পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা – ৬

ষষ্ঠ পর্বঃ পিন ভ্যালীতে একটি চমৎপ্রদ রাত্রি

পিন ভ্যালীর এই মাড ভিলেজে থাকবার বেশী জায়গা নেই। যে জায়গাটা সব থেকে জনপ্রিয় – বলতে পারেন অন্তর্জালে যার প্রায় একছত্র আধিপত্য – তার নাম “তারা হোম স্টে”।

06 Pin Valley 2

পিন উপত্যকা – সবুজের সমারহ

06 Pin Valley 3

পিন ভ্যালী যাবার পথে

এখন আবার হোম স্টেতে থাকার একটা হামলে-পড়া রেওয়াজ হয়েছে। হোম স্টেতে লোকাল খাবার না খেলে ও তার ড্রাই টয়লেট – যাকে আমাদের দাদু-দিদিমারা “খাটা পায়খানা” বলতেন, সেখানে প্রাতঃকৃত্য না সারলে আপনি পর্যটক হিসেবে সমাজে নাম কিনতে পারবেন না। তবে বাকিদের আওয়াজ দিয়ে আর কি হবে, আমরাও দু জায়গায় হোম স্টে বুক করবার চেষ্টা করেছিলাম – একটা লাংজায়, অন্যটি এই মাড গ্রাম। মাড গ্রামে আমরা ওই “তারা হোম স্টে” পাই নি, আমাদের বুকিং হয়েছে “পিন পার্বতী গেস্ট হাউস”এ। আমাদের ইনক্রেডিবল স্পিতির বিশেষবাবু অবশ্য বলে দিয়েছিলেন যে “পিন পার্বতী” হোটেলটির মধ্যে একমাত্র “হোটেল-সুলভ” ব্যাপার হচ্ছে এতে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের এট্যাচড বাথ রয়েছে – এ ছাড়া অন্য সব দিক থেকে একে হোম স্টে বলেই ধরে নিন। এর থেকে যা বুঝবেন, বুঝুন। আমরা অবশ্য এই বুঝেছিলাম যে একটা অখাদ্য হোটেল হতে চলেছে। সেই তুলনায় এখানে পৌঁছে দেখলাম হোটেলটা কিন্তু মোটেই মন্দ নয়। ঘরগুলো বড়ো, বাথরুম বড়ো এবং পরিষ্কার, তাতে গিজার আছে – সে গিজার চলেও বটে। বিছানার চাদরও পরিষ্কার, তার ওপর মোটা রেজাই দেওয়া। আর কি চান মশাই?

(এই ফাঁকে চুপি চুপি বলে রাখি, আমাদের গ্রুপের একজন – তার নাম বলা বারণ – সে হোটেলের বিছানার চাদরের ওপর পাতবার জন্যে বেডশীট কিনেছিলো মানালি থেকে। শেষ অব্দি পেতেছিলো কিনা তা অবশ্য জানা নেই।)

06 Pin Valley Hotel

বাঁদিকে আমাদের হোটেল, ডাইনে “তারা হোমস্টে”

হোটেলে দেখলাম ওসব রেজিস্ট্রার-মেজিস্টারের পাট নেই। একটা রোগা খেঁকুরে মতন লোক সোনুকে জিগ্যেস করলো আমরাই ‘তারা’ কিনা। তারপর সরু সিমেন্টের আধ-তৈরি রেলিংবিহীন সিঁড়ি দিয়ে হুস-হাপুস করতে করতে আমাদের মালপত্তর ওপরে তুলে দিলো। তারপর সেই দৌড়ে গেলো কিচেনে – চা বানাতে। মানে রিসেপশানিস্ট কাম ওয়েটার-কাম-কুক-কাম-সবকিছু ইনিই। স্যাটাবোস-গুড়বেড়িয়া-ন্যাটাহরি-জুনো-মার্কোপোলো – সব একই দেহে রামকৃষ্ণ হয়ে গেছে।

চা খেতে খেতেই এই খেঁকুরে লোকটা (তার নাম ততক্ষনে জেনে ফেলেছি – গোপাল) জিগ্যেস করলো কখন ডিনার নেবো। কি আছে ডিনারে জিগ্যেস করে জানলাম মেনুটি বিলকুল বাহুল্যবর্জিত – ভাত, রুটি, বাঁধাকপির তরকারি আর ডাল। আগের রাত্তিরেই অমন উমদা তিব্বতী ডিনারের পর একটু মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগলো। জিগ্যেস করলাম

“চিকেন মিলেগা ?”

“আপ লোগোন কি তো ভেজ মিল বুক কিয়া হুওা হ্যাঁয়…“

“আরে, হাম অলগ সা পায়সা দে দেঙ্গে। মিলাগা? “

গোপালবাবু তাও গোঁজ মেরে থাকে। বুঝলাম যে এসব বাড়তি বখেড়া নেওয়া তার চরিত্র-বিরোধী। আরেকটু পেড়াপেড়ি করাতে জানা গেল যে মুরগী নেই এবং এখানে পাওয়াও সম্ভব নয়। “মালিক গিয়া হ্যাঁয় কাজা। উহ আগার মুরগী লেকে আয়া রাত তক – তো হম জরুর বানা দেঙ্গে। উসমে ক্যা হ্যাঁয়? দস মিনিট হি তো লাগতা হ্যাঁয়!!“

দশ মিনিটে মুরগী রান্না? বলে কি রে এ ! যাক গে, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম এখানে ঘুরে দেখার খুব একটা কিছু নেই, তায় আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। সামনের পাহাড়টায় নাকি বরফ পড়ে শীতের সময় বরফের সুন্দর ঢাল তৈরি হয় আর এখানকার লোকেরা সেখানে স্কি করে। শীতে হয়তো হতেও পারে, এখন তো দেখলাম নিছক সবুজ পাহাড়। পিন ভ্যালী তো আবার ন্যাশনাল পার্ক, সেখানে তো নাকি সাইবেরিয়ান আইবেক্স (আচ্ছা – বলছে সাইবেরিয়ান, এদিকে পিন ভ্যালীতে পাওয়া যায় কেন? এতো মশাই হায়দ্রাবাদের মশহুর বেকারীর নাম ‘করাচী বেকারী’ কেন গোছের কেস!)আর স্নো লেপার্ড থাকে বলে শুনেছি – তারাই বা কোথায়? খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও তাদের দেখা পেলাম না, উল্টে ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে ভিজে আমার ১২টা প্রমাণ সাইজের হাঁচি হলো। অতএব ঘরের ছেলে গুটিগুটি গোপালবাবুর হোটেলে।

06 Pin Valley 4

বাঁদিকে “তারা হোমস্টে”

06 Pin Valley

হোটেলের সামনে পাহাড় আর ভেড়ার পাল

একটু বাদে আমরা সবাই একটা ঘরে বেশ জমিয়ে বসেছি। তাস, বৃদ্ধ-সন্ন্যাসী, ব্লু-টুথ স্পিকারে মৃদু কিশোর, কম্বলের তলায় পা – ঠিক যেরকমটি হওয়া উচিৎ আর কি। এমন সময় সুগতা ঘুরে এসে বললো “ব্যাপারটা রহস্যজনক।“

রহস্য? কিসের রহস্য? এদিকে দু নম্বর পেগ চলছে, ২১-এর ডাক – ডবল দেবো কিনা ভাবছি, এই মহেন্দ্রক্ষণে এসব আবার কি কথা! জিজ্ঞ্যেস করলাম “কি আবার রহস্য?”

সুগতা গিয়েছিলো গোপালবাবুর খোঁজে – যদি তাকে একটু পটিয়ে পাটিয়ে আলুভাজা বা পকোড়া বানাতে উদ্বুদ্ধ করা যায় দেখতে। “সে তো এককথায় না বলে দিলো। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম – সে রুটি বেলছে।“

রুটি বেলছে ? এতে আবার কি রহস্য রে বাবা!! বৌদের কল্পনাশক্তি নিয়ে যখন একটা তির্যক মন্তব্য করতে চলেছি, সুগতা ঝাঁঝিয়ে উঠলো

“আঃ !! ব্যাপারটা ভালো করে বোঝ। আমরা বলেছি আমরা রাত ন’টা নাগাদ খাবো। এখন বাজে সোয়া সাতটা। ও এখন থেকে রুটি করে রাখছে কেন?”

পয়েন্ট। লালমোহনবাবুর ভাষায় “হাইলি সাসপিশাস”। শার্লকসাহেব এইরকম সব ব্যাপার থেকে অনেক কিছু বের করে ফেলতেন বটে, আমরা অনেক ভেবেও কিছুই  পেলাম না। শুধু মনটা খচখচ করতে থাকলো।

ঘণ্টাখানেক বাদে একবার রান্নাঘরে দিকে উঁকি মারলাম। দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই,   রান্নাঘরের বাইরে থেকে হুড়কো টানা, ভেতরে একটা মৃদু আলো। হুড়কো খুলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম উনুনে খুব কম আঁচে কিছু একটা চাপানো আছে। বাইরে এসে এদিকে-সেদিকে-ওপরে-নীচে-ডাইনে-বাঁয়ে সব তন্নতন্ন করে খুঁজে বুঝলাম আমাদের গোপালবাবু হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন। বিলকুল গায়েব।

এরপর আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর রান্নাঘরে চক্কর লাগাতে থেকেছি (বাকিরা তাস খেলে চলেছে)। এই করতে করতে যখন সাড়ে ন’টা বেজে গেলো, তখন একটা টর্চ নিয়ে রীতিমত তদন্ত করতে বেরোলাম। গেলো কোথায় লোকটা ?

বাইরে তখনো ঝিরঝির, রাস্তায় ম্লান আলো, পথঘাট একেবারে জনশূন্য। হোটেলের সামনের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে দেখলাম রাস্তার একপাশে একটা বড়ো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আলো জ্বলছে, গান বাজছে আর তার পেছনের ডিকি খোলা। সেখানে জনাকয়েক লোক জটলা পাকিয়ে হই-হুল্লোড় করছে – মনে হলো ড্রাইভার শ্রেণীর লোকজন হবে। সেদিকে এগোতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখলাম তার মধ্যেই একটি রোগামতন লোক টলমল পায়ে আমাদের দিকেই আসছে।

রোগা লোকটা টলমল-কেষ্ট-মুখার্জি সম্পূর্ণ মাতালপায়ে আমার পাশ দিয়ে গিয়ে হোটেলের বাইরের রেলিঙের দরজা খুলে সটান ভেতরে ঢুকে পড়লো। দেখলাম হোটেলের বাইরের বাগানে একটি টয়লেট আছে এবং সেই টয়লেটের বাইরে একটা বেশ পরিচ্ছন্ন বেসিন রয়েছে। কিমআশ্চর্যপরম – সেই বেসিনে একটি গেলাসে আবার  টুথব্রাশ-টুথপেস্ট রাখা রয়েছে। রোগাবাবু সেই বেসিনের সামনে গিয়ে টুথব্রাশ নিয়ে তাতে টুথপেস্ট লাগিয়ে দাঁত মাজতে বসলো।

বাপ-রে-বাপ – সে কি ভীষণ দাঁতমাজা!! চলছে তো চলছেই। আমাদের ছোটবেলায় আমার ছোটমামা আমাদের তিন ভাই-বোনকে দাঁতমাজা শেখাবার চেষ্টা করতো – একেকদিক দেড়-মিনিট করে, তারপর সামনের দাঁত একমিনিট, রোল করে করে। এই লোকটা নির্ঘাত আমার ছোটমামার কাছে দাঁতমাজা শিখেছিলো আর ডিসটিংশন নিয়ে পাস করেছিলো – নইলে মাতাল অবস্থাতেও কেউ এতো মন দিয়ে দাঁত মাজে নাকি! আমি তার মুখে আলো ফেললাম – তাতে তার বোধহয় আরো সুবিধেই হলো – আরো জমিয়ে দাঁতমাজা চললো।

একসময় এই দন্তমর্জন পর্ব শেষ হলো আর এই রোগা-কেষ্টবাবুকে পাকড়াও করলাম। দেখলাম তিনি আমাদের গোপালবাবুকে চেনেন। আমাদের কথা শুনে তিনি এই বেসামাল অবস্থাতেও সিঁড়ি ভেঙে রান্নাঘর ইন্সপেক্ট করতে এলেন। দেখেটেখে বললেন “আমি আসছি” বলে কোথায় যেন গিয়ে একজন স্যাঙ্গাৎকে যোগার করে আনলেন। সেই স্যাঙ্গাৎএরও অবস্থা তেমন সুবিধের বলা চলে না – তিনিও বেশ টলটলায়মান অবস্থাতেই আছেন দেখলাম।

রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এই দুই নাম-না-জানা মদ্যপ ভদ্রলোক টলমল হাতে পরম যত্নে আমাদের রাতের খাবার বেড়ে আমাদের খেতে বসালো। গোপালবাবু রান্নাটা করেই গিয়েছিলেন, কাজেই এঁদের রান্নাটা আর করতে হয় নি। তবে আমাদের খাওয়া শেষ অব্দি এঁরা ছিলো, তারপর বাসন তুলে টেবিল মুছে তারপর গিয়েছিলো।  জানলাম এঁরা আসলে কাজ করেন “তারা হোমস্টে”তে। কিন্তু এইটুকু জায়গা বলে একে অপরকে সাহায্য করাটা এঁরা এদের কর্তব্য বলেই মনে করেন।

আজকের কমপিটিশন-এর যুগে এই পারস্পরিক সহযোগিতাটা কল্পনা করতে কিঞ্চিৎ অসুবিধেই হয়। এঁরা আবার সকালের বেড-টি কখন খেতে চাই জেনে নিয়েছিলেন এবং পরদিন ভোরবেলায় একটি ছোকরা এসে সেটা দিয়েও গিয়েছিলো সময়ের আগেই। একটু বাদে “তারা হোমস্টে”র ওই রোগা-কেষ্ট বাবু এক ভদ্রমহিলাকে বগলদাবা করে নিয়ে এলেন এবং তাঁর সহায়তায় গরম গরম অতি উত্তম আলু-পরোটা আর চা বানিয়ে প্রাতঃরাশ করালেন। গোপালবাবু সকালেও নিখোঁজ, তাই পয়সাকড়ি রোগা-কেষ্ট বাবুকেই দিয়ে এলাম (অবশ্য পেমেন্ট করাই ছিলো, শুধু বিকেলের চা-বিস্কুটের পয়সা)। গোপালবাবু কোথায় খোঁজ করাতে উদাসভাবে বললো “সে বোধহয় কাল রাত্রে আপনাদের জন্যে মুর্গি কিনতে গিয়েছে”।

এইরকম একটি অম্লমধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে মাড গ্রাম ত্যাগ করলাম। বেরোবার আগে এককাপ চা খাবো বলে গরম জলের খোঁজ করতে গিয়েছিলাম (টি-ব্যাগ আর কাপ সঙ্গেই ছিলো), দেখলাম একটি ছেলে রান্নাঘরের সামনে বসে আছে। তার কাছে গরমজল চাওয়াতে সোৎসাহে সে রান্নাঘর খুলে জল গরম করে দিলো। চা বানিয়ে দেবে কিনা, তাও জিগ্যেস করেছিলো – আমরা আর উৎপাত করি নি। যাবার সময় জিগ্যেস করলাম যে সেও “তারা হোমস্টে”র কর্মচারী কিনা – শুনলাম সে নাকি একজন মিস্তিরি – এই হোটেলে সিমেন্টের কাজ করতে এসেছিলো। আজ সকালের বাস পায় নি বলে বসে আছে।

আমরা চললাম কাজা হয়ে হিকিম-কমিক-লাংজার পথে। পেছনে পড়ে রইলো মাড গ্রাম নামক সেই আশ্চর্য যায়গাটা – যেখানে সম্পূর্ণ মাতাল অবস্থাতেও এক  হোটেলের কর্মচারী তার পাশের হোটেলের গেস্টদের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয় আর সিমেন্টের মিস্তিরি অবলীলায় গেস্টদের চা বানিয়ে দেয়।

06 Pin Valley Monastry

পিন ভ্যালী মনাস্ট্রি – এটা দেখেছিলাম পরদিন

না মশাই – এরা কেউ কোন বাড়তি পয়সা নেয় নি। এদের নামও জানা হয় নি। কি হতো জেনে? এরা যে জগতের লোক, আমরা তার থেকে অনেক দুরের জগতে বাস করি।

(চলবে)

————————————————

উত্তরকথনঃ

গোপালবাবু মুর্গি কিনতে সত্যিই রাতের অন্ধকারে ৫০ কিলোমিটার দূরে কাজাতে গিয়েছেন কিনা কে জানে! তাঁর দশমিনিটের মুর্গীটা এযাত্রা বাদ পড়লো।

3 Comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s