পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ২

দ্বিতীয় পর্বঃ কুনজুম লা এর পথে

ভোর সাড়ে পাঁচটায় তৈরি হয়ে মাল-পত্র-আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে হুড়ুম-দুড়ুম করে উঠে পড়লাম গাড়িতে।
 
ব্যাপারটা যেরকম এক লাইনে লিখলাম, তত সহজে হয় নি কিনতু। কারণ আমরা দুটি পরিবার, আর টিপিক্যাল বাঙালীদের মতো মেলাই জিনিস নিয়ে বেরিয়েছি।
 
সোনু, যে এই যাত্রায় আমাদের ড্রাইভার, সে গাড়ি নিয়ে ভোর পাঁচটা থেকে তৈরি বসে আছে। এই অঞ্চলে সোনু নামটা অনেকটা আমাদের বাংলার “গোপালের মা” অথবা “রামু”র মতন। একসময় অধিকাংশ বাঙালী বাড়ির পুরুষ কাজের লোক মাত্রেই রামু, আর মহিলা কাজের লোক মানেই সে গোপালের মা – তাদের আসল নাম যাই হোক না কেন। এ অঞ্চলেও এতো ড্রাইভারের নাম সোনু যে সন্দেহ হয় যে এটা নাম নয়, একটা পদ বা উপাধি। খোঁজ করলে হয়তো বেরোবে তার আসল নাম পদ্মলোচন কিম্বা বজ্রপাণি !!
আমাদের সোনুর নাম আসলে পদ্মলোচন কিনা, এই গুরুতর খোঁজটা নেওয়া হয়ে ওঠে নি, কারণ গাড়িতে চড়ামাত্র সোনু বিনা-খেজুরেই সটান গাড়ি চালু করে দিয়েছিলো। এইসব অঞ্চলে লম্বা জার্নি করতে হলে যথাসম্ভব ভোরে বেরোতে হয়। তার একটা কারণ ট্র্যাফিক (অনেক রাস্তাই সিঙ্গল লেন, তাই অপেক্ষা করতে হয়), আরো গুরুতর কারণ হলো অনেক রাস্তার ওপর দিয়েই ঝর্নার জল বইতে থাকে। একটু বেলা বাড়লে গ্লেসিয়ারের বরফগলা জল পেয়ে এইসব শীর্ণকায়া জলধারারা বেশ ডাগর-ডগর হয়ে ওঠে এবং বাহনচালকদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যাচ্ছি কাজা – দশ ঘণ্টার পথ, বেশী বই কম নয়। এবং এই রাস্তায় এরকম পথের ওপর বহতি ঝর্ণা কম করে দশটি আছে বলে শুনেছি।
এই যাত্রায় আমি আর অমিত আমাদের পরিবারবর্গ নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছি। অমিতের বউ সুগতাও আমার কলেজের বন্ধু, কাজেই সে শুধু বন্ধুপত্নীই নয়, বন্ধুনিও বটে। আমরা দুজনে কলেজজীবনে নিয়মিত বেড়াতে যেতাম আরো কিছু বন্ধুদের সঙ্গে, আর সেই সব ট্যুরের ব্যবস্থাপনা আমাদের হাতেই থাকতো। এই ব্যাপারে আমাদের খ্যাতি এতোটাই ছিলো যে আমাদেরকে ঠাট্টা করে “দে-চক্রবর্তী ট্রাভেলস” বলা হয়ে থাকতো। এই পুরো যাত্রাতেও দে-চক্রবর্তী ট্রাভেলস সাংগঠনিক দায়িত্বে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছে (এ ব্যাপারে আমাদের বউদের মতামত কিছুটা আলাদা, কিন্তু আমরা ওইধরনের অল্ট-ফাক্টসকে পাত্তা দিই না; আপনারাও দেবেন না একদম)।
 
সকালে হুড়ো-তাড়ায় চা জোটে নি, তাই ড্রাইভার সাহেব গাড়ি থামালেন “কোঠি” বলে একটা সুন্দর জায়গায়। কোঠি বললেই আপনাদের আবার ঘুঙুরের আওয়াজ, নূপুরের নিক্কন, গহরজানের গজল, কাজল চোখ এসব মনে পড়ে যাবে, কিনতু এ কোঠি সেই কোঠি নয় মশাই। এটা হলো মানালি থেকে রোটাং যাবার পথে শেষ লোকালয়। এখানে কয়েকটা হোটেল আছে, রেস্তোরাঁগুলোও বেশ ঝাঁ-তকতকে – একটা ট্যুরিস্টি পালিশ আছে। মানালির ট্যুরিস্ট ট্যাক্সিরা যে আশেপাশের “পয়েন্ট” দেখতে নিয়ে যায়, এটা তার অন্যতম।
কোঠিতে হাফব্রেকফাস্ট (“বেশী খাবেন না, সামনে রাস্তা খারাপ) খেয়ে এবং তাদের ঝকঝকে বাথরুম ব্যবহার করে আবার বেরিয়ে পড়া গেলো। রাস্তায় পরপর এলো “গোলাবা” (সুন্দর জায়গা, তবে এখানে একটা পুলিশ চেকপোস্ট আছে, তাই লম্বা লাইন পড়ে; মূর্তিমান রসভঙ্গ), “রাহানা ফলস”, সবুজ পাহাড়ে মোড়া “মারহি” আর তারপর “রানী নাল্লা” (যেখানে, মানালির ট্যুরিস্ট গাইডবুক অনুযায়ী, একটি হিমবাহ আছে, তাই সারা বছর বরফ থাকে। আমরা অবশ্য বরফ-টরফ কিছু দেখতে পাই নি, শুধু একটা সরু মতন ঝর্ণা আর তার সামনে গাড়িতে একটি মারুতি ভ্যানে “মোবাইল ম্যাগি সেন্টার” দেখতে পেলাম)। এরপর সটান সোজা ওপরে উঠেই রোটাং পাস – মানালির সমস্ত ট্যুরিস্টরা যেখানে হামলে পড়ে মোক্ষ লাভ করে থাকে। সব পথ এসে মিলে যায় শেষে।
 
রোটাং পাস পিরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণীর অংশ এবং এই অঞ্চলের প্রাচীনতম পাসগুলির একটি। এই পাস পার করা মানেই আমরা বিপাশা-প্লাবিত কুলু উপত্যকা ত্যাগ ঢুকে পড়লাম চন্দ্রভাগা-স্নাত লাহুল উপত্যকায় এসে পড়লাম। মনু-বশিষ্ঠ-রঘুনাথজিদের এলাকা ছেড়ে বন-বুদ্ধ-লামাদের এলাকা শুরু হলো আর কি।
 
এই রোটাঙের পরের রাস্তাটার নাম মানালি-লেহ হাইওয়ে – এটা চলে গেছে লাহুল প্রদেশের হেড-কোয়ার্টার কেয়লং হয়ে লাদাখ প্রদেশের হেড-কোয়ার্টার লেহ-তে। কার্গিল যুদ্ধের পর থেকেই এই রাস্তাটি মিলিটারির লোকেদের একটি বিকল্প সড়ক হয়ে ওঠে; প্রচুর মিলিটারি ট্রাক চলে এই রাস্তায়। তাছাড়া লাহুলের সাধরণ লোকেদের কাছেও এই রাস্তাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে ক’মাস এটা খোলা থাকে, সেই সময় লাহুল/স্পিথির লোকেরা তাদের সামান্য যেটুকু চাষের ফসল, সেটুকু নিয়ে আসে কুলুর বাজারে। যে ৮.৮ কিলমিটারের টানেল তৈরি হচ্ছে দেখলাম – যেটা রোটাং পাসকে বাইপাস করে দিয়ে সোজা মানালি-লেহ হাইওয়েতে উঠবে – সেটা হয়ে গেলে এ ব্যাপারে সুবিধে হবে নিশ্চয়ই।
 
লাদাখের স্থানীয় ভাষায় (ভোটি ভাষায়) রোটাং মানে শবদেহের স্থুপ ! ১৩০০০ ফিটের উচ্চতা, অক্সিজেন-স্বল্পতা, বরফপাত, মৃত্যুর ছায়া – সব মিলিয়ে রোটাং ঘিরে ট্যুরিস্টদের এই আকর্ষণ তৈরি করেছে। আমরা গিয়েছিলাম জুলাই মাসের শেষে, তখন বরফ নেই এবং হামলে পড়া ট্যুরিস্টরাও নেই। দেখতে ভালোই লাগলো, কিনতু প্রথমবার দেখে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম, সেই মুগ্ধতাটা আর খুঁজে পাই নি। একসময় বলা হতো রোটাং নাকি ইরাবতী নদীর উৎস (কেউ কেউ বলতো বিপাশা নদীর উৎস) – এখন তো শুনি এটা নাকি বিলকুল একটা “জুমলা” – একটা টক-ঝাল-মিষ্টি ট্যুরিস্টি গল্প মাত্র।
রোটাং পাসে যাবার এবং রোটাং পেরোবার পরের রাস্তাটা যায় সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে, সেখানে মেঘেরা এসে লুকোচুরি খেলে যায় যখন তখন। এই মেঘ, এই কুয়াশা, এই একটু বৃষ্টি আর পাশে খাদ পেরিয়ে পাশের পাহাড়ের সবুজ, তাকে বেয়ে উঠেছে সরু সুতোর মতো পাকমারা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে এঁকেবেকে চলতে চলতে এসে পৌঁছলাম গ্রাম্পু বলে একটা জায়গায়। এইখান থেকে ডাইনে মোচড় মেরে একটা সরু-ভাঙ্গাচোরা-নেইরাস্তা ধরে আমরা চললাম লাহুলের পথে। মানালি-লেহ হাইওয়েতে চলে গেল – ঠিক ধরেছেন – লেহ-লাদাকের দিকে।
 
নেইরাস্তা না নেইরাস্তা। একে সরু, একপাশে খাড়া খাদ, আর রাস্তাটা অজস্র ছোট-বড় বোল্ডারে মোড়া, তাতে গাড়ির চারটে চাকা একসঙ্গে মাটিতে প্রায় থাকেই না। আর সারা রাস্তা সে কি মারাত্মক ঝাঁকুনি আর ঝটকা! পেছনের সিটে কিছু মালপত্র রাখা হয়েছিলো – সেগুলো, খাবারের ব্যাগ, ওষুধের (এবং টয়লেট পেপারের) ব্যাগ বাসের মেঝেতে পড়ে প্রথমে গড়াগড়ি, পরে বহতি নদীরে মতো কখনো সামনে, কখনো পেছনে চলে বেড়াচ্ছে। আমরা সকলেই আলাদা আলাদা সীটে বসে সামনের সীটের পেছনের হাতল প্রানপনে চেপে ধরে আছি আর বাসটা তার প্রবল ঝটকায় কখনো আমাদের মেঝেতে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে, কখনো বা গদাম করে বাসের দেয়ালে আছাড় মারছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মন্দ লাগছিলো না – নিজেকে বেশ রাণা প্রতাপ মনে হচ্ছিলো – যেন চেতকের পিঠে চড়ে হলদিঘাটির পাহাড়ি রাস্তা ধরে যুদ্ধে যাচ্ছি। মুখের ভাবটা সেরকমই করে রেখেছিলাম, হাতের মাসলও বেশ ফুলিয়ে রেখে পোজ দিচ্ছিলাম আগাগোড়া । আমার বউ আর বন্ধুনি অবশ্য বিশ্বনিন্দুক, তাদের মতে আমাকে নাকি আসলে লালমোহনবাবুর মতো দেখাচ্ছিলো। আমি অবশ্য ওসব একদম গায়ে মাখি না – কারুর যদি সাধরণ কল্পনাশক্তিই না থাকে তো আমি আর কি করতে পারি।
 
এদিকে বাইরের দৃশ্যাবলী বদলে গিয়েছে। পাহাড়ের সবুজ দাড়ি কেউ শক্ত ব্লেডে অযত্নে, এবড়ো-খেবড়ো ভাবে কামিয়ে দিয়েছে – বাইরের পাহাড় তাই রুক্ষ ও কঠোর। ছাই আর খয়েরি রঙের পাহাড়ের প্রকৃতিও বেশ অদ্ভুত – কেমন যেন পাথরগুলো গুঁড়ো হয়ে পাহাড় বানিয়েছে মনে হয়। একটু বাদে কোথা থেকে চন্দ্রা নদী এসে আমাদের পাশে পাশে চলতে লাগলো। এই চন্দ্রা নদী হলো চন্দ্রভাগার “চন্দ্র”; এর সঙ্গে “ভাগা”-র দেখা হয় কেয়লংএর কাছে তান্ডি বলে একটা জায়গায়, যেটা আমাদের যাবার রাস্তায় পড়বে না। চন্দ্রভাগার মতো মিষ্টি নাম কোন বেরসিকের হাতে পড়ে চেনাব হয়ে গেছে – যাকে বলে ঘোর রসভঙ্গ।
 
এভাবে নাচতে নাচতে, ঝটকা খেতে খেতে, রাণা প্রতাপ হতে হতে পৌঁছে গেলাম ছত্রু বলে একটা জায়গায়। ছোট্ট জায়গা, চন্দ্রা নদীর কুলে, পাশে একটা ভারী মনোরম লোহার ব্রিজ আছে, যার গায়ে অজস্র পতাকা লাগানো – এখানকার তিব্বতি রীতি অনুযায়ী। আর আছে অত্যন্ত জনপ্রিয় চন্দ্রা ধাবা, প্রায় সবাই সেখানে বাকি-আধখানা-ব্রেকফাস্ট সারবার ভিড় করে। খাবারের বৈচিত্র তেমন নয় – আলু পরোটা – ম্যাগি – ওমলেট ইত্যাদি কিন্তু প্রত্যেকটাই অত্যন্ত সুস্বাদু। খাওয়াটা বেশীর দিকেই হয়ে গেলো।
ছত্রু জায়গাটা ট্রেকারদের কাছেও জনপ্রিয়। যারা মানালি-হামটা পাস-চন্দ্রতাল ট্রেক করে, তারা হামটা পাস পেরিয়ে ইন্দ্রাসন পর্বতের সামনে দিয়ে (ইন্দ্রাসন – কি সুন্দর নামটা!) এই ছত্রুতেই এসে পড়ে। ট্রেকিংয়ের রাস্তা নদীর ওপার দিয়ে, এখানেই ট্রেকাররা তাঁবু খাটায় – এপারে আসে খাওয়াদাওয়া করতে এবং রসদ কিনতে। আমি কোনদিন ট্রেকিং করি নি, কিন্তু এদের দেখতে বেশ লাগছিলো।
 
ছত্রুর পরে আবার সেই “পাগলা-ঘোড়া-ছুটেছে” স্টাইলে গাড়ি চলেছে। রাস্তা আরো খারাপ হয়েছে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বাতাল বলে একটা পুঁচকে জায়গা। কিন্তু তার আগে পার হতে হবে “ছোটা ধারা” বলে একটা গোলমেলে জায়গা, যেখানে অত্যন্ত খারাপ রাস্তাটার ওপর দিয়ে কুলকুল করে জল বয়ে যায়, প্রায় একটা ছোট ঝর্নার মতোই। সেই পথে চড়াই ভেঙে গাড়ি নিয়ে ওপরে যেতে হয়। রাস্তাটা আবার সিঙ্গল লেন, অর্থাৎ ছোট ছোট কনভয় করে একেকবারে হয় ওপরের গাড়িগুলো নামবে, নয় নিচের গুলো উঠবে। আমাদের ঠিক আগে যে নিচে নামার গাড়ির কনভয় নামছিলো, সেই গাড়িগুলো প্রায় সবই আটকে গেল। তারপর তার থেকে যাত্রীদের নামিয়ে, মাল নামিয়ে, পাথর সরিয়ে কোনক্রমে গাড়ি চালানো হচ্ছিলো। কাণ্ড দেখে আমাদের তো হৃৎকমল একেবারে ধুকুর-পুকুর। তবে দেখে ভালো লাগছিলো যে গাড়ি আটকে গেলে অন্য গাড়ির ড্রাইভাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসে সাহায্য করছিলো। নীচে নামার কনভয় পেরিয়ে গেলে আমাদের গাড়ির পালা এলো এবং এক ঝটকায় ওপরে উঠে গেলো। নইলে এই বরফগলা জলে জুতো খুলে আটখানা স্যুটকেস নিয়ে কি করতাম কে জানে!!
বাতালে পৌঁছলাম দুপুর নাগাদ। এখানে একটা নতুন পি-ডব্লিউ-ডির গেস্টহাউস রয়েছে, কিন্তু এই জায়গাটা বিখ্যাত এর চাচা-চাচি ধাবার জন্যে (যেটার আসল নাম চন্দ্রা ধাবা)। বোধ দর্জি এবং চন্দ্রা দর্জি (না, ধাবাটার নাম চন্দ্রা নদীর নামে নয়), যাদের স্থানীয় লোকেরা চাচা-চাচি বলে, তাঁরা চালান এই ধাবাটি। চাচা-চাচির ধাবা বিখ্যাত হয়ে যায় ২০১০ সালে, যখন আকস্মিক বরফপাতে একদল ট্যুরিস্ট বাতালে আটকা পড়ে যায়। বাতাল এমনিতেই জনমানবহীন এলাকা, আশেপাশে পঞ্চাশ কিলোমিটার অব্দি কিচ্ছু নেই, ফোন বা মোবাইল চলে না। খাবার সীমিত – আসে স্থানীয় বাস বা গাড়ির ড্রাইভারদের বদান্যতায়। এই অবস্থায় এই ট্যুরিস্টের দলকে চাচাচাচি থাকতে দিয়েছিলেন এবং খাবার দিয়েছিলেন – যতক্ষণ ওঁদের স্টক ছিলো, ততক্ষণ। এবং সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। পয়সা নিতে চান নি ওঁরা, কারণ বিপদের সাহায্যকে ওঁরা বিক্রি করেন না।
 
সোনু গল্প বলছিলো। “ওই সময় আমিও আটকে গিয়েছিলাম। ছত্রুর এক কিলোমিটার আগে। গাড়ি রাস্তায় রেখে হেঁটে যেতাম ছত্রুর চন্দ্রধাবায়। সেখানেও পয়সা নেয় নি কেউ। আর যতক্ষণ খাবার ছিলো, আমাদের খাইয়েছে। বিনা পয়সায়। তারপর যখন খাবার ফুরিয়ে গেলো, তখন ওই ধাবার মালিক তার পোষা ভেড়া কেটে তার মাংস রান্না করে খাইয়েছিলো আমাদের। আমি এমনিতে নিরামিষাশী, কিন্তু সেদিন খেয়েছিলাম। নইলে ওই ঠাণ্ডায় বাঁচতাম না।“
 
দম নিলো সোনু। তারপর সিগারেটে টান দিয়ে বললো “এই পাহাড়ে শুধু চাচা-চাচি নয়, সব পাহাড়িরাই সাহায্য করে। নইলে আমরা কেউ বাঁচতাম না এতদিন।“
 
বাতাল থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে চন্দ্রতালের দিকে। আমরা সেদিকে যাবো না এখন, আমরা যাবো কুনজুম পাসের দিকে। চন্দ্রতালগামী ট্রেকাররা সচরাচর এখানে একটা স্টপ দেয়। আমাদের সঙ্গে একটা ট্রেকিঙের দলের সঙ্গে কথা হলো – প্রায় জনা কুড়ি কমবয়সী বিদেশিনী, এসেছে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে। এরা সকলেই হামটা পাস থেকে আসছে, এই অতিসাধরণ ছোট্ট ধাবায় বা তার পাশে রাত কাটিয়েছে। দেখে অবাক লাগলো, ভালোও লাগলো বেশ।
 
চাচাচাচির দোকানে একটু আলু পরোটা সাঁটাবার সুপরিকল্পনা করছি, এমন সময় সোনু এসে বললো, “ইয়হা লাঞ্চ মত কিজিয়ে। সামনে কুনজুম পাস – উঁচাইমে হ্যায়। রাস্তা আউর ভি খারাপ।“
বোঝো! অতএব শুধু চা।
 
পরবর্তী গন্তব্য কুনজুম পাস – যার মিষ্টি স্থানীয় নাম “কুনজুম লা”।
(চলবে)
 
———————————-
উত্তরকথনঃ
 
এই রাস্তায় উতরাই-চড়াই বেশ বেশী, তাই মাউন্টেন সিকনেসের ভয় থাকে। ইনক্রেডিবল স্পিতির বিশেষবাবু বিশেষ করে বলে দিয়েছিলেন প্রতি আধঘণ্টায় দুতিন ঢোক জল খেতে, আর মাঝে মাঝেই ফলের রস খেতে। আমরা এই পদ্ধতি মেনে বিশেষ উপকার পেয়েছিলাম। এছাড়া আমরা একটা জলের বোতলে ও-আর-এস বানিয়ে রেখেছিলাম, সেটাও এক চুমুক মাঝে মাঝে পালা করে খেয়ে নিতাম।
 
এতে একটা বাড়তি সুবিধে, মাঝে মাঝেই প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে হবে, ফলত ড্রাইভার গাড়ি থামাতে বাধ্য হবে। সেই ফাঁকে দুচারটে “তসবীর খিচবার” সুযোগও পাওয়া যাবে, বুঝলেন কিনা 😁

😁

Advertisements

পার্বত্য-মরুর দেশে আমরা # ১

প্রথম পর্বঃ মানালির অবতরণ এবং “কিছুই না করা”  

দিল্লি থেকে সারারাতের বাসে চেপে মানালি এসে পৌঁছলাম সকাল ন’টা নাগাদ। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, প্যাচপ্যাচে কাদা আর তিরিশ লক্ষ ট্যাক্সিওয়ালা, যারা “হোটেল চাহিয়ে বাবু? একদম টপ-ক্লাস, বিলকুল বিয়াস নদী কি পাস হ্যায়” বলে চারদিক থেকে হামলে পড়েছে।

আমাদের গন্তব্য মানালি নয়। আমরা যাচ্ছি লাহুল-স্পিতি, “ইনক্রেডিবল স্পিতি” নামের এক ট্র্যাভেল কোম্পানির হাত ধরে। স্পিতি সিমলার দিক দিয়েও যাওয়া যায় – কিন্নর পেরিয়ে নাকো-টাবো হয়ে। আমরা যাচ্ছি মানালিতে হয়ে। এখানে একটি রাত্তির কাটিয়ে পরদিন ভোরভোর বেরিয়ে পড়বো “কাজা”র উদ্দেশ্যে।

“ইনক্রেডিবল স্পিতি”র মূল অফিস কাজাতে, মার্কেটিং অফিস মানালিতে। মানালি অফিসের দুই প্রধান “বিশেষ” এবং “রুথিকা”, দুজনেই বেশ হাসিখুসি আর আড্ডাবাজ। আসার আগেই ফোনে আমাদেরকে পইপই করে বলে দিয়েছিলো “প্রথম দিন একদম বেশী কিছু করবেন না। শুধু বিশ্রাম নেবেন আর  একক্লাইমটাইজ করতে দেবেন শরীরটাকে।“ এই “একদম বেশী কিছু করবেন না” ব্যাপারটায় আমার আবার সহজাত দক্ষতা আছে – যাকে আজকাল “কোর-কম্পিটেন্স” বলে আর কি। তাছাড়া মানালি আগে একাধিকবার ঘোরা, কাজেই সারারাত বাসজার্নি করে এসে আবার সেই ট্যুরিস্ট-পীড়িত জায়গাগুলোতে, যেখানে স্থানীয় পোশাক পরে ইয়াকের গলা জড়িয়ে বা গাঁজাখোর খরগোস কোলে নিয়ে ছবি তোলাতে হয়, সেখানে যেতে আমাদের এমনিতেও বিশেষ আগ্রহ ছিলো না। শুধু বশিষ্ঠকুণ্ডে হটস্প্রিং এর চানের কথাটা একবার উঠেছিলো বটে, কিনতু  নামতে গেলে তো সব ধর্মস্থানের কমন এলিমেন্ট – সেই বিখ্যাত “খাটো গামছা” অথবা জাঙ্গিয়া পরে নামতে হবে, কারণ সুইমিং কস্টিউম আনা হয় নি। দিনকাল ভালো নয় – জাঙ্গিয়াকে সুইমিং কস্টিউম হিসেবে পরে নামলে সেখানকার জনসাধরনের ধর্মবিশ্বাসে যদি ঘা লেগে যায় এবং তার দরুন তারা যদি আমাদের দু-ঘা বসিয়ে দেয়, সেই ভয়ে শেষমেষ এই পরিকল্পনাটি পরিত্যাগ করা হলো।

আমাদের হোটেলটা ওল্ড মানালিতে, নাম “ড্রাগনস ইন”। নতুন মানালি থেকে ওপরে উঠে মানালসু নালার (বিপাশা নদীর একটি শাখা – আমাদের আদি গঙ্গা আর কালীঘাট গঙ্গা গোছের ব্যাপার আর কি) ওপরের ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয়। ডানদিকে নিচের দিকে নেমে গেলে ক্লাবহাউস (যেখানে একসময় ভিড় করে লোকে সূর্যাস্ত দেখতে যেতো), সেদিকে না গিয়ে বাঁদিকে চড়াই ধরে খানিকটা ওপর দিকে উঠতে হয় (এই রাস্তা শেষ হয়েছে মনু মন্দিরে)। চড়াইটা বেশ খাড়া, কারণ অটো আসতে চাইলো না আর ট্যাক্সি পঞ্চাশটাকা বেশী নিলো – যদিও সেটা সত্যিই চড়াইএর জন্যে, নাকি আমরা “বোটু” বলে, সেটা বলা শক্ত। তা আমাদের “ড্রাগনস ইন” বেশ ছিমছাম “নো-ফ্রিলস” একটা হোটেল, সামনে একই নামে একটা কফিশপ (যার ক্যাফে-মোকা না খেলে মশাই আপনার জীবনটাই বৃথা) আর লাগোয়া একটা রেস্তোরাঁ, যার আসল নাম বোধহয় রাইস-বাউল, কিন্তু সবাই সেটাকেও ড্রাগনস-ইন নামেই ডাকে। ড্রাগন শুনলেই আমার আবার হেমেন রায়ের “ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন” মনে পড়ে কিম্বা  কাঞ্চনজঙ্ঘা-প্রহেলিকা সিরিজের সেই সব সাংঘাতিক রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস – যেখানে হত্যাকারী মৃতদেহের পাশে একখানা হরতনের টেক্কা ফেলে দিয়ে যেতো, আর গল্পের শেষে  চিনেপাড়ার অন্ধকার গলিঘুঁজিতে সুদূরপ্রাচ্যের কোন প্রধান অপরাধীর (তখনো “ডন” কথাটা চালু হয় নি) সঙ্গে গোয়েন্দার রক্তহিম মোকাবিলা হতো। কিন্তু আমাদের ড্রাগনস ইন নিতান্তই নিরীহ হোটেল, তাই সেরকম গায়ে-কাঁটা-দেওয়া ঘটনার ঘনঘটা কিছু ঘটে নি।

হোটেলটা টিপিক্যাল ট্র্যাভেলার-পাড়ায় – পিঠে ব্যাক-প্যাক বাঁধা বিদেশীর দল গিজগিজ করছে এখানে। টিপিক্যাল ট্যুরিস্ট পাড়ায় যেমন গোটাকয়েক “শের-ই-পাঞ্জাব” রেস্তোরাঁ থাকবেই (“শের-ই-পাঞ্জাব, “নিউ শের-ই-পাঞ্জাব” ইত্যাদি, তেমনি এই সব সাহেবি ট্র্যাভেলার পাড়ায় থাকবেই “জার্মান বেকারি”। এখানে দেখলাম হোটেলের সামনের সরু গলিতেই গোটা তিনেক জার্মান বেকারি আছে, সেগুলিতে নানান বিদেশী ছেলে-বুড়ো তুরিয় অবস্থায় বসে এটা-সেটা খাচ্ছেন।

ওল্ড মানালির সঙ্গে দুটি জিনিস একছত্রে বাঁধা পড়ে গেছে – এক হলো গঞ্জিকা (যার ভদ্র মডার্ন নাম “মারিজুয়ানা”) আর দ্বিতীয় এই অজস্র ইজরায়েলি ট্যুরিস্টের দল। শুনেছি যতো বিদেশী আসেন হিমাচলে, তার ৭০ শতাংশ আসেন ইজরায়েল থেকে। এদের মূল গন্তব্য মানালির থেকে অনতি দূরে কাসোল, কুলু, ধরমশালা আর এই ওল্ড মানালি। কেউ কেউ তাই পুরনো মানালিকে “ছোট টেল-আভিভ” বলে থাকেন। মানালির অনেক দোকানেই সাইনবোর্ড হিব্রু – এমনকি মেনুকার্ডটিও হিব্রুতে লেখা। রেস্তোরাঁর সামনে বিদেশী স্টাইলে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে “আজকের স্পেশাল” আইটেমগুলি লেখা, তাতে দেশ-বিদেশের খাবার লেখা থাকে। এই সিজলার-স্নিটজেল-গ্রিল্ড ট্রাউট-বারগার-পাস্তা-শোভিত মেনুর মধ্যে অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি ফালাফাল, কুশকুশ (এটা অবশ্য লেখা থাকে না, ট্রাউটের সঙ্গে দেয়) এবং ইজরায়েলি “শ্যাকশাউকা”র।

শ্যাকশাউকা প্রাচীন অটোমান সাম্রাজ্যের সব দেশগুলিতেই বেশ জনপ্রিয়। শুনেছি অটোমান সাম্রাজ্যের সময় এটা মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি হতো; পরে টিউনিসিয়ার ইহুদীদের হাতে পড়ে এর বর্তমান রূপটি ইজরায়েলে জনপ্রিয় হয় – টম্যাটো-পিঁয়াজ-ক্যাপ্সিকামের রঙিন ভাইদের মিশিয়ে একটা থকথকে কারির ওপর ডিমের পোচ বসিয়ে দেওয়া হয়। শ্যাকশাউকা খেতে দেওয়া হয় লোহার একটি সসপ্যানের মতো পাত্রে – তাকে বলে ট্যাজিন। আমি এটি  দুয়েকবার খেয়েছি তুর্কিস্তানে – সেখানে এর একটা ভায়রা-ভাইও চলে, যাতে টম্যাটোর বদলে বেগুন দিয়ে তৈরি হয় শ্যাকশাউকার বেস ।

মানালিতে আমরা অবশ্য শ্যাকশাউকা খাই নি। হোটেলের বাইরে একটা জনশুন্য ছোট রেস্তোরাঁয় আমাদের পূর্বতন প্রভূদের স্মরণ করে “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” অর্ডার করেছিলাম। দোকানদার আমাদের এই ব্যবহারে বোধহয় মর্মাহত হয়ে পড়ে – যেখানে দোকানের সামনের ব্ল্যাকবোর্ড মেনুকার্ডে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে ইজরায়েলি-স্প্যানিশ-ফ্রেঞ্চ ব্রেকফাস্ট এভেলেবল, সেখানে সেসব ফেলে শেষে সেইইইই “ইংলিশ ব্রেকফাস্ট” ? এই গভীর মনকষ্টেই বোধহয় বেচারার এই সাধারণ ব্রেকফাস্ট বানাতে পাক্কা ৫০ মিনিট লেগেছিলো – ততক্ষনে খিদেয় আমরা চেয়ার-টেবিল চিবিয়ে ফেলার উপক্রম করছি। অবশ্য এতে একটা উপকার হয়েছিলো – ব্রেকফাস্টটা “ব্রাঞ্চ”এ পরিনত হওয়ায় লাঞ্চটা আর খাবার দরকার পড়ে নি; শুধু আমাদের মতো দু-তিনজন ব্যোম-হ্যাংলারা বিকেলের দিকে ইয়াকের-চিজ দেওয়া উৎকৃষ্ট পিৎজা খেয়ে এসেছিলাম আমাদের হোটেলের লাগোয়া রেস্তোরাঁয় – যার মালকিন আবার এক ইজরায়েলি রমণী।

মানালিতে মারিজুয়ানার এমন অবাধ ব্যবহার অবাক করে দেবার মতন। ওল্ড মানালির প্রায় সব রেস্তোরাতেই মাটিতে বসার ব্যবস্থা আছে – বেশ গদী-বালিশ নিয়ে এলিয়ে বসে কল্কেতে টান মারা যায়। সাধরন মনিহারি দোকানে প্রকাশ্যেই নানান ধরণের কল্ককে ও তার অ্যাক্সেসরি পাওয়া যায়। এমনকি শুধু গাঁজার সরঞ্জাম বিক্রি করবার ‘এক্সক্লুসিভ” দোকানও আছে বড়ো রাস্তার ওপরেই। মানালি তো “মনুর আলয়” – শিবের তো নয়, কিন্তু চরিত্রগত দিক থেকে শিবের সঙ্গেই এর মিল বেশী। রাস্তায় ঘাটে অনেক বিদেশিনী ও স্বদেশিনীদের দেখতে পেয়েছি – বিচিত্র স্বপ্ল-পোশাক পরে ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে আছেন। জানি, জানি – তাদের ছবি পেলে আপনাদের বেশ নয়নসুখ হতো – এই তো ? ওসব পাপ কথা একদম বলবেন না – এ হচ্ছে ভ্রমণকাহিনী, ও সব রসের কথা আরেকদিন হবে অখন।

মনুর কথা ঠিক জানা নেই, তবে ওল্ড মানালির সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দারা ছিলেন কাংরা উপত্যকার যাযাবর শিকারী ও মেষপালকরা – যাদের আবার বলা হতো “রাক্ষস” (হ্যাঁ মশাই – রাক্ষস-অসুর-গান্ধর্ব-নাগ এরা সবাই নানান গোষ্ঠীই ছিলো – নেহাত বেদবাদী নয় আর গাঙ্গেয় বৈদিক প্রথা সব পালন করতো না বলে এদেরকে “মানুষ নয়” বলে ভিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো)। পরে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা যারা হলো, তাদের বলা হতো “নর”। আরো অনেক পরে একসময় এটি একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মজার কথা – এই মানালির রাজারা নিজেদের রাজা বলতেন না। তাঁরা বলতেন মানালির আসল রাজা হলেন রঘুনাথজি, তাঁরা রাজ্য চালান এই রঘুনাথজীর সেবক হিসেবে। ভরত যেভাবে রামের খড়ম রেখে রাজত্ব করতেন আর কি। এর কারণ নাকি সপ্তদশ শতাব্দীতে মানালির এক রাজা জগৎ সিংহ একদা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে বসেছিলেন। কোন চিকিৎসাতেই যখন কাজ হলো না, তখন তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে অযোধ্যা থেকে রঘুনাথজীকে (অর্থাৎ রামের এক রূপ) নিয়ে এসে তাঁকে সিংহাসনে প্রতিস্থা করেন ও নিজের হাতে তাঁর সেবা করতে শুরু করেন। কথিত আছে তাঁর দয়ায় জগৎ সিংহ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সেই থেকে মানালির রাজা থেকে যান রঘুনাথজী। এই ভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর মানালি মান্ডি রাজ্যের অংশ হয়ে যায় – যার রাজারা ছিলেন সেন পদবীধারী চন্দ্রবংশীয় রাজপুত (যাঁদের সঙ্গে আবার নাকি আমাদের বাংলার সেনবংশের কি যেন একটা লতায়-পাতায় সম্পর্ক আছে)।

আধুনিক মানালি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্রিটিশদের দাক্ষিণ্যে – যারা এখানে আপেল চাষ এবং এর নদীতে দুরকম ট্রাউট মাছের চাষ শুরু করেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলেও মান্ডি স্বাধীন রাজ্যই ছিলো, মায় ভারত স্বাধীন হওয়া অব্দি। ভারত স্বাধীন হবার পর যে ৫৬২ খানা স্বাধীন রাজ্য ভারতবর্ষে যোগ দেয় মূলত বল্লভভাই প্যাটেলের রাজনৈতিক ছক্কা-পাঞ্জার খেলায়, মান্ডি তাদের মধ্যে একটি।

মানালির কথা আর নয়। কাল আবার সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়া। ফেরবার পথে এর সঙ্গে পুনর্মিলন যখন হবে, তখন নাহয় দুচার কথা হবে। আপাতত মানালিকে আলবিদা।

পরবর্তী পর্ব – কাজা।

(চলবে)

—————————————————————————————————————————————–

উত্তরকথনঃ

মানালিতে বিপাশা নদীর ধারে বসে “নদী তুমি কথা হতে আসিতেছো” বলা ছাড়া আরো কিছু দেখবার জিনিস আছে – মনু মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির (মানালির একটু বাইরে), হিড়িম্বা মন্দির (এবং তাঁর অনতিদূরে ঘটোৎকচের খোলা মন্দির) ইত্যাদি। মনু মন্দিরটা খুবই পুরনো, কাঠের গায়ে কারুকার্য করা মন্দির – এই স্টাইলের মন্দির এই অঞ্চলে দেখা যায় খুব। হিড়িম্বা মন্দির – আর বিশেষত ঘটোৎকচের খোলা মন্দির দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এদুটিই ট্রাইবালদের (যাদের তখন রাক্ষস বলতো) দেবতার মন্দির। এর স্ট্রাকচারে নগর বা দক্ষিণী স্টাইল, কোনটাই নেই; আছে পশুর মাথা বা শিং দিয়ে সাজসজ্জা। বশিষ্ঠ মন্দির মানালির থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে, ওর কাছে শুনেছি হোমস্টে আছে। থাকতে পারেন ইচ্ছে হলে – একটু নিরিবিলি হবে। আর, ইয়ে – ছেলেদের জন্যে বলছি – সুইমিং কস্টিউম অথবা হাফপ্যান্ট নিয়ে যাবেন, আর একটা লম্বা তোয়ালে, কেমন?

—————————————————————————————————————————————–

রথের রশি

“ওরে ওঠ, যাবি না পুজোতে ?”

“উফ, মা – ছুটিতে এসে কেউ এতো সকালে ওঠে? চা দেবে তো, নাকি?”

“চা হবে না এখন। আমাকে তো রথ টানতে যেতে হবে। ফিরে এসে ওসব হবে। তুই যাবি কি না বল।“

“উফফফ – না, যাবো না! হয়েছে?”

সঞ্জয়ের মা আর কথা বাড়ালেন না। আজকালকার ছেলেরা কলেজে ঢুকে সব লায়েক হয়ে যায়, কথা শোনে না। তাছাড়া দেরীও হয়ে গেছে, বাকিরা রথের সামনে ওঁদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সঞ্জয়ের বাবা তো সকালবেলায় চান সেরে তৈরি হয়ে আছেন। দেয়ালে ঝোলানো ঠাকুরের আর অন্য ছবিতে প্রণাম করে দুজনে জোর কদমে হাঁটা লাগালেন পুজোতলার দিকে।

..

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB71/LEKHA/gAtanu71.shtml

প্রথম প্রকাশঃ  পরবাস-৭১, জুন , ২০১৮

কাহিনীসুত্রঃ বন্ধুবর কৃষ্ণ পোপালে – যে ওই গ্রামেরই ছেলে। শ্রীমতী স্মিতা গুণে – ওই গ্রামেই বসবাসকারী জার্নালিস্ট। এছাড়া অন্তর্জাল তো আছেই।

অনুগল্প ৬: ইমতিয়াজ মিঁয়ার ফ্যাশন

চার কুড়ি পার করলেও ইমতিয়াজ মিয়াঁর জিন্দেগীতে রঙের অভাব নেই। চুলেতে রং আর দাড়িতে মেহেন্দি লাগিয়ে, তিন নম্বর বউয়ের হাতের জর্দার কৌটো থেকে এক চিমটে উমদা বেনারসী জর্দা মুখে ফেলে, গোলাপীর ওপর আগাগোড়া সোনালী সুতোয় ঠাসা-কাজ করা মিহি পাঞ্জাবী পরে দোকানে এসে বসেন রোজ বিকেলবেলায়। তখন তাঁর দাড়িতে আর কানের পিছনে থাকে এক ফোঁটা করে ফিরদৌস ইত্বর, যার খুশবু একেবারে বড়োরাস্তা অব্দি পৌঁছে যায়। মল্লিকবাজার অঞ্চলের লোকেরা যাবার পথে সেলাম বাজিয়ে যায়। পুরনো খদ্দেররাও জানে যে এই সময়ই মিয়াঁসাহেব দোকানে থাকবেন, তাই তারাও বেছে বেছে এই সময়টাতেই এসে পড়েন।

..

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB70/LEKHA/gAtanu70_imtiaz.shtml

প্রথম প্রকাশঃ  পরবাস-৭০, ৩১ মার্চ , ২০১৮

বসন্তসন্ধ্যা

বেজায় ভিড় ট্রেনটা থেকে হাঁচোড়পাঁচোড় করে নামলো অপর্ণা। মুখে লেগে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম আঁচলে মুছে নিয়ে সবে গেটের দিকে এগোতে যাচ্ছে, এমন সময় পেছন থেকে ডাক শুনতে পেলো “ও দিদি – আমিও আছি। একটু দাঁড়িয়ে যাও প্লীজ!”

অপর্ণা দাঁড়িয়ে গেলো। একটু বাদেই লাফাতে লাফাতে পেছন থেকে একগাল হাসি আর দুটো ঝুপো ঝুপো বিনুনি-করা রুনি এসে ওর হাত চেপে ধরলো। ছিপছিপে রোগা মেয়েটা, ছাপা রঙের সালওয়ারে, রংবেরঙ্গের ওড়নায় আর হাসির ছটায় ভীষণ প্রাণবন্ত।

..

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://www.parabaas.com/PB70/LEKHA/gAtanu70_basanta.shtml

প্রথম প্রকাশঃ  পরবাস-৭০, ৩১ মার্চ , ২০১৮

অনুগল্প ৫ঃ ডাক্তারদিদি

অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে রোহিত। তীব্র যন্ত্রণা – আর তার সঙ্গে নিঃশ্বাসের কষ্ট। শ্বাস যেন যাচ্ছে না শরীরে – হাঁ করে সজোরে নিতে হচ্ছে, আর হাপরের মতো ওঠা নামা করছে বুকটা। মাঝে মাঝে কাতরে উঠছে।

বউ পৌষালি কাণ্ডকারখানা দেখে ঘাবড়ে গেছে। বেচারি নতুন বউ – সবে তিনমাস হলো বিয়ে হয়েছে। দুজনের নতুন সংসার। ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলো “একবার পাশের হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাক ?”

“ডাক্তার ?” মুখ কুঁচকোলো রোহিত। “ডাক্তার কি করবে? দিদির থেকে বড়ো ডাক্তার কি আছে নাকি? দিদিকে ফোন করেছিলে ?”

“হ্যাঁ, তোমার সামনেই করলাম তো।” বললো পৌষালি।

“কোন ফ্লাইটে আসছে দিদি ? জিজ্ঞেস করেছো ? উঃ, আমি মরে যাচ্ছি …পারছি নাআআআ।“

“সে কথা কিছু বললো না দিদি। সব শুনে লাইনটা কেটে দিলো – নাকি নিজের থেকেই লাইন কেটে গেলো কে জানে। কিন্তু দিদি এতো তাড়াতাড়ি কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর কি করে পৌঁছবে? সময় লাগবে তো অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা।”

“তুমি আবার ফোন করো।”

“আচ্ছা করছি, তুমি একটু শান্ত হও গো।”

বেল বেজে উঠলো। পৌষালি দরজা খুলতে গেলো।

“ওই তো দিদি এসেছে। দিদি, দিদি – ও দিদি, তাড়াতাড়ি এসো…”

পৌষালি ফিরে এলো। “দিদি নয়। নীচের ওষুধের দোকান থেকে এই ওষুধটা দিয়ে গেলো…”

“ওষুধ ? কিসের ওষুধ ? তুমি আবার কি ওষুধ আনালে? বলেছি না দিদির সঙ্গে কথা না বলে…দাও ফোন দাও। দিদিকে ফোন করছি আমি…” রোহিত মোবাইলের দিকে হাত বাড়ালো।

“ও দিদি, তুমি কখন আসছো ? আমি আর পারছি না যে…”

দিদির গলার সুরে শান্তির প্রলেপ। দিদির গলায় ভরসার আগল। দিদির গলায় মা-মা গন্ধ।

“অতো ছটফট করছিস কেন বল দিকি।“

“তুমি কোন ফ্লাইটে আসছো ?”

“ভাইয়া, আমি আসছি না ।“

“মাআআনে। তুমি আসছো না মানে? উঃ দিদি, তুমি আর বোধহয় আমাকে দেখতে পেলে না গো…” রোহিত আর্তনাদ করে উঠলো।

“ন্যাকামো কোরো না, রোহিত।”

দিদির গলায় বজ্রপাত। দিদির গলায় চাবুকের সপাং।

“এমন কিচ্ছু হয় নি তোর। অ্যালার্জি আছে জেনেও কে বলেছিলো তোকে চিংড়িমাছ খেতে? তোর বাড়ির নীচের ওষুধের দোকানে ফোন করে দিয়েছি; ওষুধ দিয়ে যাবে। ওটা খেয়ে শুয়ে থাক। ঘণ্টা তিনেক অন্তত লাগবে। পৌষালিকে দে, আমি ওকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। “

ফোন ছেড়ে দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো রোহিত। ব্যথাটা কমছে মনে হচ্ছে।

******

মাসকাবারি বাজার

“কি রে, তুই তৈরি হোস নি তো! আমাকে বললি যে ঠিক সাড়ে দশটায় আসতে?”

“দু মিনিট, ঠিক দুইটি মিনিট অপেক্ষা করিও বন্ধু। আসিতেছি।“

“তাড়াতাড়ি আয়! তা বাজারটা বসবে কোথায়? তোর বাড়িতে নয় নিশ্চয়ই!“

“না না, সোসাইটি অফিসের যে একতলার হল, সেখানে। বেশ বড়ো জায়গা, সামনে আর পেছনে বাগান। হলে সাউন্ড সিস্টেম লাগানোই আছে, একটা দেয়াল স্মার্ট-স্ক্রিন – ওখানেই সুবিধে।“

মানসবাবু আর প্রসূনবাবু দুই বন্ধু। বাল্যকালের বন্ধু, তবে আবাল্য ঠিক বলা চলে না। ইস্কুল পাশ করবার পর দুজনে আলাদা কলেজে চলে যায়, তারপর চাকরি সুত্রে আলাদা শহরে। যোগাযোগ তেমন ছিলোই না। অবসর জীবনে তারা একে অপরকে খুঁজে পায় স্কুলের প্রাক্তনীর সম্মেলনে, বছরখানেক আগে।

..

বাকিটা পড়তে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। মোবাইলে পড়লে “Make page mobile friendly” গোছের কোন option এলে সেটাও ক্লিক করে নেবেন।

https://chaityapatrika.com/magazine/2018/05/06/মাসকাবারি-বাজার/

প্রথম প্রকাশ ঃ চৈত্য পত্রিকা – মার্চ ২০১৮