পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ২

ভোর সাড়ে পাঁচটায় তৈরি হয়ে মাল-পত্র-আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে হুড়ুম-দুড়ুম করে উঠে পড়লাম গাড়িতে।

ব্যাপারটা যেরকম এক লাইনে লিখলাম, তত সহজে হয় নি কিনতু। কারণ আমরা দুটি পরিবার, আর টিপিক্যাল বাঙালীদের মতো মেলাই জিনিস নিয়ে বেরিয়েছি।

সোনু, যে এই যাত্রায় আমাদের ড্রাইভার, সে গাড়ি নিয়ে ভোর পাঁচটা থেকে তৈরি বসে আছে। এই অঞ্চলে সোনু নামটা অনেকটা আমাদের বাংলার “গোপালের মা” অথবা “রামু”র মতন। একসময় অধিকাংশ বাঙালী বাড়ির পুরুষ কাজের লোক মাত্রেই রামু, আর মহিলা কাজের লোক মানেই সে গোপালের মা – তাদের আসল নাম যাই হোক না কেন। এ অঞ্চলেও এতো ড্রাইভারের নাম সোনু যে সন্দেহ হয় যে এটা নাম নয়, একটা পদ বা উপাধি। খোঁজ করলে হয়তো বেরোবে তার আসল নাম পদ্মলোচন কিম্বা বজ্রপাণি !!

আমাদের সোনুর নাম আসলে পদ্মলোচন কিনা, এই গুরুতর খোঁজটা নেওয়া হয়ে ওঠে নি, কারণ গাড়িতে চড়ামাত্র সোনু বিনা-খেজুরেই সটান গাড়ি চালু করে দিয়েছিলো। এইসব অঞ্চলে লম্বা জার্নি করতে হলে যথাসম্ভব ভোরে বেরোতে হয়। তার একটা কারণ ট্র্যাফিক (অনেক রাস্তাই সিঙ্গল লেন, তাই অপেক্ষা করতে হয়), আরো গুরুতর কারণ হলো অনেক রাস্তার ওপর দিয়েই ঝর্নার জল বইতে থাকে। একটু বেলা বাড়লে গ্লেসিয়ারের বরফগলা জল পেয়ে এইসব শীর্ণকায়া জলধারারা বেশ ডাগর-ডগর হয়ে ওঠে এবং বাহনচালকদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যাচ্ছি কাজা – দশ ঘণ্টার পথ, বেশী বই কম নয়। এবং এই রাস্তায় এরকম পথের ওপর বহতি ঝর্ণা কম করে দশটি আছে বলে শুনেছি।

এই যাত্রায় আমি আর অমিত আমাদের পরিবারবর্গ নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছি। অমিতের বউ সুগতাও আমার কলেজের বন্ধু, কাজেই সে শুধু বন্ধুপত্নীই নয়, বন্ধুনিও বটে। আমরা দুজনে কলেজজীবনে নিয়মিত বেড়াতে যেতাম আরো কিছু বন্ধুদের সঙ্গে, আর সেই সব ট্যুরের ব্যবস্থাপনা আমাদের হাতেই থাকতো। এই ব্যাপারে আমাদের খ্যাতি এতোটাই ছিলো যে আমাদেরকে ঠাট্টা করে “দে-চক্রবর্তী ট্রাভেলস” বলা হয়ে থাকতো। এই পুরো যাত্রাতেও দে-চক্রবর্তী ট্রাভেলস সাংগঠনিক দায়িত্বে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছে (এ ব্যাপারে আমাদের বউদের মতামত কিছুটা আলাদা, কিন্তু আমরা ওইধরনের অল্ট-ফাক্টসকে পাত্তা দিই না; আপনারাও দেবেন না একদম)।

সকালে হুড়ো-তাড়ায় চা জোটে নি, তাই ড্রাইভার সাহেব গাড়ি থামালেন “কোঠি” বলে একটা সুন্দর জায়গায়। কোঠি বললেই আপনাদের আবার ঘুঙুরের আওয়াজ, নূপুরের নিক্কন, গহরজানের গজল, কাজল চোখ এসব মনে পড়ে যাবে, কিনতু এ কোঠি সেই কোঠি নয় মশাই। এটা হলো মানালি থেকে রোটাং যাবার পথে শেষ লোকালয়। এখানে কয়েকটা হোটেল আছে, রেস্তোরাঁগুলোও বেশ ঝাঁ-তকতকে – একটা ট্যুরিস্টি পালিশ আছে। মানালির ট্যুরিস্ট ট্যাক্সিরা যে আশেপাশের “পয়েন্ট” দেখতে নিয়ে যায়, এটা তার অন্যতম।

কোঠিতে হাফব্রেকফাস্ট (“বেশী খাবেন না, সামনে রাস্তা খারাপ) খেয়ে এবং তাদের ঝকঝকে বাথরুম ব্যবহার করে আবার বেরিয়ে পড়া গেলো। রাস্তায় পরপর এলো “গোলাবা” (সুন্দর জায়গা, তবে এখানে একটা পুলিশ চেকপোস্ট আছে, তাই লম্বা লাইন পড়ে; মূর্তিমান রসভঙ্গ), “রাহানা ফলস”, সবুজ পাহাড়ে মোড়া “মারহি” আর তারপর “রানী নাল্লা” (যেখানে, মানালির ট্যুরিস্ট গাইডবুক অনুযায়ী, একটি হিমবাহ আছে, তাই সারা বছর বরফ থাকে। আমরা অবশ্য বরফ-টরফ কিছু দেখতে পাই নি, শুধু একটা সরু মতন ঝর্ণা আর তার সামনে গাড়িতে একটি মারুতি ভ্যানে “মোবাইল ম্যাগি সেন্টার” দেখতে পেলাম)। এরপর সটান সোজা ওপরে উঠেই রোটাং পাস – মানালির সমস্ত ট্যুরিস্টরা যেখানে হামলে পড়ে মোক্ষ লাভ করে থাকে। সব পথ এসে মিলে যায় শেষে।

রোটাং পাস পিরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণীর অংশ এবং এই অঞ্চলের প্রাচীনতম পাসগুলির একটি। এই পাস পার করা মানেই আমরা বিপাশা-প্লাবিত কুলু উপত্যকা ত্যাগ ঢুকে পড়লাম চন্দ্রভাগা-স্নাত লাহুল উপত্যকায় এসে পড়লাম। মনু-বশিষ্ঠ-রঘুনাথজিদের এলাকা ছেড়ে বন-বুদ্ধ-লামাদের এলাকা শুরু হলো আর কি।

এই রোটাঙের পরের রাস্তাটার নাম মানালি-লেহ হাইওয়ে – এটা চলে গেছে লাহুল প্রদেশের হেড-কোয়ার্টার কেয়লং হয়ে লাদাখ প্রদেশের হেড-কোয়ার্টার লেহ-তে। কার্গিল যুদ্ধের পর থেকেই এই রাস্তাটি মিলিটারির লোকেদের একটি বিকল্প সড়ক হয়ে ওঠে; প্রচুর মিলিটারি ট্রাক চলে এই রাস্তায়। তাছাড়া লাহুলের সাধরণ লোকেদের কাছেও এই রাস্তাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে ক’মাস এটা খোলা থাকে, সেই সময় লাহুল/স্পিথির লোকেরা তাদের সামান্য যেটুকু চাষের ফসল, সেটুকু নিয়ে আসে কুলুর বাজারে। যে ৮.৮ কিলমিটারের টানেল তৈরি হচ্ছে দেখলাম – যেটা রোটাং পাসকে বাইপাস করে দিয়ে সোজা মানালি-লেহ হাইওয়েতে উঠবে – সেটা হয়ে গেলে এ ব্যাপারে সুবিধে হবে নিশ্চয়ই।

লাদাখের স্থানীয় ভাষায় (ভোটি ভাষায়) রোটাং মানে শবদেহের স্থুপ ! ১৩০০০ ফিটের উচ্চতা, অক্সিজেন-স্বল্পতা, বরফপাত, মৃত্যুর ছায়া – সব মিলিয়ে রোটাং ঘিরে ট্যুরিস্টদের এই আকর্ষণ তৈরি করেছে। আমরা গিয়েছিলাম জুলাই মাসের শেষে, তখন বরফ নেই এবং হামলে পড়া ট্যুরিস্টরাও নেই। দেখতে ভালোই লাগলো, কিনতু প্রথমবার দেখে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম, সেই মুগ্ধতাটা আর খুঁজে পাই নি। একসময় বলা হতো রোটাং নাকি ইরাবতী নদীর উৎস (কেউ কেউ বলতো বিপাশা নদীর উৎস) – এখন তো শুনি এটা নাকি বিলকুল একটা “জুমলা” – একটা টক-ঝাল-মিষ্টি ট্যুরিস্টি গল্প মাত্র।

রোটাং পাসে যাবার এবং রোটাং পেরোবার পরের রাস্তাটা যায় সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে, সেখানে মেঘেরা এসে লুকোচুরি খেলে যায় যখন তখন। এই মেঘ, এই কুয়াশা, এই একটু বৃষ্টি আর পাশে খাদ পেরিয়ে পাশের পাহাড়ের সবুজ, তাকে বেয়ে উঠেছে সরু সুতোর মতো পাকমারা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে এঁকেবেকে চলতে চলতে এসে পৌঁছলাম গ্রাম্পু বলে একটা জায়গায়। এইখান থেকে ডাইনে মোচড় মেরে একটা সরু-ভাঙ্গাচোরা-নেইরাস্তা ধরে আমরা চললাম লাহুলের পথে। মানালি-লেহ হাইওয়েতে চলে গেল – ঠিক ধরেছেন – লেহ-লাদাকের দিকে।

নেইরাস্তা না নেইরাস্তা। একে সরু, একপাশে খাড়া খাদ, আর রাস্তাটা অজস্র ছোট-বড় বোল্ডারে মোড়া, তাতে গাড়ির চারটে চাকা একসঙ্গে মাটিতে প্রায় থাকেই না। আর সারা রাস্তা সে কি মারাত্মক ঝাঁকুনি আর ঝটকা! পেছনের সিটে কিছু মালপত্র রাখা হয়েছিলো – সেগুলো, খাবারের ব্যাগ, ওষুধের (এবং টয়লেট পেপারের) ব্যাগ বাসের মেঝেতে পড়ে প্রথমে গড়াগড়ি, পরে বহতি নদীরে মতো কখনো সামনে, কখনো পেছনে চলে বেড়াচ্ছে। আমরা সকলেই আলাদা আলাদা সীটে বসে সামনের সীটের পেছনের হাতল প্রানপনে চেপে ধরে আছি আর বাসটা তার প্রবল ঝটকায় কখনো আমাদের মেঝেতে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে, কখনো বা গদাম করে বাসের দেয়ালে আছাড় মারছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মন্দ লাগছিলো না – নিজেকে বেশ রাণা প্রতাপ মনে হচ্ছিলো – যেন চেতকের পিঠে চড়ে হলদিঘাটির পাহাড়ি রাস্তা ধরে যুদ্ধে যাচ্ছি। মুখের ভাবটা সেরকমই করে রেখেছিলাম, হাতের মাসলও বেশ ফুলিয়ে রেখে পোজ দিচ্ছিলাম আগাগোড়া । আমার বউ আর বন্ধুনি অবশ্য বিশ্বনিন্দুক, তাদের মতে আমাকে নাকি আসলে লালমোহনবাবুর মতো দেখাচ্ছিলো। আমি অবশ্য ওসব একদম গায়ে মাখি না – কারুর যদি সাধরণ কল্পনাশক্তিই না থাকে তো আমি আর কি করতে পারি।

এদিকে বাইরের দৃশ্যাবলী বদলে গিয়েছে। পাহাড়ের সবুজ দাড়ি কেউ শক্ত ব্লেডে অযত্নে, এবড়ো-খেবড়ো ভাবে কামিয়ে দিয়েছে – বাইরের পাহাড় তাই রুক্ষ ও কঠোর। ছাই আর খয়েরি রঙের পাহাড়ের প্রকৃতিও বেশ অদ্ভুত – কেমন যেন পাথরগুলো গুঁড়ো হয়ে পাহাড় বানিয়েছে মনে হয়। একটু বাদে কোথা থেকে চন্দ্রা নদী এসে আমাদের পাশে পাশে চলতে লাগলো। এই চন্দ্রা নদী হলো চন্দ্রভাগার “চন্দ্র”; এর সঙ্গে “ভাগা”-র দেখা হয় কেয়লংএর কাছে তান্ডি বলে একটা জায়গায়, যেটা আমাদের যাবার রাস্তায় পড়বে না। চন্দ্রভাগার মতো মিষ্টি নাম কোন বেরসিকের হাতে পড়ে চেনাব হয়ে গেছে – যাকে বলে ঘোর রসভঙ্গ।

 

02 Lahul (2)
02 Lahul
এভাবে নাচতে নাচতে, ঝটকা খেতে খেতে, রাণা প্রতাপ হতে হতে পৌঁছে গেলাম ছত্রু বলে একটা জায়গায়। ছোট্ট জায়গা, চন্দ্রা নদীর কুলে, পাশে একটা ভারী মনোরম লোহার ব্রিজ আছে, যার গায়ে অজস্র পতাকা লাগানো – এখানকার তিব্বতি রীতি অনুযায়ী। আর আছে অত্যন্ত জনপ্রিয় চন্দ্রা ধাবা, প্রায় সবাই সেখানে বাকি-আধখানা-ব্রেকফাস্ট সারবার ভিড় করে। খাবারের বৈচিত্র তেমন নয় – আলু পরোটা – ম্যাগি – ওমলেট ইত্যাদি কিন্তু প্রত্যেকটাই অত্যন্ত সুস্বাদু। খাওয়াটা বেশীর দিকেই হয়ে গেলো।
02 Chatru - Chandra Dhaba02 Chatru (old)
ছত্রু জায়গাটা ট্রেকারদের কাছেও জনপ্রিয়। যারা মানালি-হামটা পাস-চন্দ্রতাল ট্রেক করে, তারা হামটা পাস পেরিয়ে ইন্দ্রাসন পর্বতের সামনে দিয়ে (ইন্দ্রাসন – কি সুন্দর নামটা!) এই ছত্রুতেই এসে পড়ে। ট্রেকিংয়ের রাস্তা নদীর ওপার দিয়ে, এখানেই ট্রেকাররা তাঁবু খাটায় – এপারে আসে খাওয়াদাওয়া করতে এবং রসদ কিনতে। আমি কোনদিন ট্রেকিং করি নি, কিন্তু এদের দেখতে বেশ লাগছিলো।
ছত্রুর পরে আবার সেই “পাগলা-ঘোড়া-ছুটেছে” স্টাইলে গাড়ি চলেছে। রাস্তা আরো খারাপ হয়েছে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বাতাল বলে একটা পুঁচকে জায়গা। কিন্তু তার আগে পার হতে হবে “ছোটা ধারা” বলে একটা গোলমেলে জায়গা, যেখানে অত্যন্ত খারাপ রাস্তাটার ওপর দিয়ে কুলকুল করে জল বয়ে যায়, প্রায় একটা ছোট ঝর্নার মতোই। সেই পথে চড়াই ভেঙে গাড়ি নিয়ে ওপরে যেতে হয়। রাস্তাটা আবার সিঙ্গল লেন, অর্থাৎ ছোট ছোট কনভয় করে একেকবারে হয় ওপরের গাড়িগুলো নামবে, নয় নিচের গুলো উঠবে। আমাদের ঠিক আগে যে নিচে নামার গাড়ির কনভয় নামছিলো, সেই গাড়িগুলো প্রায় সবই আটকে গেল। তারপর তার থেকে যাত্রীদের নামিয়ে, মাল নামিয়ে, পাথর সরিয়ে কোনক্রমে গাড়ি চালানো হচ্ছিলো। কাণ্ড দেখে আমাদের তো হৃৎকমল একেবারে ধুকুর-পুকুর। তবে দেখে ভালো লাগছিলো যে গাড়ি আটকে গেলে অন্য গাড়ির ড্রাইভাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসে সাহায্য করছিলো। নীচে নামার কনভয় পেরিয়ে গেলে আমাদের গাড়ির পালা এলো এবং এক ঝটকায় ওপরে উঠে গেলো। নইলে এই বরফগলা জলে জুতো খুলে আটখানা স্যুটকেস নিয়ে কি করতাম কে জানে!!
02 Chota Dhara
বাতালে পৌঁছলাম দুপুর নাগাদ। এখানে একটা নতুন পি-ডব্লিউ-ডির গেস্টহাউস রয়েছে, কিন্তু এই জায়গাটা বিখ্যাত এর চাচা-চাচি ধাবার জন্যে (যেটার আসল নাম চন্দ্রা ধাবা)। বোধ দর্জি এবং চন্দ্রা দর্জি (না, ধাবাটার নাম চন্দ্রা নদীর নামে নয়), যাদের স্থানীয় লোকেরা চাচা-চাচি বলে, তাঁরা চালান এই ধাবাটি। চাচা-চাচির ধাবা বিখ্যাত হয়ে যায় ২০১০ সালে, যখন আকস্মিক বরফপাতে একদল ট্যুরিস্ট বাতালে আটকা পড়ে যায়। বাতাল এমনিতেই জনমানবহীন এলাকা, আশেপাশে পঞ্চাশ কিলোমিটার অব্দি কিচ্ছু নেই, ফোন বা মোবাইল চলে না। খাবার সীমিত – আসে স্থানীয় বাস বা গাড়ির ড্রাইভারদের বদান্যতায়। এই অবস্থায় এই ট্যুরিস্টের দলকে চাচাচাচি থাকতে দিয়েছিলেন এবং খাবার দিয়েছিলেন – যতক্ষণ ওঁদের স্টক ছিলো, ততক্ষণ। এবং সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। পয়সা নিতে চান নি ওঁরা, কারণ বিপদের সাহায্যকে ওঁরা বিক্রি করেন না।
02 inside chacha chachi
সোনু গল্প বলছিলো। “ওই সময় আমিও আটকে গিয়েছিলাম। ছত্রুর এক কিলোমিটার আগে। গাড়ি রাস্তায় রেখে হেঁটে যেতাম ছত্রুর চন্দ্রধাবায়। সেখানেও পয়সা নেয় নি কেউ। আর যতক্ষণ খাবার ছিলো, আমাদের খাইয়েছে। বিনা পয়সায়। তারপর যখন খাবার ফুরিয়ে গেলো, তখন ওই ধাবার মালিক তার পোষা ভেড়া কেটে তার মাংস রান্না করে খাইয়েছিলো আমাদের। আমি এমনিতে নিরামিষাশী, কিন্তু সেদিন খেয়েছিলাম। নইলে ওই ঠাণ্ডায় বাঁচতাম না।“
দম নিলো সোনু। তারপর সিগারেটে টান দিয়ে বললো “এই পাহাড়ে শুধু চাচা-চাচি নয়, সব পাহাড়িরাই সাহায্য করে। নইলে আমরা কেউ বাঁচতাম না এতদিন।“
02 Batal Bridge
বাতাল থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে চন্দ্রতালের দিকে। আমরা সেদিকে যাবো না এখন, আমরা যাবো কুনজুম পাসের দিকে। চন্দ্রতালগামী ট্রেকাররা সচরাচর এখানে একটা স্টপ দেয়। আমাদের সঙ্গে একটা ট্রেকিঙের দলের সঙ্গে কথা হলো – প্রায় জনা কুড়ি কমবয়সী বিদেশিনী, এসেছে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে। এরা সকলেই হামটা পাস থেকে আসছে, এই অতিসাধরণ ছোট্ট ধাবায় বা তার পাশে রাত কাটিয়েছে। দেখে অবাক লাগলো, ভালোও লাগলো বেশ।
চাচাচাচির দোকানে একটু আলু পরোটা সাঁটাবার সুপরিকল্পনা করছি, এমন সময় সোনু এসে বললো, “ইয়হা লাঞ্চ মত কিজিয়ে। সামনে কুনজুম পাস – উঁচাইমে হ্যায়। রাস্তা আউর ভি খারাপ।“
বোঝো! অতএব শুধু চা।
পরবর্তী গন্তব্য কুনজুম পাস – যার মিষ্টি স্থানীয় নাম “কুনজুম লা”।
(চলবে)
———————————-
উত্তরকথনঃ
এই রাস্তায় উতরাই-চড়াই বেশ বেশী, তাই মাউন্টেন সিকনেসের ভয় থাকে। ইনক্রেডিবল স্পিতির বিশেষবাবু বিশেষ করে বলে দিয়েছিলেন প্রতি আধঘণ্টায় দুতিন ঢোক জল খেতে, আর মাঝে মাঝেই ফলের রস খেতে। আমরা এই পদ্ধতি মেনে বিশেষ উপকার পেয়েছিলাম। এছাড়া আমরা একটা জলের বোতলে ও-আর-এস বানিয়ে রেখেছিলাম, সেটাও এক চুমুক মাঝে মাঝে পালা করে খেয়ে নিতাম।
এতে একটা বাড়তি সুবিধে, মাঝে মাঝেই প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে হবে, ফলত ড্রাইভার গাড়ি থামাতে বাধ্য হবে। সেই ফাঁকে দুচারটে “তসবীর খিচবার” সুযোগও পাওয়া যাবে, বুঝলেন কিনা 😁

😁

7 Comments

  1. লেখাটি পড়তে গিয়ে ছবির মত সব ফুটে উঠছে চোখের সামনে..কি ভাল যে লাগছে! পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষায় রইলাম। 😊

    Like

    জবাব

  2. এই লেখাটা পড়ে মনে হচ্ছে ভ্রমণটা খুব রোমাঞ্চকর । যারা ভ্রমণ বিলাসী তারা এই লেখা পড়ে আকষি’ত হতে বাধ্য। আমি ও মনে হল ভ্রমণটা অনেক টা উপভোগ করলাম।

    Like

    জবাব

  3. জমাটি লেখা। এখানে সোনু আমার মতই প্যাসেঞ্জার, এখন আমরা অতনু ড্রাইভারের ‘কি জানি কিসের ডাকের’ চলবে-নামক ব্রেক নিচ্ছি পরবর্তী যাত্রার আগে। পাহাড়ের সবুজ দাড়ি, চন্দ্রা ধাবা, রানা প্রতাপের চরিত্রাভিনয়, নেইরাস্তা ইত্যাদি এনজয় করতে করতে এই ট্রিপটা মনোরম হয়েছে অতনু ভায়া তোমার ড্রাইভিং কলাকুশলতায়।

    Like

    জবাব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s