্য গাড়ির ড্রাইভাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসে সাহায্য করছিলো। নীচে নামার কনভয় পেরিয়ে গেলে আমাদের গাড়ির পালা এলো এবং এক ঝটকায় ওপরে উঠে গেলো। নইলে এই বরফগলা জলে জুতো খুলে আটখানা স্যুটকেস নিয়ে কি করতাম কে জানে!!
02 Chota Dhara
বাতালে পৌঁছলাম দুপুর নাগাদ। এখানে একটা নতুন পি-ডব্লিউ-ডির গেস্টহাউস রয়েছে, কিন্তু এই জায়গাটা বিখ্যাত এর চাচা-চাচি ধাবার জন্যে (যেটার আসল নাম চন্দ্রা ধাবা)। বোধ দর্জি এবং চন্দ্রা দর্জি (না, ধাবাটার নাম চন্দ্রা নদীর নামে নয়), যাদের স্থানীয় লোকেরা চাচা-চাচি বলে, তাঁরা চালান এই ধাবাটি। চাচা-চাচির ধাবা বিখ্যাত হয়ে যায় ২০১০ সালে, যখন আকস্মিক বরফপাতে একদল ট্যুরিস্ট বাতালে আটকা পড়ে যায়। বাতাল এমনিতেই জনমানবহীন এলাকা, আশেপাশে পঞ্চাশ কিলোমিটার অব্দি কিচ্ছু নেই, ফোন বা মোবাইল চলে না। খাবার সীমিত – আসে স্থানীয় বাস বা গাড়ির ড্রাইভারদের বদান্যতায়। এই অবস্থায় এই ট্যুরিস্টের দলকে চাচাচাচি থাকতে দিয়েছিলেন এবং খাবার দিয়েছিলেন – যতক্ষণ ওঁদের স্টক ছিলো, ততক্ষণ। এবং সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। পয়সা নিতে চান নি ওঁরা, কারণ বিপদের সাহায্যকে ওঁরা বিক্রি করেন না।
02 inside chacha chachi
সোনু গল্প বলছিলো। “ওই সময় আমিও আটকে গিয়েছিলাম। ছত্রুর এক কিলোমিটার আগে। গাড়ি রাস্তায় রেখে হেঁটে যেতাম ছত্রুর চন্দ্রধাবায়। সেখানেও পয়সা নেয় নি কেউ। আর যতক্ষণ খাবার ছিলো, আমাদের খাইয়েছে। বিনা পয়সায়। তারপর যখন খাবার ফুরিয়ে গেলো, তখন ওই ধাবার মালিক তার পোষা ভেড়া কেটে তার মাংস রান্না করে খাইয়েছিলো আমাদের। আমি এমনিতে নিরামিষাশী, কিন্তু সেদিন খেয়েছিলাম। নইলে ওই ঠাণ্ডায় বাঁচতাম না।“
দম নিলো সোনু। তারপর সিগারেটে টান দিয়ে বললো “এই পাহাড়ে শুধু চাচা-চাচি নয়, সব পাহাড়িরাই সাহায্য করে। নইলে আমরা কেউ বাঁচতাম না এতদিন।“
02 Batal Bridge
বাতাল থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে চন্দ্রতালের দিকে। আমরা সেদিকে যাবো না এখন, আমরা যাবো কুনজুম পাসের দিকে। চন্দ্রতালগামী ট্রেকাররা সচরাচর এখানে একটা স্টপ দেয়। আমাদের সঙ্গে একটা ট্রেকিঙের দলের সঙ্গে কথা হলো – প্রায় জনা কুড়ি কমবয়সী বিদেশিনী, এসেছে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে। এরা সকলেই হামটা পাস থেকে আসছে, এই অতিসাধরণ ছোট্ট ধাবায় বা তার পাশে রাত কাটিয়েছে। দেখে অবাক লাগলো, ভালোও লাগলো বেশ।
চাচাচাচির দোকানে একটু আলু পরোটা সাঁটাবার সুপরিকল্পনা করছি, এমন সময় সোনু এসে বললো, “ইয়হা লাঞ্চ মত কিজিয়ে। সামনে কুনজুম পাস – উঁচাইমে হ্যায়। রাস্তা আউর ভি খারাপ।“
বোঝো! অতএব শুধু চা।
পরবর্তী গন্তব্য কুনজুম পাস – যার মিষ্টি স্থানীয় নাম “কুনজুম লা”।
(চলবে)
———————————-
উত্তরকথনঃ
এই রাস্তায় উতরাই-চড়াই বেশ বেশী, তাই মাউন্টেন সিকনেসের ভয় থাকে। ইনক্রেডিবল স্পিতির বিশেষবাবু বিশেষ করে বলে দিয়েছিলেন প্রতি আধঘণ্টায় দুতিন ঢোক জল খেতে, আর মাঝে মাঝেই ফলের রস খেতে। আমরা এই পদ্ধতি মেনে বিশেষ উপকার পেয়েছিলাম। এছাড়া আমরা একটা জলের বোতলে ও-আর-এস বানিয়ে রেখেছিলাম, সেটাও এক চুমুক মাঝে মাঝে পালা করে খেয়ে নিতাম।
এতে একটা বাড়তি সুবিধে, মাঝে মাঝেই প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে হবে, ফলত ড্রাইভার গাড়ি থামাতে বাধ্য হবে। সেই ফাঁকে দুচারটে “তসবীর খিচবার” সুযোগও পাওয়া যাবে, বুঝলেন কিনা 😁

😁

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ১

প্রথম পর্বঃ মানালির অবতরণ এবং “কিছুই না করা”  

দিল্লি থেকে সারারাতের বাসে চেপে মানালি এসে পৌঁছলাম সকাল ন’টা নাগাদ। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, প্যাচপ্যাচে কাদা আর তিরিশ লক্ষ ট্যাক্সিওয়ালা, যারা “হোটেল চাহিয়ে বাবু? একদম টপ-ক্লাস, বিলকুল বিয়াস নদী কি পাস হ্যায়” বলে চারদিক থেকে হামলে পড়েছে।

01 Manali

মানালি যাবার পথে পন্ডা বলে একটা জায়গায় থামে। এ সেই জায়গা 

আমাদের গন্তব্য মানালি নয়। আমরা যাচ্ছি লাহুল-স্পিতি, “ইনক্রেডিবল স্পিতি” নামের এক ট্র্যাভেল কোম্পানির হাত ধরে। স্পিতি সিমলার দিক দিয়েও যাওয়া যায় – কিন্নর পেরিয়ে নাকো-টাবো হয়ে। আমরা যাচ্ছি মানালিতে হয়ে। এখানে একটি রাত্তির কাটিয়ে পরদিন ভোরভোর বেরিয়ে পড়বো “কাজা”র উদ্দেশ্যে।

“ইনক্রেডিবল স্পিতি”র মূল অফিস কাজাতে, মার্কেটিং অফিস মানালিতে। মানালি অফিসের দুই প্রধান “বিশেষ” এবং “রুথিকা”, দুজনেই বেশ হাসিখুসি আর আড্ডাবাজ। আসার আগেই ফোনে আমাদেরকে পইপই করে বলে দিয়েছিলো “প্রথম দিন একদম বেশী কিছু করবেন না। শুধু বিশ্রাম নেবেন আর  একক্লাইমটাইজ করতে দেবেন শরীরটাকে।“ এই “একদম বেশী কিছু করবেন না” ব্যাপারটায় আমার আবার সহজাত দক্ষতা আছে – যাকে আজকাল “কোর-কম্পিটেন্স” বলে আর কি। তাছাড়া মানালি আগে একাধিকবার ঘোরা, কাজেই সারারাত বাসজার্নি করে এসে আবার সেই ট্যুরিস্ট-পীড়িত জায়গাগুলোতে, যেখানে স্থানীয় পোশাক পরে ইয়াকের গলা জড়িয়ে বা গাঁজাখোর খরগোস কোলে নিয়ে ছবি তোলাতে হয়, সেখানে যেতে আমাদের এমনিতেও বিশেষ আগ্রহ ছিলো না। শুধু বশিষ্ঠকুণ্ডে হটস্প্রিং এর চানের কথাটা একবার উঠেছিলো বটে, কিনতু  নামতে গেলে তো সব ধর্মস্থানের কমন এলিমেন্ট – সেই বিখ্যাত “খাটো গামছা” অথবা জাঙ্গিয়া পরে নামতে হবে, কারণ সুইমিং কস্টিউম আনা হয় নি। দিনকাল ভালো নয় – জাঙ্গিয়াকে সুইমিং কস্টিউম হিসেবে পরে নামলে সেখানকার জনসাধরনের ধর্মবিশ্বাসে যদি ঘা লেগে যায় এবং তার দরুন তারা যদি আমাদের দু-ঘা বসিয়ে দেয়, সেই ভয়ে শেষমেষ এই পরিকল্পনাটি পরিত্যাগ করা হলো।

আমাদের হোটেলটা ওল্ড মানালিতে, নাম “ড্রাগনস ইন”। নতুন মানালি থেকে ওপরে উঠে মানালসু নালার (বিপাশা নদীর একটি শাখা – আমাদের আদি গঙ্গা আর কালীঘাট গঙ্গা গোছের ব্যাপার আর কি) ওপরের ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয়। ডানদিকে নিচের দিকে নেমে গেলে ক্লাবহাউস (যেখানে একসময় ভিড় করে লোকে সূর্যাস্ত দেখতে যেতো), সেদিকে না গিয়ে বাঁদিকে চড়াই ধরে খানিকটা ওপর দিকে উঠতে হয় (এই রাস্তা শেষ হয়েছে মনু মন্দিরে)। চড়াইটা বেশ খাড়া, কারণ অটো আসতে চাইলো না আর ট্যাক্সি পঞ্চাশটাকা বেশী নিলো – যদিও সেটা সত্যিই চড়াইএর জন্যে, নাকি আমরা “বোটু” বলে, সেটা বলা শক্ত। তা আমাদের “ড্রাগনস ইন” বেশ ছিমছাম “নো-ফ্রিলস” একটা হোটেল, সামনে একই নামে একটা কফিশপ (যার ক্যাফে-মোকা না খেলে মশাই আপনার জীবনটাই বৃথা) আর লাগোয়া একটা রেস্তোরাঁ, যার আসল নাম বোধহয় রাইস-বাউল, কিন্তু সবাই সেটাকেও ড্রাগনস-ইন নামেই ডাকে। ড্রাগন শুনলেই আমার আবার হেমেন রায়ের “ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন” মনে পড়ে কিম্বা  কাঞ্চনজঙ্ঘা-প্রহেলিকা সিরিজের সেই সব সাংঘাতিক রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস – যেখানে হত্যাকারী মৃতদেহের পাশে একখানা হরতনের টেক্কা ফেলে দিয়ে যেতো, আর গল্পের শেষে  চিনেপাড়ার অন্ধকার গলিঘুঁজিতে সুদূরপ্রাচ্যের কোন প্রধান অপরাধীর (তখনো “ডন” কথাটা চালু হয় নি) সঙ্গে গোয়েন্দার রক্তহিম মোকাবিলা হতো। কিন্তু আমাদের ড্রাগনস ইন নিতান্তই নিরীহ হোটেল, তাই সেরকম গায়ে-কাঁটা-দেওয়া ঘটনার ঘনঘটা কিছু ঘটে নি।

01 Manali (old)

ওল্ড মানালির পথে

01 Manalsu river

মানালসু নালা

হোটেলটা টিপিক্যাল ট্র্যাভেলার-পাড়ায় – পিঠে ব্যাক-প্যাক বাঁধা বিদেশীর দল গিজগিজ করছে এখানে। টিপিক্যাল ট্যুরিস্ট পাড়ায় যেমন গোটাকয়েক “শের-ই-পাঞ্জাব” রেস্তোরাঁ থাকবেই (“শের-ই-পাঞ্জাব, “নিউ শের-ই-পাঞ্জাব” ইত্যাদি, তেমনি এই সব সাহেবি ট্র্যাভেলার পাড়ায় থাকবেই “জার্মান বেকারি”। এখানে দেখলাম হোটেলের সামনের সরু গলিতেই গোটা তিনেক জার্মান বেকারি আছে, সেগুলিতে নানান বিদেশী ছেলে-বুড়ো তুরিয় অবস্থায় বসে এটা-সেটা খাচ্ছেন।

01 Manali (2)

ওল্ড মানালির সঙ্গে দুটি জিনিস একছত্রে বাঁধা পড়ে গেছে – এক হলো গঞ্জিকা (যার ভদ্র মডার্ন নাম “মারিজুয়ানা”) আর দ্বিতীয় এই অজস্র ইজরায়েলি ট্যুরিস্টের দল। শুনেছি যতো বিদেশী আসেন হিমাচলে, তার ৭০ শতাংশ আসেন ইজরায়েল থেকে। এদের মূল গন্তব্য মানালির থেকে অনতি দূরে কাসোল, কুলু, ধরমশালা আর এই ওল্ড মানালি। কেউ কেউ তাই পুরনো মানালিকে “ছোট টেল-আভিভ” বলে থাকেন। মানালির অনেক দোকানেই সাইনবোর্ড হিব্রু – এমনকি মেনুকার্ডটিও হিব্রুতে লেখা। রেস্তোরাঁর সামনে বিদেশী স্টাইলে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে “আজকের স্পেশাল” আইটেমগুলি লেখা, তাতে দেশ-বিদেশের খাবার লেখা থাকে। এই সিজলার-স্নিটজেল-গ্রিল্ড ট্রাউট-বারগার-পাস্তা-শোভিত মেনুর মধ্যে অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি ফালাফাল, কুশকুশ (এটা অবশ্য লেখা থাকে না, ট্রাউটের সঙ্গে দেয়) এবং ইজরায়েলি “শ্যাকশাউকা”র।

শ্যাকশাউকা প্রাচীন অটোমান সাম্রাজ্যের সব দেশগুলিতেই বেশ জনপ্রিয়। শুনেছি অটোমান সাম্রাজ্যের সময় এটা মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি হতো; পরে টিউনিসিয়ার ইহুদীদের হাতে পড়ে এর বর্তমান রূপটি ইজরায়েলে জনপ্রিয় হয় – টম্যাটো-পিঁয়াজ-ক্যাপ্সিকামের রঙিন ভাইদের মিশিয়ে একটা থকথকে কারির ওপর ডিমের পোচ বসিয়ে দেওয়া হয়। শ্যাকশাউকা খেতে দেওয়া হয় লোহার একটি সসপ্যানের মতো পাত্রে – তাকে বলে ট্যাজিন। আমি এটি  দুয়েকবার খেয়েছি তুর্কিস্তানে – সেখানে এর একটা ভায়রা-ভাইও চলে, যাতে টম্যাটোর বদলে বেগুন দিয়ে তৈরি হয় শ্যাকশাউকার বেস ।

01 Manali 301 Manali 4

মানালিতে আমরা অবশ্য শ্যাকশাউকা খাই নি। হোটেলের বাইরে একটা জনশুন্য ছোট রেস্তোরাঁয় আমাদের পূর্বতন প্রভূদের স্মরণ করে “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” অর্ডার করেছিলাম। দোকানদার আমাদের এই ব্যবহারে বোধহয় মর্মাহত হয়ে পড়ে – যেখানে দোকানের সামনের ব্ল্যাকবোর্ড মেনুকার্ডে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে ইজরায়েলি-স্প্যানিশ-ফ্রেঞ্চ ব্রেকফাস্ট এভেলেবল, সেখানে সেসব ফেলে শেষে সেইইইই “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” ? এই গভীর মনকষ্টেই বোধহয় বেচারার এই সাধারণ ব্রেকফাস্ট বানাতে পাক্কা ৫০ মিনিট লেগেছিলো – ততক্ষনে খিদেয় আমরা চেয়ার-টেবিল চিবিয়ে ফেলার উপক্রম করছি। অবশ্য এতে একটা উপকার হয়েছিলো – ব্রেকফাস্টটা “ব্রাঞ্চ”এ পরিনত হওয়ায় লাঞ্চটা আর খাবার দরকার পড়ে নি; শুধু আমাদের মতো দু-তিনজন ব্যোম-হ্যাংলারা বিকেলের দিকে ইয়াকের-চিজ দেওয়া উৎকৃষ্ট পিৎজা খেয়ে এসেছিলাম আমাদের হোটেলের লাগোয়া রেস্তোরাঁয় – যার মালকিন আবার এক ইজরায়েলি রমণী।

মানালিতে মারিজুয়ানার এমন অবাধ ব্যবহার অবাক করে দেবার মতন। ওল্ড মানালির প্রায় সব রেস্তোরাতেই মাটিতে বসার ব্যবস্থা আছে – বেশ গদী-বালিশ নিয়ে এলিয়ে বসে কল্কেতে টান মারা যায়। সাধরন মনিহারি দোকানে প্রকাশ্যেই নানান ধরণের কল্ককে ও তার অ্যাক্সেসরি পাওয়া যায়। এমনকি শুধু গাঁজার সরঞ্জাম বিক্রি করবার ‘এক্সক্লুসিভ” দোকানও আছে বড়ো রাস্তার ওপরেই। মানালি তো “মনুর আলয়” – শিবের তো নয়, কিন্তু চরিত্রগত দিক থেকে শিবের সঙ্গেই এর মিল বেশী। রাস্তায় ঘাটে অনেক বিদেশিনী ও স্বদেশিনীদের দেখতে পেয়েছি – বিচিত্র স্বপ্ল-পোশাক পরে ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে আছেন। জানি, জানি – তাদের ছবি পেলে আপনাদের বেশ নয়নসুখ হতো – এই তো ? ওসব পাপ কথা একদম বলবেন না – এ হচ্ছে ভ্রমণকাহিনী, ও সব রসের কথা আরেকদিন হবে অখন।

মনুর কথা ঠিক জানা নেই, তবে ওল্ড মানালির সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দারা ছিলেন কাংরা উপত্যকার যাযাবর শিকারী ও মেষপালকরা – যাদের আবার বলা হতো “রাক্ষস” (হ্যাঁ মশাই – রাক্ষস-অসুর-গান্ধর্ব-নাগ এরা সবাই নানান গোষ্ঠীই ছিলো – নেহাত বেদবাদী নয় আর গাঙ্গেয় বৈদিক প্রথা সব পালন করতো না বলে এদেরকে “মানুষ নয়” বলে ভিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো)। পরে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা যারা হলো, তাদের বলা হতো “নর”। আরো অনেক পরে একসময় এটি একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মজার কথা – এই মানালির রাজারা নিজেদের রাজা বলতেন না। তাঁরা বলতেন মানালির আসল রাজা হলেন রঘুনাথজি, তাঁরা রাজ্য চালান এই রঘুনাথজীর সেবক হিসেবে। ভরত যেভাবে রামের খড়ম রেখে রাজত্ব করতেন আর কি। এর কারণ নাকি সপ্তদশ শতাব্দীতে মানালির এক রাজা জগৎ সিংহ একদা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে বসেছিলেন। কোন চিকিৎসাতেই যখন কাজ হলো না, তখন তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে অযোধ্যা থেকে রঘুনাথজীকে (অর্থাৎ রামের এক রূপ) নিয়ে এসে তাঁকে সিংহাসনে প্রতিস্থা করেন ও নিজের হাতে তাঁর সেবা করতে শুরু করেন। কথিত আছে তাঁর দয়ায় জগৎ সিংহ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সেই থেকে মানালির রাজা থেকে যান রঘুনাথজী। এই ভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর মানালি মান্ডি রাজ্যের অংশ হয়ে যায় – যার রাজারা ছিলেন সেন পদবীধারী চন্দ্রবংশীয় রাজপুত (যাঁদের সঙ্গে আবার নাকি আমাদের বাংলার সেনবংশের কি যেন একটা লতায়-পাতায় সম্পর্ক আছে)।

আধুনিক মানালি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্রিটিশদের দাক্ষিণ্যে – যারা এখানে আপেল চাষ এবং এর নদীতে দুরকম ট্রাউট মাছের চাষ শুরু করেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলেও মান্ডি স্বাধীন রাজ্যই ছিলো, মায় ভারত স্বাধীন হওয়া অব্দি। ভারত স্বাধীন হবার পর যে ৫৬২ খানা স্বাধীন রাজ্য ভারতবর্ষে যোগ দেয় মূলত বল্লভভাই প্যাটেলের রাজনৈতিক ছক্কা-পাঞ্জার খেলায়, মান্ডি তাদের মধ্যে একটি।

01 Manali 5

মানালির কথা আর নয়। কাল আবার সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়া। ফেরবার পথে এর সঙ্গে পুনর্মিলন যখন হবে, তখন নাহয় দুচার কথা হবে। আপাতত মানালিকে আলবিদা।

পরবর্তী পর্ব – কাজা।

(চলবে)

—————————————————————————————————————————————–

উত্তরকথনঃ

মানালিতে বিপাশা নদীর ধারে বসে “নদী তুমি কথা হতে আসিতেছো” বলা ছাড়া আরো কিছু দেখবার জিনিস আছে – মনু মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির (মানালির একটু বাইরে), হিড়িম্বা মন্দির (এবং তাঁর অনতিদূরে ঘটোৎকচের খোলা মন্দির) ইত্যাদি। মনু মন্দিরটা খুবই পুরনো, কাঠের গায়ে কারুকার্য করা মন্দির – এই স্টাইলের মন্দির এই অঞ্চলে দেখা যায় খুব। হিড়িম্বা মন্দির – আর বিশেষত ঘটোৎকচের খোলা মন্দির দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এদুটিই ট্রাইবালদের (যাদের তখন রাক্ষস বলতো) দেবতার মন্দির। এর স্ট্রাকচারে নগর বা দক্ষিণী স্টাইল, কোনটাই নেই; আছে পশুর মাথা বা শিং দিয়ে সাজসজ্জা। বশিষ্ঠ মন্দির মানালির থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে, ওর কাছে শুনেছি হোমস্টে আছে। থাকতে পারেন ইচ্ছে হলে – একটু নিরিবিলি হবে। আর, ইয়ে – ছেলেদের জন্যে বলছি – সুইমিং কস্টিউম অথবা হাফপ্যান্ট নিয়ে যাবেন, আর একটা লম্বা তোয়ালে, কেমন?

—————————————————————————————————————————————–