অণুগল্পঃ আমার মুক্তি

কান খাড়া করে সব কথা শুনছেন তিনি। পাশের ঘরে নাতনি আর বউমার তর্কের আওয়াজ উঁচুতে উঠছে ক্রমশ। 

“সারাক্ষণ এভাবে থাকা যায় নাকি? পার্কে গেলে কী হবে?”

“কী হবে তুমি বেশ জানো – ন্যাকা সেজো না। পার্কে গিয়ে তোমরা বন্ধুরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরো – হাগ করো – তোমাদের ওই কী যেন – হ্যাঁ হ্যাঁ হাই-ফাইভ – ওগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক। স্যোশাল ডিস্ট্যান্সিং তোমরা কেউ মেনটেন করো না।“

“তাহলে আমরা শুধু স্কাইপ আর জুম আর টিমে কথা বলবো নাকি সারা জীবন? এখন তো আর লকডাউন নেই। তাহলে…”

“তোমাদের যবে আক্কেল হবে, তারপর আবার বেরোবে। আমি তো ছাড় দিয়েইছিলাম। তোমার বাবা তোমাদের পার্কে দেখে এসে আমাকে বলল তোমরা সে ছাড়ের কী ধরণের অপব্যবহার করছো… ।“

দড়াম করে দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলো তিয়াস। তারপর দুমদুম করে চলে গেলো বারান্দায়। সশব্দে বারান্দার দরজাটা বন্ধ হলো।

ওঁর খুব কষ্ট হলো মেয়েটার জন্যে। আহা – কতই বা বয়েস – এই তো পনেরোয় পড়লো। এই বয়েসে তো বন্ধুদের সঙ্গে হইচই করবেই…

কষ্ট হলেও অবশ্য ওঁর বিশেষ কিছু করার নেই। সংসারে ওঁর কথার বিশেষ ওজন নেই – অনেককাল হলো। না –বউমা খারাপ ব্যবহার মোটেই করে না, বরং যত্নই করে। তবে কিনা ওঁর কথা বা মতামতকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। এক্ষেত্রে তো আরোই দেবে না – কারণ বউমা যেটা বলেছে, সেটা যুক্তিযুক্ত।

সাতপাঁচ ভেবে শেষে আস্তে আস্তে বারান্দার দরজাটা খুলে বাইরে এলেন। ভেবেছিলেন তিয়াস বোধহয় খুব রেগে থাকবে – দেখলেন সে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে। তবে মুখ দেখে মনে হচ্ছে না সেটা সে খুব মন দিয়ে শুনছে। একটা অস্থির ভাব।

উনি পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর খুব নিচু স্বরে জিগ্যেস করলেন “গান শিখবি?”

“গান?” অবাক হলো তিয়াস। “কী গান?”

“ওই আর কী – আমি যেসব গান, মানে আমার…”

“মা শিখিয়েছিল কয়েকটা। তবে আমার তেমন ভালো লাগে না। ঠিকমতো বুঝতে পারি না।“

 “আমি বুঝিয়ে দেবো।“ বললেন উনি। “দাঁড়া – আগে গীতবিতানটা নিয়ে আসি।“

“গীতবিতান !!” বলে হাসলো তিয়াস। “এখন সব নেটে পাওয়া যায়। এই নাও – এই সাইটে খুঁজে দেখো।“

খুঁজে পেলেন উনি। অবশ্য গীতবিতানটা আনতে যা সময় লাগতো, তার চেয়ে একটু বেশিই সময় লেগে গেল – তা হোক! তারপর সেটাকে আস্তে আস্তে পড়তে লাগলেন।

“এই যে মুক্তির কথা বলেছেন – সেটা আমাদের অন্ধকার থেকে মুক্তি। মানে আমাদের মনের অন্ধকার… তাই এ মুক্তি আলোয় আলোয়। আজকের পৃথিবীতে, যখন এক অসুখের আতঙ্কে আমরা উৎকণ্ঠ হয়ে আছি – আপনজনকে হারাবার ভয় পাচ্ছি প্রতিমুহূর্তে, তখন এই প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি নিশ্বাসে আসছে আমাদের মুক্তি।“

তিয়াস ভুরু কুঁচকে শুনছে। সবটা ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু বলতে বলতে ওঁর মুখে যে জ্যোতির্বলয় ফুটে উঠছে সেটা টের পাচ্ছে। আর না বুঝেও কেমন যেন ভালো লাগছে তার। বিশেষত বোঝাতে বোঝাতে উনি একটু করে গেয়ে উঠছে আর তার গা শিরশির করে উঠছে তখন।

পেছন থেকে সমীরণের গলা পাওয়া গেল। “দেহ মনের সুদূর পারে, হারিয়ে ফেলি আপনারে…”। বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে সে – গলা ছেড়ে গাইছে। তিয়াসের চোখ গোল গোল হয়ে গেল।

“বাবা – তুমি গান গাইতে নাকি?”

“এটা আমাদের স্কুলের প্রেয়ারে গাওয়া হতো রে। এটা জানবো না? “ বলল সমীরণ।  

“থামলি কেন – গা” বললেন উনি। সমীরণ আবার গাইতে শুরু করলো। তিয়াসও।  

এসব গানের আওয়াজে মন্দিরা বারান্দায় এসে পড়েছেন। তাকে দেখেই তিয়াস বলল “মাম্মা – বাবা গান গাইছে – আর আমিও। এই গানটা জানো তুমি?”

“এটা সবাই জানে রে। “

“তাহলে আমাদের সঙ্গে গাও। ওয়েট আ সেকেন্ড – দিয়াকে ডেকে নিই স্কাইপে? ও তো বেঙ্গলি – ওরও ভালো লাগবে। হয়তো ওর মা-বাবাও জয়েন করবে। “

স্কাইপ চালু হলো। সোনাঝরা বিকেলে প্রবাসী দুটি পরিবার, যার কনিষ্ঠ সদস্যারা বাংলা ভালো করে জানে না, তারা দুটি আলাদা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই গানটা গেয়ে উঠলো।

আঘাতে বেদনায় বিষণ্ণ পৃথিবীর ওপর ছেয়ে আছে কালশিটে রঙের আকাশ। কিন্তু তার একপ্রান্ত আলোকিত হয়ে উঠছে রক্তিম সূর্যাস্তে। সেই সোনালি আলোয় দেখা যাচ্ছে ওঁর সাদা দাড়ি আর আলখাল্লা। উনি গাইছেন। প্রায়-অন্ধকার আকাশে মুঠো মুঠো মুক্তির আশা ছড়িয়ে পড়ছে।     

***

অণুগল্পঃ ডেটিং

রেস্তোরার আলোটা ত্যারছা হয়ে এসে পড়েছে সামনের রাস্তায়। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আছে রোহন। একটু অস্থির, ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখছে, চুল ঠিক করছে থেকে থেকে। তাছাড়া খেয়াল রাখছে ওর নিজের মুখে আলোটা ঠিকমতো পড়ছে কিনা।

আসলে এটা ওর প্রথম টিন্ডার ডেটিং কিনা!

গত ছ’মাস কারোর সঙ্গে রোহনের সেভাবে কথাই হয় নি। লকডাউনের লৌহকপাট শিথিল হলেও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেছে। আগে যে অফিসের পার্টি হতো মাঝে মাঝে, কখনো বা বন্ধুদের পিৎজা পার্টি বা কোন মেয়ের সঙ্গে এমনি এককাপ কফি খাওয়া – সেসব যেন গতজন্মের কথা।

তাই প্রথমে আপত্তি থাকলেও শেষে এই টিন্ডার ডেটিং অ্যাপেতেই নাম লিখিয়েছে সে। এতে খরচা আছে কিছুটা, কিন্তু তবু তো কারোর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হবে, কথা হবে। হয়তো অন্য কিছুও – বলা যায় না।

মেয়েটি এসে রোহনের ঠিক সামনে দাঁড়ালো। তারপর বলল “রগস-১৩ ?”

মাথা হেলিয়ে সায় দিলো রোহন। ওটা ওর টিন্ডার পাসওয়ার্ড। তারপর বললো “আসল নাম রোহন। তোমার?”

“তুলি। টিন্ডারে ‘দ্য বিচ’। আমাদের আজকের বুকিং নম্বর ৩২৭। কী, ঠিক আছে?”

হাসলো রোহন, যদিও মাস্কের আড়ালে সেটা বোঝা গেলো না। তারপর বলল “চলো, রেস্তোরায় যাই?”

“দাঁড়াও – তার আগে এটা দেখে নাও।“ তুলি ওর মোবাইলে একটা সার্টিফিকেট দেখালো। তুলির কোভিড টেস্টের সার্টিফিকেট। দুদিন আগে করা। রেজাল্ট নেগেটিভ।

“আর এই ট্র্যাকার অ্যাপ দেখাচ্ছে যে গত দুদিনে আমার সঙ্গে কোন কোভিড পেশেন্টের কন্ট্যাক্ট হয় নি। কাজেই – অল ওকে।“

যদিও এসব নিয়ম টিন্ডার-অ্যাপেই বলা ছিল, তবুও রোহন কেমন একটু থতমত খেয়ে গেল। আনাড়ি হাতে নিজের কোভিড সার্টিফিকেট আর ট্র্যাকার অ্যাপটা খুলে মোবাইলটা তুলির হাতে তুলে দিল। দুটোকেই মন দিয়ে দেখে ফেরত দিতে দিতে তুলি বলল “ক্লিন। চল, যাওয়া যাক।“

“রেস্তোরায়?”

“এত তাড়া কিসের? আগে এই সামনের পার্কে এক চক্কর হেঁটে নি?” বললো তুলি।

ফুটফুটে চাঁদের আলো পার্কে। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। ওরা দুজন হেঁটে চলেছে পার্কে। কথা বলছে মৃদুস্বরে। তুলির চোখের তারায় চাঁদের প্রতিবিম্ব।

দুজনের দূরত্ব কমে আসছে ক্রমশ। হাতের গ্লাভস খুলে ফেলেছে দুজনেই।

পার্কের অন্যপ্রান্তে পৌঁছে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো তুলি। তারপর রোহনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। দূরত্বটা কমে গেল আরেকটু।

রোহনের বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে এবার। তুলির বাঁ হাত রোহনের গলা জড়িয়ে ধরেছে। কী অসম্ভব মাদকতা ওর পারফিউমের গন্ধে !

অব্যক্ত স্বরে রোহন কোনমতে বলল “মাস্কটা খুলবে না?”

খিলখিল করে হাসলো তুলি। তারপর ডানহাতের এক টানে খুলে ফেললো নিজের মাস্কটা। তারপর রোহনেরটাও।   

টকটকে লাল লিপস্টিক-মাখা তুলির ওই পুষ্পপুটতুল্য ঠোঁটের ফাঁকে ঝিলিক মারলো ঝকঝকে সাদা দাঁতের পাটি। পূর্ণিমার আকাশ-ধোয়া চাঁদের আলোয় রোহন দেখতে পেল তুলির শ্বদন্তটি একটু বেশিই দীর্ঘ। আর তাতে স্পষ্ট লাল দাগ।

রোহনের গলা জড়িয়ে থাকা তুলির নরম কোমল হাতটা হঠাৎ ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠেছে। রোহনের গলার কাছে তখন একটা তীক্ষ্ণ অসহ্য যন্ত্রণা।

***  

অনুগল্প ৫ঃ ডাক্তারদিদি

অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে রোহিত। তীব্র যন্ত্রণা – আর তার সঙ্গে নিঃশ্বাসের কষ্ট। শ্বাস যেন যাচ্ছে না শরীরে – হাঁ করে সজোরে নিতে হচ্ছে, আর হাপরের মতো ওঠা নামা করছে বুকটা। মাঝে মাঝে কাতরে উঠছে।

বউ পৌষালি কাণ্ডকারখানা দেখে ঘাবড়ে গেছে। বেচারি নতুন বউ – সবে তিনমাস হলো বিয়ে হয়েছে। দুজনের নতুন সংসার। ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলো “একবার পাশের হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাক ?”

“ডাক্তার ?” মুখ কুঁচকোলো রোহিত। “ডাক্তার কি করবে? দিদির থেকে বড়ো ডাক্তার কি আছে নাকি? দিদিকে ফোন করেছিলে ?”

“হ্যাঁ, তোমার সামনেই করলাম তো।” বললো পৌষালি।

“কোন ফ্লাইটে আসছে দিদি ? জিজ্ঞেস করেছো ? উঃ, আমি মরে যাচ্ছি …পারছি নাআআআ।“

“সে কথা কিছু বললো না দিদি। সব শুনে লাইনটা কেটে দিলো – নাকি নিজের থেকেই লাইন কেটে গেলো কে জানে। কিন্তু দিদি এতো তাড়াতাড়ি কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর কি করে পৌঁছবে? সময় লাগবে তো অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা।”

“তুমি আবার ফোন করো।”

“আচ্ছা করছি, তুমি একটু শান্ত হও গো।”

বেল বেজে উঠলো। পৌষালি দরজা খুলতে গেলো।

“ওই তো দিদি এসেছে। দিদি, দিদি – ও দিদি, তাড়াতাড়ি এসো…”

পৌষালি ফিরে এলো। “দিদি নয়। নীচের ওষুধের দোকান থেকে এই ওষুধটা দিয়ে গেলো…”

“ওষুধ ? কিসের ওষুধ ? তুমি আবার কি ওষুধ আনালে? বলেছি না দিদির সঙ্গে কথা না বলে…দাও ফোন দাও। দিদিকে ফোন করছি আমি…” রোহিত মোবাইলের দিকে হাত বাড়ালো।

“ও দিদি, তুমি কখন আসছো ? আমি আর পারছি না যে…”

দিদির গলার সুরে শান্তির প্রলেপ। দিদির গলায় ভরসার আগল। দিদির গলায় মা-মা গন্ধ।

“অতো ছটফট করছিস কেন বল দিকি।“

“তুমি কোন ফ্লাইটে আসছো ?”

“ভাইয়া, আমি আসছি না ।“

“মাআআনে। তুমি আসছো না মানে? উঃ দিদি, তুমি আর বোধহয় আমাকে দেখতে পেলে না গো…” রোহিত আর্তনাদ করে উঠলো।

“ন্যাকামো কোরো না, রোহিত।”

দিদির গলায় বজ্রপাত। দিদির গলায় চাবুকের সপাং।

“এমন কিচ্ছু হয় নি তোর। অ্যালার্জি আছে জেনেও কে বলেছিলো তোকে চিংড়িমাছ খেতে? তোর বাড়ির নীচের ওষুধের দোকানে ফোন করে দিয়েছি; ওষুধ দিয়ে যাবে। ওটা খেয়ে শুয়ে থাক। ঘণ্টা তিনেক অন্তত লাগবে। পৌষালিকে দে, আমি ওকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। “

ফোন ছেড়ে দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো রোহিত। ব্যথাটা কমছে মনে হচ্ছে।

******

পরমাণু গল্প ২ঃ হাওয়া

ঘুম থেকে উঠেই পারুল পিছনের বাগানে দৌড় দিলো। বাঃ, ওর গাছগুলোকে দেখতে হবে না ?

পারুলের ভাই-বোন নেই। বন্ধুও তেমন নেই – ওদের বাড়িটা মূল শহর থেকে একটু বাইরে, রাপ্তি নদীর ধারে। কুকুর-বেড়াল ওর মা দুচোখে দেখতে পারেন না, তাই তারাও নেই। ওর আছে বাড়ির পেছনের বাগানটা আর তাতে থাকা একরাশ গাছ।

গতকাল ওর বাগানের চাঁপা গাছটা ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছে। পারুলের তাই খুব আনন্দ। মনে করছে ও যেন সেই সাত ভাই চম্পার এক বোন পারুল। অবশ্য চাঁপা ফুল সাতটা নয়, তার চেয়ে ঢের বেশী। গুনে দেখলে একুশটা।

আজ সকাল থেকে খুব হাওয়া। কিন্তু ফুলগুলো ঝরে যায় নি। পারুল নিশ্চিন্ত হলো দেখে।

ফুলগুলোরও খুব মজা। হাওয়ায় মাথা দোলাতে দোলাতে নিজেদের মধ্যে খলবল করে কথা বলছে। ফুলেদের ভাষায় অবশ্য – সে ভাষা আপনি-আমি বুঝবো না।

ফুলের জন্মটা ওদের বেশ লাগছে। খুব হাওয়া এখানে। মানুষের জন্মটা তেমন সুবিধের ছিলো না। হাসপাতালে মোটে হাওয়া ছিলো না। তাই তো বড্ডো তাড়াতাড়ি মরে যেতে হলো।

পরমাণু ১ঃ যাওয়া

“বলি, অমন থুম মুখে বসে থাকলে চলবে? কোথাও যাওয়া-টাওয়া হবে না ?” সূর্য একটু বিরক্ত হয়েই বললো।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাওয়া যাক।“ পোঁ ধরলো সমীরণ। “অনেকদিন বেরনো হয় নি। চলো, লেটস গো!!“

নীল কিছু বললো না। শুধু হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইলো।

মেয়েটা জানলায় বসে আছে চুপ করে। তাকে ডাকছে বৃষ্টি-থামার-পরের ঝলমলে রোদ্দুর, সোহাগ মাখা ঠাণ্ডা-ভিজে হাওয়া আর সাদা মেঘের পিছনে থাকা সহাস্য নীলাকাশ। এসো – বেরিয়ে পড়ো, শিগগীর।

মেয়েটারও মন ছটফট করছে। ও ফিরে এলেই বেরিয়ে পড়বে। বেশী দূরে কিছু নয়, এই আশেপাশেই কোথাও। একদুদিনের ছোট্ট বেড়ানো আর কি। এই অবস্থায় ডাক্তার বেশী ঘোরাঘুরি করতে বারণ করেছে। আর মাত্র দুমাস বাকি যে!

কিন্তু মুশকিল হয়েছে কি – কাল বিকেল থেকে ওর কোন খবর নেই। এদিকে নিজে খবরের কাগজেই কাজ করে! কোথাকার কোন পাঞ্জাবী সাধুবাবার বিরূদ্ধে চলা মামলার রায় শুনতে গিয়েছিলো। কাগজে লিখবে বলে। সেই থেকে লা পাত্তা।

কোনো মানে হয় !!

অনুগল্প ৩ঃ এক বর্ষণমুখর প্রভাতের কথা

পূজো শেষ করে ঘাটে চুপ বসেছিলেন ঠাকুরমশাই। আকাশে কালো মেঘ, সূর্যের দেখা নেই। বৃষ্টি আসবে।

পিছন থেকে একটা গলা খাকরানির আওয়াজ পেয়ে ঠাকুরমশাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন। কিছু বলবার দরকার হলো না, শিষ্যের মুখ দেখেই ঠাকুর বুঝে ফেললেন কি হয়েছে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করলেন।

প্রতি বছরই এই হয়। এই দিনটায় এসে ব্রাহ্মণী বড্ড বিচলিত হয়ে পড়েন। সামলে রাখা যায় না তখন।

হন হন করে ঠাকুরমশাই হাঁটতে লাগলেন নিজের কুটিরের দিকে। এই সময়গুলোতে অসহায় বোধ করেন উনি। রাগ হয়ে যায় তখন। ব্রাহ্মণীর এই অবুঝপনার সত্যি কোন মানে হয় না। এতোগুলো বছর কেটে যাবার পরেও…

কুটিরে ঢোকবার মুখে হাঁসটা এসে পায়ে ঠুকরে দিলো। উহুহুহু করে উঠলেন ঠাকুরমশাই।  ব্রাহ্মণীর যতো উৎকট শখ। হাঁস আবার কেউ পোষে নাকি ? রাগটা আরও চাগিয়ে উঠলো ওনার।

ঘরে ঢুকে ঠাকুরমশাই একটু থমকে গেলেন। ভেবেছিলেন বাড়িতে ঢুকেই ব্রাহ্মণীকে বেশ দু-কথা শোনাবেন। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখলেন ঘর অন্ধকার। বাইরের ঘন মেঘ সত্ত্বেও ঘরে আলো জ্বালা হয় নি। শ্বেতবস্ত্রা ব্রাহ্মণীকে আবছা দেখা যাচ্ছে – জানালার পাশে।  মুখখানা হাতে ভর দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। যন্ত্রটা অবহেলায় কোলের পড়ে রয়েছে। ব্রাহ্মণের পায়ের আওয়াজ পেয়েও মুখ ঘোরালেন না।

ঠাকুরমশাই আস্তে আস্তে ব্রাহ্মণীর পাশে এসে বসলেন। কি বলবেন ভেবে পেলেন না। শুধু দেখলেন ব্রাহ্মণীর চোখের কোলে একটি মাত্র অশ্রূ শিশিরবিন্দুর মতো লেগে রয়েছে।

ঠাকুরমশাই খুব নরম সুরে বললেন “এরকম করছো কেন বলো তো! এরকম করতে নেই।“ ছায়ামূর্তি উত্তর দিলো না।

ঠাকুরমশাই আবার খুব নরম সুরে বললেন “এরকম ভাবে নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। ও তো আর ফিরবে না। এতোগুলো বছর তো কেটে গেলো…”

“হ্যাঁ, এতগুলো বছর।“ বললেন ব্রাহ্মণী। “ওর মতো কেউ তো এলো না গো। তুমিও তো আর কাউকে আনতে পারলে না। পারলে ?”

প্রজাপতি ব্রহ্মা চুপ করে রইলেন। হঠাৎ ওই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার জন্যে বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠলো। একটা অক্ষম বেদনা পাঁজরে এসে ধাক্কা দিলো। মনটা বড্ডো খারাপ হয়ে গেলো ওনার।

সত্যি কতোগুলো বছর কেটে গেলো। আর কেউ এলো না, যার হাতে সরস্বতী তাঁর বীণাখানি তুলে দিতে পারেন। বলতে পারেন

“এই নে আমার বীণা, দিনু তোরে উপহার।

যে গান গাহিতে সাধ, ধ্বনিবে ইহার তার।“

আজকের দিনেই ছেলেটা চলে গিয়েছিলো। ছিয়াত্তর বছর আগে। ২২শে শ্রাবণে।

———————————————————————————————————————————

৮.৮.২০১৭

অনুগল্প ২: নিছক বিরিয়ানির গল্প

“শতরঞ্চ কি খিলাড়ী। তাঁর হাত ধরেই কলকাতায় এসেছিলো বিরিয়ানি। আর তার রূপান্তর হয়ে সৃষ্টি হলো কলকাতার বিরিয়ানি। সিরাজের বিরিয়ানি। আমিনিয়ার বিরিয়ানি। আপনার, আমার প্রানের আরাম, মনের শান্তি। কি বুঝলেন?”

“তা যা বলেছেন। কলকাতার বিরিয়ানি একটা অপার্থিব জিনিস মশায়।“

“ঠিক মতো বানালে তবে। তাওয়াতে শুকনো করে ভাজা গোটা মশলা। ঘি দিয়ে ভাজা পিঁয়াজ। ডেকচিতে স্তরে স্তরে মাংস আর বিরিয়ানির চাল। তার সঙ্গে মসলিনে মুড়িয়ে সঠিক পরিমানে মশলা। একগাদা দিয়ে দিলেই সর্বনাশ। সঙ্গে কেওড়ার জল আর এক ফোঁটা মিষ্টি আতর। আহা, আহা – যেন সেতারের সুর !“

“সিরাজের মতো কিন্ত কারুর নয়, বলুন!”

“না না, সেটা অন্যায় কথা। আমিনিয়া ? যেখানে একসময় মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের ভিড় থাকতো?

“ওদের আমিনিয়া স্পেশালটা দারুণ !“

“তেমনি উমদা চাঁপ আর রেজালা। যদিও চাঁপটা রয়েল বেশী ভালো করে।“

“রয়েলের বিরিয়ানিও তো খুব ভালো।“

“তা ভালো, তবে আমি সিরাজ আর আমিনিয়ার স্ট্যান্ডার্ডে ফেলবো না মশাই। তার বদলে বরং রেহমানিয়া বেশী ভালো ছিলো।“

“আর অ্যাম্বার এর নার্গিসি বিরিয়ানি ?”

“অন্য ঘরানার, সব হতে আলাদা,  মধুর। এমনকি ওদের সিস্টার কনসার্ন সাগর-এর থেকেও আলাদা। সুনীল-সমরেশ বসু-শংকর-বিমল মিত্রদের মাঝখানে যেন একপীস কমলকুমার মজুমদার। “

“এর সঙ্গে শেষ পাতের ফির্নি ?”

“সেজন্যে তো আবার আমিনিয়াতে ফিরে যেতে হবে ভাই। ফির্নির বাটি উল্টো করে দেখিয়ে দেবে কতো ভালো জমেছে। তবে না! “

এই সময় পর্দা সরিয়ে সুমিতা ঘরে ঢুকে বললো “লাঞ্চ টাইম। খাবার দিচ্ছি।“

“কি আছে ম্যাডাম ?”

“পেঁপের ঝোল আর ভাত।“

সুমিতা পেছন ফিরতেই অবিনাশবাবু বললেন “ওই মাগীর মাথায় ঢেলে দিতে হয় ওই পেঁপের ঝোল!”

“আহা, বড্ডো রেগে যাচ্ছেন।“

“রাগ হবে না?”

“ওর কি দোষ বলুন? গলব্লাডার অপারেশান করবার পাঁচদিনের মাথায় কি বিরিয়ানি দেবে নাকি? তাছাড়া বিরিয়ানি কোন হাসপাতালেরই পথ্য হিসেবে দেওয়া হয় না।“

————————————————————————————————————————————

প্রথম প্রকাশ ঃ ফেবু , ২৪-এপ্রিল-২০১৭

অনুগল্প ১ঃ পাগলা ভুত

“খুড়ো, তুমি ভুত দেখেছো ? “

শমীবুড়োর বয়েসের গাছ পাথর নেই। কেউ বলে নব্বই, কেউ বলে একশো। তবে নব্বই-ই হোক আর একশই হোক, এখনো রোজ লাঠি ভর দিয়ে কালীর মালের ঠেকে ঠিক চলে আসে। একসময় এই অঞ্চলের নামকরা লেঠেল ছিলো তো, তাই লাঠিটা এখনো হাতের বশে আছে। এক বোতল চোলাই খায় একা একা। তারপর দোকান বন্ধের সময় কালী বুড়োকে ধরে ধরে বাড়ী পৌঁছে দেয়।

“কি বললি – ভুত?”

“হ্যাঁ খুড়ো – ভুত। জমিদারের লেঠেল হয়ে তো অনেককেই ঠেঙিয়ে মেরেছো, তাদের মধ্যে কেউ ফিরে আসে নি? তোমার ঘাড়টা মটকে দিতে?”

হাসলো শমীবুড়ো। ফোকলা দাঁতে। “দূর শালার পো – আমার ঘাড় মটকাতে আসবে কোন হারামির বাচ্চা রে? তবে কিনা…”

“তবে কিনা কি?” ছেলেপিলের দল ঘিরে ধরলো শমীবুড়োকে। কাজ কম্ম কিছু নেই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে, একটু জমাটি আড্ডা না হলে চলবে কেমন করে ?

“না, মানে এক ব্যাটা সম্বন্ধীর পো ফিরে এসেছিলো। কিন্ত সে শালা ভুত কিনা কে জানে।“

“মানে?”

শমীবুড়ো একটু গম্ভীর হলো। চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। এই সময় কালী একটু কিছু দিয়ে যায় – মুড়ি, চানাচুর, তেলেভাজা, যাই হোক। সেই একগাল চানাচুর মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললো বুড়ো

“তবে শোন। সেই বন্যার পরের বছর – যেবার ভূমিকম্পও হয়েছিলো পরে, সেই বছর একটা লোককে পিটিয়েছিলুম খুব। জমিদারবাবু বলেছিলো। শালা নাকি কি সব ধম্মের নামে বলছিলো – আমাদের বামুনঠাকুররা সেই নিয়ে নালিশ কল্লে জমিদারবাবুর কাছে। আমাদের কত্তামশাইএর তো দেবদ্বিজে খুব ভক্ত, অমনি তেড়ে মেড়ে উঠলেন। লোকটাকে ধরে এনে গাঁয়ের মধ্যে ওর বিচার হলো। কথা হলো ওকে গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। আর আমাকে কত্তামশাই আলাদা করে কাজ দিলেন – শয়তানের শেষ রাখবি না। রাখিও না। ব্যাটাকে দুর্দান্ত পিটলাম, তারপর ওই যে কাঠের ইলেকটিরির থাম আছে, তার গায়ে টাঙিয়ে দিলুম। পরে রাতের দিকে শালাকে নামিয়ে একটা গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে দিলাম। “

“তারপর ?”

শমীবুড়ো গেলাসে বড়ো চুমুক দিলো। তারপর বললো
“পরে ভাবলুম গোর দেওয়াটা ঠিক নয়, ব্যাটাকে পুড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। তা দুদিন পরে গিয়ে ওই যেখানে গোর দিয়েছিলাম, সেখানে খুঁড়তে গিয়ে দেখি লাশ হাওয়া !”

“বলো কি?”

“তবে আর বলছি কি! ব্যাপারটা কি হলো ভাবতে ভাবতে এই কালীর দোকানে এসে একটু বসেছি, দেখি কি সেই লোকটা কোত্থেকে এসে পড়েছে। মাথায় রক্তের দাগ, আমি যে ওকে টাঙিয়ে রেখেছিলাম, তার দাগ হাতে।“

“কি সব্বোনাস! তারপর ? কি করলো সে?”

“কিছুই না। আমার কাছে এসে হাসলো। আমার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর ওপর দিকে মুখ তুলে বললো “ওর দোষ ধরো না ঠাকুর। ও জানে না ও কি করছে।“

“এতো মরে ভুত হয়ে পাগলা হয়ে গেছে। হে হে হে হে পাগলা ভুত।“ ভিড়ের থেকে কে যেন বলে উঠলো।

“তা খুড়ো, এই লোকটার নাম কি ছিলো?”

“নামটাও  আজব। কিস্টো।“

“কি ? কেষ্ট ?”

“না না। কেষ্ট নয়। কিস্টো। কিস্টো।“


প্রথম প্রকাশ ঃ ফেবু – ১৪-এপ্রিল-২০১৭; গুড ফ্রাইডে